দুটি টেবিল ঘিরে চলছে। জমজমাট আড্ডা, সিগারেটের ছাই জমছে পিরিচে কাপে; পাশাপাশি ব’সে প্রুফ দেখছে আহমেদ ও সালেহ। তাদের মুখোমুখি একটি নড়োবড়ো চেয়ারে বসে হাসান।
তাদের প্রুফের গুচ্ছগুচ্ছ নিউজপ্রিন্ট থেকে একটা ভেজা ভারি অদ্ভুত সুগন্ধ এসে ঢুকে যাচ্ছে হাসানের বুকের ভেতর, হয়তো কবিতার গন্ধ; আর নিউজপ্রিণ্টের প্রুফে লাইনো অক্ষরগুলোকে নক্ষত্রের থেকেও জ্বলজ্বলে দেখাচ্ছে।
হাসান বলে, লাইনের অক্ষরগুলো দেখতে নক্ষত্রের মতো জ্বলজ্বলে, এগুলোর সম্ভবত সুগন্ধ পাচ্ছি।
সালেহ ফরিদউদ্দিন বলে, আরে দোস, লাইনো আর কবিতা একই কথা, লাইনােতে না ছাপলে কোনাে কিছুই কবিতা মনে হয় না।
আহমেদ মোস্তফা হায়দার বলে, লাইনো মিন্স্ পোয়েট্রি, এই জন্যেই তা হাইট্টা হাইট্টা নবাবপুর যাই, যখন ঝনাৎ ঝনাৎ কইর্যা লাইনগুলি পড়ে মনে হয় আমার ভিতর থিকা ঝনাৎ ঝনাৎ কইর্যা কবিতার লাইন বাইর হইতেছে।
হাসান বলে, তোমার কবিতার লাইন তো ঝনাৎ ঝনাৎ ক’রে বেরোনোর কথা নয়, ওগুলো তো অশ্রদ্ধর মতো গড়িয়ে বেরোনোর কথা।
হৈ হৈ ক’রে ওঠে আহমেদ, দোস, অশ্রু জইম্যা সীসা হইয়া গ্যাছে, আইজ লাইনো অক্ষর হইয়া ঝানাৎ ঝনাৎ কইর্যা পড়ে।
খুব সুখী মনে হচ্ছে আহমেদ মোস্তফা হায়দার ও সালেহাকে। ওরা প্রুফ দেখছে, কিন্তু শুধু বানান দেখছে না, পাণ্ডুলিপির সাথে মিলিয়ে দেখছে না, নতুন নতুন পংক্তিও যোগ করছে প্রুফে। আর প্রুফের চিহ্নগুলো দিচ্ছে পরম আদরে, ক্লাশের খাতায় ওরা কখনো এতো আদরে কিছু লেখে নি। প্রুফের চিহ্নগুলোকে রহস্যময় মনে হচ্ছে হাসানের; সে কখনো প্রুফ দেখে নি, তাই ওই চিহ্নগুলোর অর্থ সে বুঝতে পারছে না, তাকিয়ে থাকছে ওদের আঙুলের দিকে, কবিতার থেকেও রহস্যময় চিহ্ন রাশি নিৰ্গত হচ্ছে ওদের আঙুল থেকে।
সালেহর থেকে প্রচ্ছদের কয়েকটি পাতা নিয়ে তাকিয়ে থাকে হাসান। একদিন কি এমন প্রুফ সেও দেখবে, বর্ণের ওপর দাগ দেবে, শব্দ ফাঁক করবে, যুক্ত করবে, পাতার পাশে এই বিস্ময়কর চিহ্নগুলো বসাবে? বেশ কয়েকটি বানান ভুল রয়ে গেছে সালেহর প্রুফে, কিছু বাক্যও অশুদ্ধ।
হাসান একটি শব্দ দেখিয়ে জিজ্ঞেস করে, সালেহ এই শব্দটি কী?
সালেহ বলে, আরো দোস, শব্দটা হইল ‘মুমুর্ষ’, মানে মরা মরা।
সে কি শব্দটি ঠিক ক’রে দেবে?
হাসান বলে, সালেহ, শব্দটির বানান। কিন্তু ‘মুমূর্ষ’। সালেহ বলে, আরো দোস, বানানে কি হয়, কবিতা হইলেই হইল, কবিগো বানান লাগে না, তুমি ত আবার আমাগো থিকা বানান বেশি জানো, দেও দেও দোস বানানটা শুদ্ধ ক’রে লই।
সালেহ বানানটি শুদ্ধ ক’রে নেয় প্রুফে।
সালেহ বলে, দোস, তোমারও একটা বই বাইর হওন দরকার। বিয়ার বয়সের মতন প্রথম কাব্যগ্রন্থ বাইর করনেরও একটা বয়স আছে।
তার হৃৎপিণ্ডটি বিপজ্জনকভাবে লাফিয়ে ওঠে, থামতে চায় না।
হাসান বলে, না, না, এখনো সময় আসে নি; আমি বেশি কবিতা লিখি নি।
আহমেদ মোস্তফা বলে, আরে দোস, বিনয় কইরো না, ছয় ফর্ম পদ্য তুমিও ল্যাখছো, অই যে দুইটা গুচ্ছ ছাড়লা তাতেই তা তিন ফর্ম হইয়া যাইবো। যাও, কবিতার বইর নাম ঠিক কইর্যা ফালাও।
হাসান বিব্রতভাবে জিজ্ঞেস করে, তোমরা কি আমার কবিতাগুলো পড়েছে?
সালেহ বলে, পরুম না ক্যান, ভালই ল্যাখছো দোস, যাও, কপি বানাই ফালাও, আমাগো বইর পর তোমার বইও চৌধুরী ব্রাদার্স বাইর করবো।
ওদের এই সামান্য কথা, ওরা তার কবিতা পড়েছে, এটাকেই হাসানের মনে হয় শ্ৰেষ্ঠ প্ৰশংসা; যেনো মহাকাল বলছে, কপি বানাই ফালাও, কবিতার বইর নাম ঠিক কইর্যা ফালাও।
কিন্তু চৌধুরী ব্রাদার্স কি তার নাম জানে? কী ক’রে জানবে? সে তো কখনো কোনো প্রকাশকের কাছে যায় নি, আর সে শুনছে প্রকাশকরা কবিতা পড়ে না, বই পড়ে না, বই ছাপে। তারা কি ছাপিবে তার কবিতার বই? প্রথম কাব্যগ্রন্থ?
বাসায় ফেরার সময় রিকশা নিতে ইচ্ছে হয় না তার, সে হেঁটে হেঁটে একটির পর একটি ক্যাপস্টেন টানতে টানতে মহাকালের কণ্ঠস্বর শুনতে পায়, মহাকালের গ্ৰীবা দেখতে পায়, যেনো তাকে কে যেনো ডাকছে সে তার পেছন পেছন হাঁটছে, এই হাঁটা ফুরোবে না কোনোদিন। তার হাঁটা অনন্ত হোক, গন্তব্যহীন হোক, অশেষ হোক; সে শুধু হাঁটবে, কোনোদিন পৌছোবে না, হাঁটাই গন্তব্য। সে কি তার প্রথম কাব্যগ্রন্থের প্রেসকপি বানাবে, তৈরি ক’রে ফেলবে পাণ্ডুলিপি, ঠিক ক’রে ফেলবে বইয়ের একটা নাম? চিরকালের জন্যে ওটিই হয়ে যাবে তার প্রথম কাব্যগ্রন্থের নাম? শিউরে ওঠে হাসান, তার মনে হয় সে এমন কিছু সম্পর্কে ভাবছে যা সম্পর্কে বাস্তবে বাস ক’রে ভাবা উচিত নয়, ভাবা উচিত স্বপ্নে, বা একলা পানশালায় বসে প্রচুর বিয়ার পান করতে করতে। অনেকগুলো কবিতার পংক্তি অনেকগুলো চিত্রকল্প তার মাথায় বাকব্যাক ভোরের টিয়ের মতো উড়ছে, এদিকে যাচ্ছে সেদিকে যাচ্ছে, সেগুলোকে সে খাতার খাঁচায় ধরতে পারছে না, ধরতে গেলেই ওড়া বন্ধ ক’রে দিচ্ছে ডাক বন্ধ ক’রে দিচ্ছে ওই বিস্ময়কর সবুজ স্বপ্নগুলো, সেগুলোকে কি সে ধরবে না? কী নাম রাখবে তার প্রথম কাব্যগ্রন্থের? একটি একটি ক’রে নাম ভেসে আসতে থাকে, উড়ে যেতে থাকে;
ইচ্ছে করে বুকের ভেতরে।
হাঁটতে হাঁটতে নিজের কবিতার নাম ও পংক্তি একটি একটি ক’রে মনে আসতে থাকে হাসানের; এবং এক সময় সব কিছু এলোমেলো হয়ে তার মগজে খেলা করতে থাকে। পূর্বপুরুষদের বিস্ময়কর পংক্তির পর পংক্তি।
