অজু কঁধ ঝাঁকিয়ে বলে, নিরামিষ খেলে কি পেট ভরে? মনে হয় খাওয়াই হয়নি৷
একটা মোটে দিন তো!
আচ্ছা, ঠিক আছে।
একটা দিন, মাত্র একটা দিনই হয়তো নিয়মটা রক্ষা করতে পারবে রীণা। কিন্তু তারপর আর পারবে না। পারতে হলে সত্য উদঘাটন করতে হয়। তার চেয়ে বড় যন্ত্রণাদায়ক আর কী আছে? যাক, একদিনই নিরামিষ খাক। নিয়মরক্ষা হলেই হল। অমঙ্গলের ভয়টা হয়তো তার অমূলক। সাহেবদের তো এসব নিয়ম নেই, কই তাদের তো কিছু হয় না।
অজু হঠাৎ বলল, আজ তোমাকে একটু আউট অফ ফর্ম দেখাচ্ছে। কেন বলো তো! ঝগড়াটগড়া হয়নি তো।
অবাক হয়ে রীণা বলে, ঝগড়া! ঝগড়া কেন হবে?
সেটাই তো ভাবছি। তোমাদের তো কখনও ঝগড়া হয় না। ইজ সামথিং রং?
সামথিং ইজ ভেরি মাচ রং। কিন্তু সেটা রীণা কবুল করে কী করে? সে মৃদু স্বরে মিথ্যে কথা বলল, শরীরটা ভাল নেই।
কী হয়েছে?
তেমন কিছু নয়। মাঝে মাঝে তো শরীরটা খারাপ হতেই পারে। বয়স হচ্ছে না?
তোমার আর এমন কী বয়স হল মা? মিড ফটিজ হয়তো।
কম নাকি? মেয়েরা কুড়িতে বুড়ি।
নতুন একটা পা খুলেছে এ পাড়ায়। যাবে? শাওনা বাথ, ম্যাসাজ সব আছে। দে উইল মেক ইউ ফাইটিং ফিট।
ও বাবা! জন্মে ওসব করিনি, এখন সহ্য হবে না।
আরে না। কত বুড়বুড়ি যাচ্ছে। তোমরা বাঙালি মেয়েরা ফিটনেস জিনিসটাই বোঝো না । গ্যাস অম্বল প্রেশার টেনশন নিয়ে জবুথবু হয়ে বসে থাকো। চলো না মা, এটাতে খুব আলট্রা মডার্ন গ্যাজেটস আছে।
শরীর দিয়ে আর হবেটা কী?
ওই তো তোমাদের দোষ। শরীর ছাড়া কিছু নেই মা। শরীর ঠিক না থাকলে আর সবই তো মিনিংলেস হয়ে যাবে।
অজু খাওয়া শেষ করে উঠল। মুখ ধুয়ে তোয়ালে দিয়ে মুখ হাত মুছতে মুছতে বলল, আমার খুব ইচ্ছে করে পরমাটাকেও ভরতি করে দিতে। বারো মাস অ্যালার্জিতে ভোগে। একটু ব্যায়ামট্যায়াম করলে সব ঠিক হয়ে যাবে।
আশ্চর্যের বিষয়, পরমাকে অজু বড্ড ভালবাসে। আর পরমাও দাদার ভীষণ ভক্ত। দু’জনের মধ্যে বয়সের অনেক তফাত বলে পিঠোপিঠি ভাইবোনের মতো তাদের ঝগড়াঝাঁটি হয় না। আর লক্ষ করার বিষয় হল, পরমা যে-কোনও ব্যাপারে তার দাদাকে জিজ্ঞেস না করে কিছু করতে চায় না। কিন্তু পরমা বাচ্চা পরমাও জানে, তার বাবা তার দাদাকে পছন্দ করে না। আর সেই জন্যই বাবার সামনে সে কখনও তার দাদার কাছে বড় একটা ঘেঁষে না।
রীণা বলল, ব্যায়াম ছাড়া তুই আর কিছু বুঝিস না, না?
লিভিংরুমের মস্ত কাঁচের শার্সি দিয়ে সকালের রোদ এসে ঘর ভাসিয়ে দিচ্ছে। ঘন নীল আর সাদা স্ট্রাইপের টি-শার্ট আর ক্রিম রঙের প্যান্ট পরা অজু যখন সেই রোদের মধ্যে গিয়ে দাঁড়াল তখন হঠাৎ যেন বাসুদেবের একটা চিত্র ফুটে উঠল তার অবয়বে। রীণার বুক
সর্বনাশের আশঙ্কায় কেঁপে গেল কি হঠাৎ? অজু কি জানে?
অজু খবরের কাগজগুলো একের পর এক তুলে টপাটপ চোখ বুলিয়ে নিচ্ছিল। রীণার বুক কাঁপছে।
অজু যেমন অবহেলায় কাগজ তুলে নিয়েছিল তেমনি অবহেলায় রেখে দিয়ে বলল, চলি মা।
এসো গিয়ে।
অজু বেরিয়ে গেলে এক কাপ চা খেল রীণা। এখন আর তার কিছু করার নেই। পরমার মর্নিং স্কুল শেষ হবে সাড়ে দশটায়। ফিরতে ফিরতে পৌনে এগারোটা। ততক্ষণ নিজেকে নিয়ে বসে থাকা মাত্র।
কিন্তু বসে থাকা গেল না। ফোন বাজছে। এ বাড়িতে দুটো ফোন। কখন যে কোনটা বাজে ধরা যায় না।
রামু কর্ডলেস টেলিফোনটা এনে তার হাতে দিয়ে বলল, আপনার।
হ্যালো।
একটা মোটা গলা বলল, কেমন আছেন মিসেস বোস?
গলাটা চেনা ঠেকল না রীণার কাছে। সে বলল, কে বলছেন?
প্রশ্নটা অপ্রাসঙ্গিক। আমাকে আপনি চেনেন না।
ও। কী বলবেন বলুন।
আজকে খবরের কাগজে একটা খবর আছে, দেখেছেন?
রীণার বুকটা ফের ধক করে উঠল। সে স্তিমিত গলায় বলল, কোন খবর?
দেখেননি! অবশ্য খবরটা এতই ছোট যে চোখে পড়ার মতো নয়। এনি ওয়ে, খবরটা খেলার পাতায় খুঁজলেই পেয়ে যাবেন।
রীণা একটা অজানা আশঙ্কায় শীতল হয়ে যাচ্ছিল। খানিকক্ষণ চুপ করে থেকে বলল, আপনি কে বলছেন?
বললাম তো আমাকে চিনবেন না। আপনি বরং খেলার পাতাটা চেক করুন। আমি ফোন ধরে আছি।
রীণা আরও কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল, কোন খবরের কথা বলছেন তা বুঝতে পারছি না।
কণ্ঠস্বর সামান্য একটু হেসে বলল, এটা একটু বাড়াবাড়ি হয়ে গেল নাকি মিসেস বোস? খবরটা জনসাধারণের কাছে ছোট হলেও আপনার কাছে তো ছোট নয়। ইট ইজ এ বিগ নিউজ ফর ইউ।
রীণা জানে, তার আর বাসুদেবের সম্পর্কটা তত গোপন কিছু নয়। কেউ কেউ জানে বা অনুমান করে। কিন্তু সময়ও তো অনেক বয়ে গেছে। তবু এই অচেনা গলা শুনে তার বুক কাঁপে কেন? সারা জীবনের অপরাধবোধ কি ঘুলিয়ে উঠছে? সে আরও দুর্বল গলায় বলল, আমাকে বিরক্ত করবেন না, প্লিজ।
আপনি কি শোকাভিভূত?
প্লিজ।
আরে, শোকের কী আছে? একটা বজ্জাত লোক দুনিয়া থেকে কমে গেছে এ তো ভাল খবর।
প্লিজ।
শুনুন, শুধু খবরটা দেওয়ার জন্যই আপনাকে ফোন করছি না। কারণ আমার সন্দেহ, আমি দেওয়ার আগেই খবরটা আপনি পেয়ে গেছেন।
তা হলে কেন ফোন করছেন?
কাগজে লিখেছে বাসুদেব সেনগুপ্ত হার্ট অ্যাটাকে মারা গেছে। কিন্তু ঘটনাটা তা নয়।
রীণা চুপ করে থাকল।
শুনছেন?
হ্যাঁ।
হার্ট অ্যাটাক বটে, তবে হার্ট অ্যাটাকটা খুব নিপুণভাবে ঘটানো হয়েছিল।
তার মানে?
