অজু পোশাক ছেড়ে স্নান করতে গেল।
ছেলেটা খেতে ভালবাসে। শরীরের পরিশ্রমের জন্যই ওর খিদে বেশি। রীণা উঠল। গিয়ে দেখল টেবিলে খাবারদাবার ঠিকমতো সাজানো হয়েছে কি না।
রামু ছ’বছরের পুরনো লোক। সবই জানে। এও জানে এ বাড়ির কর্তার সঙ্গে অজুর সম্পর্ক ভাল নয়। তাই রামুর ব্যবহারে অজুর প্রতি সূক্ষ্ম অবহেলা থাকতে পারে, এই ভয়ে ছেলের খাওয়ার সময় রীণা কাছেপিঠে থাকে।
রান্নাঘরের দরজায় দাঁড়িয়ে রীণা রাঁধুনি অম্বিকাকে বলল, ফ্রিজের খাবার মাইক্রোওয়েভে বসিয়েছ?
না বউদি।
বসাও। অজু চানে গেছে। মাছটা রান্না হয়েছে তো?
হয়েছে।
তাড়াতাড়ি করো। ও মা। আলুভাজা এখনও চড়াওনি যে!
চড়াচ্ছি।
বিরক্ত রীণা বলে, আগে বসাওনি কেন? আলুভাজা হতে সময় লাগে, জানো না?
সরু করে কাটছি, হয়ে যাবে বউদি।
রীণা ফের লিভিংরুমে এসে বসল। খবরের কাগজগুলো সরিয়ে ফেলবে কি না ভাবল একবার। অজু অবশ্য খবরের কাগজ কমই দেখে। দেখলে খেলার পাতাটা। আর এই পাতাতেই খবরটা আছে।
না লুকিয়ে লাভ নেই। বরং দেখলে দেখুক। দশ বছরের বেশিই হয়েছে বাসুদেবের সঙ্গে সম্পর্ক বিচ্ছিন্ন হওয়ার। তখন অজুর দশ-এগারো বছর বয়স। লোকটা বোজ আসে কেন, মায়ের সঙ্গে এত কী কথা, এসব জিজ্ঞেস করত অজু। এবং বাসুদেবকে একদমই পছন্দ করত না সে। বাসুদেব এক নিষ্ঠুর প্রকৃতির পুরুষ। অজু তার ছেলে জেনেও কোনওদিন ছেলেটাকে কাছে ডাকেনি বা আদরটাদর করেনি।
রীণার হঠাৎ মনে হল আজ কি অজুর মাছটাছ খাওয়া উচিত? বাপ মরলে ছেলের তো হিন্দুমতে অশৌচ হয়। অশৌচের অন্যান্য নিয়ম পালন না-ই করল, অন্তত আমিষ খাওয়াটা বন্ধ রাখা উচিত নয় কি?
রীণা উঠে ফের রান্নাঘরের দরজায় এসে দাঁড়ায়।
অম্বিকা, একটা কাজ করো, আজ অজুকে মাছটাছ দিয়ো না।
অম্বিকা অবাক হয়ে বলে, দেব না?
না। তার চেয়ে বরং গরম ভাতে একটু ঘি দিয়ো। আর ফ্রিজে ছানা আছে, টক করে একটু ছানার ডালনা বেঁধে দাও।
তাতে তো সময় লাগবে বউদি।
লাগুক। আমি ওকে একটু বসিয়ে রাখবখন। ডালনার আলুটা মাইক্রোওয়েভে সেদ্ধ করে নাও। তা হলে ডালনা করতে দশ-পনেরো মিনিটের বেশি লাগবে না।
রীণার ভয়, এসব নিয়ম পালন না করলে যদি ছেলেটার অমঙ্গল হয়! অভিশাপ নিয়েই জন্মেছে। দিনরাত ওর মৃত্যুই কি কামনা করে না শঙ্কর?
প্রায় পনেরো মিনিট বাদেই বাথরুম থেকে বেরিয়ে ডাইনিং হলের টেবিলে মাকে দেখে অজু হাসল, হাই মা, মুখটা অমন শুকনো করে বসে আছ কেন?
নিজের মুখটা দেখতে পাচ্ছে না রীণা। বলল, এমনি।
মা ছাড়া অজুর আপনজন আর কেউ নেই, এটা একমাত্র রীগা জানে। তাই ছেলেটার জন্য তার বুকের মধ্যে একটা ভয় সবসময় পাখা ঝাঁপটায়। সে বেঁচে থাকতে থাকতে অজুটা যদি নিজের পায়ে দাঁড়িয়ে যায় তবেই রক্ষে।
শঙ্কর সংকীর্ণমনা নয়। তবু কিছুদিন আগে শঙ্কর রাতে শোওয়ার সময় তাকে বলেছিল, দেখো রীণা, আমার ইচ্ছে নয় যে, আমি মারা গেলে আমার বিষয় সম্পত্তি বা টাকাপয়সার ভাগীদার অজু হয়। মনে হয় ব্যাপারটা অজুকে আগে থেকে বলে রাখা ভাল। নইলে ওর হয়তো একটা এক্সপেকটেশন তৈরি হয়ে যাবে।
রীণা অসহায়ভাবে বলেছিল, কীভাবে বলব?
সেটা তোমার দায়িত্ব, আমার নয়। পিতৃপরিচয়টা মিথ্যে হলেও তোমার মুখ চেয়ে স্বীকার করে নিয়েছি। কিন্তু ওয়ারিশন হিসেবে ওকে মেনে নিতে পারি না।
আমাকে একটু সময় দাও। আমি ওকে বুঝিয়ে বলব।
সেটাই ভাল। আমার তো মনে হয়, ইট ইজ হাই টাইম টু টেল হিম দি টুথ। লেট হিম গো টু হিজ বায়োলজিক্যাল ফাদার অ্যান্ড লিভ উইথ দ্যাট স্কাউড্রেল। আমি তো অনেক দিন ওর দায়িত্ব পালন করেছি, যা আমার পালন করার কথাই নয়।
শঙ্করকে একটুও দোষ দেয় না রীণা। শঙ্কর বরং ভদ্রলোক বলেই সব সয়ে নিয়েছে। শুধু রীণার মুখ চেয়ে। শুধু এক অদ্ভুত ভালবাসা ও মায়া কাটাতে পারেনি বলে রীণার সব অমূলক শর্ত মেনে নিয়েও সে রীণাকে ছাড়তে চায়নি। পৌরুষের সব অপমান হজম করে গেছে। আজ যদি তার ক্ষতবিক্ষত মন কিছু বিদ্রোহ ঘোষণাই করে তাতে দোষ কোথায়?
কিন্তু রীণা যে জিনিসটা আজও বুঝে উঠতে পারে না, তা হল শঙ্করের তার প্রতি ভালবাসা। এরকমও হয়? এরকম কেন হয়? শঙ্কর কি ভীষণ ভাল একজন মানুষ? শঙ্কর কি খুব মহান?
অজু পোশাক পরে খেতে এল। এ সময়ে তার চোখে মুখে পেটের সাংঘাতিক খিদেটা ফুটে ওঠে।
মা, একটা ভাল খবর আছে। কী খবর? নেক্সট উইকে আমাদের প্র্যাকটিক্যাল ট্রেনিং-এর জন্য পুরী নিয়ে যাবে। এক সপ্তাহের টুর।
রীণা মৃদু স্বরে বলল, ভালই তো।
রামু খাবার নিয়ে এল। গোগ্রাসে খাচ্ছে অজু। বলল, বাঃ, আজ ঘি দিয়েছ! ফাইন!
রীণা সতর্ক গলায় বলল, আজ কিন্তু নিরামিষ।
ভ্রু কুঁচকে তাকাল অজু, নিরামিষ! নিরামিষ কেন?
এমনি।
অজু কাঁধ ঝাঁকিয়ে বলে, এন্টায়ার মিলটাই নিরামিষ। জীবনে শুধু নিরামিষ তো কখনও খাইনি।
আজ খা। খেয়ে দেখ, খারাপ লাগবে না। মাঝে মাঝে নিরামিষ খাওয়া স্বাস্থ্যের পক্ষে ভাল।
তার মানে এখন থেকে কি মাঝে মাঝেই নিরামিষ হবে নাকি?
সেটাই ভাবছি।
তা হলে বাইরে সাঁটাতে হবে।
রীণা দৃঢ় গলায় বলল, না। বাইরেও খাবে না।
বিস্মিত অজু বলে, বাইরেও না?
রীণা নরম হয়ে বলল, মাঝে মাঝে নিরামিষ খাওয়া যখন ভাল, তখন বাইরেই বা খাবি কেন? এটুকু সংযম নেই?
