একজন অতিশয় দক্ষ হত্যা-শিল্পী অত্যন্ত নিখুঁতভাবে একটা বদমাশকে দুনিয়া থেকে সরিয়ে দিয়েছে।
আমি কিছু বুঝতে পারছি না। প্লিজ। এবার ছাড়ছি।
ছাড়বেন? তা ছাড়তে পারেন। সেটা আপনার ইচ্ছে। কিন্তু ফোনের লাইন কেটে দিলেই কি সব ঘটনা থেকে নিজেকে বিচ্ছিন্ন করতে পারবেন মিসেস বোস? ইউ হ্যাভ এ পাস্ট।
রীণা ফোন ছাড়ল না, শক্ত করেই ধরে রইল। কিন্তু কিছু বলতেও পারল না সে, চুপ।
মিসেস বোস?
বলুন, শুনছি।
দ্যাটস গুড। কথার মাঝখানে লাইন কেটে দেওয়া আমার অপমানজনক বলে মনে হয়।
বুঝলাম। কিন্তু এসব কথা আমাকে কেন বলছেন?
বলার একটা গুরুতর কারণ আছে।
কী কারণ?
বাসুদেবের ফ্ল্যাটে তার মৃত্যুর পরদিন সকালে একজন লোক তাকে শেষ শ্রদ্ধা জানাতে এসেছিল। শ্রদ্ধাদ্ধা আসলে একটা হাস্যকর লোকদেখানো ব্যাপার। আপনি ভালই জানেন শ্রদ্ধা পাওয়ার মতো লোক বাসুদেব ছিল না। যারা এসেছিল নিতান্ত দায়ে পড়ে, ভদ্রতার খাতিরেই এসেছিল। যাকগে, যার কথা বলছিলাম। লোকটা গোয়েন্দা পুলিশের একজন টিকটিকি। নাম শবর দাশগুপ্ত। বাসুদেবের মৃত্যুটা যে অস্বাভাবিক তা সন্দেহ করার কারণ তার এখনও নেই। তবু বলে রাখি, সে বাড়ির দারোয়ান এবং আরও দু-একজনের সঙ্গে কথা বলে গেছে। হতে পারে হি হ্যাজ এ হাঞ্চ।
আমি কিছু বুঝতে পারছি না।
বুঝবেন। মানুষের মস্তিষ্ক এক অত্যাশ্চর্য স্টোরহাউস। এখন যা বুঝতে পারছেন না বলে মনে হচ্ছে তা হঠাৎ পরে এক সময়ে ঠান্ডা মাথায় ভাবতে গেলেই বুঝতে পারবেন। বাই দি বাই, আপনার ছেলেটির নাম যেন কী?
কেন?
এমনি জিজ্ঞেস করছি। ইচ্ছে না থাকলে বলবেন না।
না, বলতে বাধা কী? তার নাম অজাতশত্রু বসু।
বসু? ওঃ হ্যাঁ, হ্যাঁ, বসু ছাড়া আর কীই বা হতে পারে?
আপনি নোংরা এবং ইতর।
আমি? হাঃ হাঃ, হাসালেন ম্যাডাম। এনি ওয়ে, বাই..
৪. শবর দাশগুপ্তর মনটা ভাল ছিল না
আজ শবর দাশগুপ্তর মনটা ভাল ছিল না। পরাশর ঘোষালের কেসটা তাকেই দেওয়া হয়েছিল। কাজটা যন্ত্রণাদায়ক। পরাশর ঘোষাল তার সহকর্মী। এক ধাপ নীচের সহকর্মী এবং মোটামুটি বন্ধু মানুষ।
শবর জানে, পরাশরের অপরাধ গুরুতর। লালচাঁদ মার্ডার কেস এবং উলটোডাঙায় ডাকাতির দুটো ঘটনার মধ্যে যোগসূত্র খুঁজে পেয়ে ঘোষাল অত্যন্ত বিপজ্জনক জায়গায় চলে যায়। যে ট্রেলটি সে পেয়েছিল তাতে পুরো গ্যাং ধরা পড়ে যেত। কিন্তু মানুষের কিছু কিছু দুর্বলতা থাকেই। ঘোষাল ঘুষ খায় না, অতি সৎ মানুষ। তবে তার দুর্বলতা ছিল অন্য জায়গায়। তার একটি মাত্র সন্তান, তার ছেলে তন্বিষ্ঠ। ছেলের প্রতি দুর্বলতা কোন বাপের না থাকে? কিন্তু ঘোষালকে জব্দ করা হল ওই রন্ধ্রপথেই। গ্যাং থেকেই একজন একদিন ঘোষালকে ফোন করে বলল, স্যার, আমরা জানি, আপনি খুব ভাল একজন পুলিশ অফিসার। হয়তো আমাদের ধরেও ফেলবেন। কিন্তু আপনার ভালর জন্যই বলছি, কেসটা যদি আর এগোয় তা হলে উই উইল কিল–না স্যার, আপনাকে নয়, উই উইল কিল ইয়োর সান তন্বিষ্ঠা।
এই হুমকি রোজ আসত। ঘোষাল ধীরে ধীরে দুর্বল হয়ে পড়ল, নিস্তেজ হয়ে গেল। এমনকী গ্যাং-এর নির্দেশে সে কেসটা থেকে জরুরি কাগজপত্র সরিয়ে ফেলল। তদন্ত শুধু থেমেই গেল না, ঘুরেও গেল।
আজ সারা সকাল ঘোষালকে জেরা করতে হল শবরের।
ঘোষাল ঘামছিল, বারবার জল খাচ্ছিল। শেষে ধরা গলায় বলল, বলুন মিস্টার দাশগুপ্ত, আমার জায়গায় আপনি হলে কী করতেন?
শবর গম্ভীর গলায় বলল, আমি বিয়ে করিনি, কাজেই ছেলেপুলেও নেই। আমি আপনার প্রবলেম আপনার মতো করে বুঝতে পারব না। তবে ব্যাপারটা আপনি পুলিশকে জানালে পারতেন।
ঘোষাল রুমালে কপালের ঘাম মুছে বলল, হ্যাঁ পারতাম। জানাইনি, কারণ পুলিশ আমার ছেলেকে চব্বিশ ঘণ্টার প্রোটেকশন দিতে পারত না। হি ওয়াজ ইন মরটাল ডেনজার।
ঘোষালবাবু, পুলিশের চাকরিতে ওরকম কতই তো ফাঁকা হুমকি শুনতে হয়। ভয় পেলে চলে!
ফাঁকা! কে জানে ফঁকা কি না। তবে ছেলের জন্য আমি ভারী ভয় পেয়েছিলাম। আমি আপনার মতো সাহসী নই মিস্টার দাশগুপ্ত।
ঘোষালের সাসপেনশন অবধারিত। রিপোর্টের অপেক্ষা শুধু। শবরের তাই মন খারাপ। এক-একটা দিন এমন আসে যে, মনে হয় এ চাকরিটা না করতে হলেই ভাল ছিল।
এনকোয়ারির একদম শেষে ঘোষাল জিজ্ঞেস করেছিল, আমার কী হবে মিস্টার দাশগুপ্ত? চাকরি যাবে? আমার যে ঘুষের টাকা নেই। আমার যে অতি কষ্টেই সংসার চলে। চাকরি গেলে–
আপনি টাকাপয়সায় সৎ আমি জানি। কিন্তু দুর্বলতাও তো এক ধরনের ডেফিসিয়েন্সি। চারিত্রিক ডেফিসিয়েন্সি। ঘোষালবাবু, আমি ভাগ্যবিধাতা নই। আই উইশ ইউ গুড লাক।
স্নেহ, প্রেম, ভালবাসা–এসব জিনিস কি মানুষকে জরাব করে দেয় নাকি? অন্ধ স্নেহে সাধারণ বুদ্ধি, বিবেচনা, বিবেক বিসর্জন দিতে হলে তো দুনিয়া পিছন দিকে হাঁটতে থাকবে! ঘোষাল বুদ্ধিমান এবং দক্ষ একজন পুলিশ অফিসার। ডিপার্টমেন্টে তার সুনামও বড় কম নয়। পুত্রস্নেহে সে একটা কেস গুবলেট করে দিল এবং মেনে নিতে হল চাকরির ক্ষতিও। শবরের জানতে ইচ্ছে করে, যে ছেলের জন্য ঘোষালের এত দুর্বলতা, সেই ছেলে ভবিষ্যতে ঘোষালকে কী দেবে? আজকালকার ছেলেরা কি পিতৃঋণ কথাটা নিয়ে কখনও ভাবে? বাবা তাদের আইডল নয়, প্রতীক নয়, এমনকী তেমন মান্যগণ্যও কেউ নয়। বাবা শব্দটাই কত হালকা হয়ে গেছে এখন!
