কে?
শবর ঠান্ডা গলায় বলল, একটু কথা আছে। বাইরে এসো।
জানালা দিয়ে তাকে বোধহয় আরও একটু জরিপ করে নিল প্রকাশ। তারপর লুঙ্গি-পরা খালি গা যে-ছেলেটা বেরিয়ে এল তার মুখশ্রীতে খুব স্পষ্টই মস্তানির ছাপ। রং কালো, শরীরটা বেশ পেটানো, নাতিদীর্ঘ, পুরু ঠোঁট, ছোট চোখ, কোকড়া চুল। একটু আস্পর্ধার ভাব আছে মুখে চোখে। গলাতেও সেটা প্রকাশ পেল, কে আপনি মশাই?
শবর তার দিকে একটু চেয়ে থাকল নিষ্পলক। শবর বিশেষ লম্বানয়। বরং একটু ছোটখাটোর দিকেই। শরীর ছিপছিপে৷ তবু তাকে দেখে যারা যা বুঝবার তারা ঠিকই বুঝে যায়।
প্রকাশও বুঝল। চোখটা সরিয়ে নিয়ে বলল, আমিই প্রকাশ।
আমি লালবাজার থেকে আসছি, কিন্তু ভয় পেয়ো না। তোমার সঙ্গে কথা আছে। বাইরে চলো। বরং একটা গেঞ্জি গায়ে দিয়ে এসো।
প্রকাশ একটু ঘাবড়ে গিয়ে বলল, কিন্তু আমি কী করেছি স্যার?
বললাম তো, ভয় পেয়ো না। তোমার কাছে কয়েকটা কথা জানার আছে। ধরপাকড় করতে আসিনি।
প্রকাশ ঘরে গিয়ে গেঞ্জি নয়, পুরো প্যান্ট আর টি শার্ট পরে বেরিয়ে এল।
চলুন স্যার।
শবর তাকে নিয়ে পর দোকানেই এল।
এটা তোমার ঠেক?
হ্যাঁ স্যার।
চলো বসি।
দোকানে এখনও তেমন খদ্দের নেই। গরিব দোকান। বিস্কুট আর চা ছাড়া বোধহয় আর কিছু হয় না। জনা দুই রিকশা বা ঠেলাওলা গোছের লোক চা খাচ্ছে। বুড়ো মানুষটা চা বানাতে বানাতে একবার চোখ তুলে প্রকাশকে দেখল।
চা-টা স্যার আমিই খাওয়াচ্ছি।
খাওয়াও।
চায়ের কথা বলে দিয়ে প্রকাশ এসে পাশে বসল, এবার বলুন স্যার।
গত তেরো তারিখে আকাশ প্রদীপ বাড়ির আটতলার বাসুদেব সেনগুপ্ত মারা গিয়েছিলেন, জানো তো।
হ্যাঁ স্যার। বহুত টেটিয়া লোক।
শবর হাসল, কীরকম টেটিয়া?
আমরা স্যার, পাড়ার বেকার ছেলে। এ পাড়ায় নতুন কেউ ফ্ল্যাটট্যাট করে এলে আমরা কিছু পাই। কিন্তু বাসুবাবু আমাদের কুকুরের মতো তাড়িয়ে দিয়েছিলেন। উনি নাকি প্লেয়ার ছিলেন, ভিআইপি-দের অনেককে চেনেন, এসব বলে ভয়ও দেখিয়েছিলেন।
আচ্ছা, সেকথা থাক। আমি বলছি তেরো তারিখ সন্ধেবেলার কথা। সন্ধে সাতটা থেকে সাড়ে সাতটার মধ্যে উনি মারা যান হার্ট অ্যাটাকে।
সব জানি স্যার। লিফট খারাপ ছিল বলে উনি হেঁটে উঠতে গিয়ে বুকে খিচ হয়ে গেল। আমাদের গজু তো পুরো ব্যাপারটা দেখেছে।
গজু কে?
ওর নাম গিরিধারী। আমাদের বন্ধু। সন্ধেবেলা আকাশ প্রদীপের গ্যারেজের পিছনে বাথরুমে পেচ্ছাপ করতে গিয়েছিল। তখন দুটো লোক লিফট সারাতে আসে। তার পরেই বাসুদেববাবু এলেন। সব দেখেছে।
গজুকে কি পাওয়া যাবে?
যাবে। আপনি বসুন, আমি ডেকে আনছি। কাছেই বাড়ি।
প্রকাশ গেল এবং পাঁচ-ছ’ মিনিটের মধ্যেই একটা পাতলা ছিপছিপে ছেলেকে নিয়ে ফিরে এল।
প্রকাশ বলল, স্যারকে সব বল। লালবাজারের লোক। গজুর মুখটা সবসময়েই একটু হাসিহাসি। বেঞ্চে মুখোমুখি বসে লাজুক গলায় বলল, আকাশ প্রদীপের দারোয়ান হীরেন আমার বন্ধু স্যার। মাঝে মাঝে একতলায় গ্যারেজে দুপুরবেলা আমরা তাসটাসও খেলি। বাথরুম পেলে বাথরুমেও যাই।
বুঝেছি। আকাশ প্রদীপে তোমাদের একটা ঠেক আছে।
এখনও আছে, তবে সব ফ্ল্যাটে লোক এসে গেলে আর থাকবে না।
তুমি সেদিন সন্ধেবেলা ও বাড়িতে গিয়েছিলে?
হ্যাঁ স্যার। হীরেন চা খেতে গিয়েছিল। আমাকে বলে গিয়েছিল গেটটা একটু দেখতে। আমি টুলে বসেছিলাম। হঠাৎ দুটো নোক এসে বলল, তারা লিফট সারাতে এসেছে।
লোকদুটোর চেহারা কীরকম বলতে পারবে?
হ্যাঁ স্যার। প্যান্ট শার্ট পরা। মাঝারি লম্বা। অর্ডিনারি চেহারা। তা
দের হাতে কোনও যন্ত্রপাতি বা বাক্স গোছের কিছু ছিল?
না স্যার।
ফের দেখলে চিনতে পারবে?
গজু একটু হেসে বলল, বলা মুশকিল স্যার। হয়তো পারব।
তারা কী করল?
লিফটে ঢুকে কীসব করছিল। এরকম সময়ে আমি বাসুদেববাবুকে ফিরতে দেখলাম। উনি আমাদের একদম পছন্দ করেন না। তাই আমি উঠে বাথরুমে চলে গেলাম। কিছুক্ষণ পর বেরিয়ে দেখলাম উনি হীরেনকে খুঁজছেন। না পেয়ে কী ভাবলেন, তারপর সিঁড়ি দিয়ে উঠতে লাগলেন।
তারপর কী হল? মিস্ত্রিরা কিছুক্ষণ খুটখাট করে বেরিয়ে এল। একজন সিঁড়িটা দেখে নিয়ে অন্যজনকে বলল, চল। হয়ে গেছে। তারপর দুজনেই বেরিয়ে চলে গেল। তারা লিফটের দরজা বন্ধ করল না।
লিফটের দরজা খোলা রাখলে কী হয় তুমি জানো?
জানি স্যার। ও বাড়ির লিফটে মাঝে মাঝে আমরা ওঠা-নামা করি। দরজা ভালমতো বন্ধ না করলে লিফট চলে না।
দরজাটা কে বন্ধ করল, তুমি?
না স্যার। আমি ভাবলাম, মিস্ত্রিরা বোধহয় কিছু আনতেটানতে গেছে, আবার এসে সারাবে। তাই আমি লিফটের ধারে যাইনি। তবে আরও একটু বাদে চারতলার মৌলিকবাবুরা নেমে এলেন। মৌলিকবাবুই লিফটের দরজাটা বন্ধ করে দিয়ে বেরিয়ে গেলেন।
আর কিছু দেখেছ?
না স্যার।
শবর চা খেল। দোকানের চেহারা হতদরিদ্র হলেও চা-টা কিন্তু খারাপ নয়। গুঁড়ো চায়ের একটা বেশ ঝাঝালো গন্ধ আছে, দুধ চিনির মাপ চমৎকার।
শবর প্রকাশের দিকে চেয়ে বলল, বাসুদেববাবুর স্ত্রীর কাছে কত টাকা চেয়েছ?
প্রকাশ একটু ভয় খেয়ে বলল, আমরা একটু বেশিই চাই স্যার, কিন্তু পার্টি কি আর অত দেয়? দরাদরি করে অনেক নামিয়ে ফেলে।
বাসুদেববাবু আমার আত্মীয় হন।
প্রকাশ এক গাল হেসে বলল, তাই বলুন স্যার। উনি বলতেন বটে অনেক ভিআইপিকে চেনেন।
