ঘোষাল গুম হয়ে বসে রইল।
শবর সমবেদনার গলায় বলল, আপনাকে হয়তো একটা শশা কজ করা হবে। যদি স্যাটিসফ্যাক্টরি জবাব দিতে পারেন তা হলে সাসপেনশনটা এড়ানো অসম্ভব হবে না।
ঘোষাল তার দিকে চেয়ে থেকে হঠাৎ বলল, ছেলেটাকে আমি বড় ভালবাসি। একটু বেশিই বাসি। বেশি বয়সের সন্তান, আমাদের আর ছেলেপুলে হবেও না।
তাতে কী? একজনকেই মানুষ করুন।
ঘোষাল মাথা নেড়ে বলল, আপনি বুঝবেন না, ছেলেকে ভালবাসি বলেই ওকে নিয়ে আমার সবসময়ে দুশ্চিন্তা আর ভয়। একটু জ্বরটর হলে একটু কেটেকুটে গেলেও আমি অস্থির হয়ে পড়ি। এত উদ্বেগ আর অশান্তি নিয়ে ওকে বড় করব কী করে বলুন তো? এই যে কেসটা খারাপ হয়ে গেল, এর জন্যও তো সেই ভয়টাই দায়ী। বুঝতে পারছেন?
পারছি ঘোষালবাবু।
আমি প্রভিডেন্ট ফান্ড ডিপার্টমেন্ট থেকেই ঘুরে এলাম। যা পাওয়া যাবে তা যথেষ্ট নয়। একটা এলআইসি আছে এক লাখ টাকার। সেটাও বেশি কিছু নয় এই বাজারে। তবু হয়তো চলে যাবে। কী বলেন?
কী সব বলছেন আপনি?
ঘোষাল মাথা নেড়ে বলে, চাকরি তো দূরের কথা বেঁচে থাকাটাই আমার কাছে দুঃসহ।
কেন এরকম ভাবছেন?
কী জানি! বলে ঘোষাল অসহায়ভাবে হাত ওলটাল। তারপর উঠে টলতে টলতে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল।
শবর চুপ করে বসে রইল কিছুক্ষণ। ভয় দেখানোটা একটা অপরাধ। কারণ ভয় দেখাতে দেখাতে একটা লোককে স্বাভাবিক থেকে অস্বাভাবিক মানসিক অবস্থায় ঠেলে দেওয়া যায়। ভয় থেকে মানুষ অনেক অন্যায় করে ফেলতে পারে। খুন অবধি। ভয় এক ভয়ংকর জিনিস। আর ভয় একবার পেয়ে বসলে সহজে তাকে ছাড়ানোও যায় না।
রিপোর্টটা আজ শেষ করতে পারল না শবর।
সে উঠে গিয়ে ঘোষালের ঘরে তার খোঁজ করল।
নন্দী বলল, উনি তো স্যার, একটু আগে চলে গেলেন।
ঘোষালের বাড়িতে টেলিফোন আছে, শবর জানে। সে বলল, ওর টেলিফোন নম্বরটা দিতে পারেন?
নিশ্চয়ই। বলে নন্দী একটা কাগজের টুকরোয় নম্বরটা লিখে শবরের হাতে দিয়ে বলল, এই যে স্যার।
শবর ঘরে ফিরে আধঘণ্টা অপেক্ষা করে নম্বরটা ডায়াল করল।
একজন মহিলা ফোন ধরলেন, সতর্ক গলায় বললেন, কে বলছেন?
লালবাজার থেকে বলছি, ঘোষালবাবু ফেরেননি?
না তো! উনি তো ওখানেই গেছেন।
আপনি কি ওঁর স্ত্রী?
হ্যাঁ।
আমি শবর দাশগুপ্ত।
ও আচ্ছা। আপনার কথা ওঁর কাছে শুনেছি। কী ব্যাপার বলুন তো! ওঁর কি চাকরিটা যাবে? উনি খুব ভাবছিলেন।
চাকরি যাবে না। কিন্তু আপনি ওঁকে একটু চোখে চোখে রাখবেন।
কেন বলুন তো!
উনি স্ট্রেস-এর মধ্যে আছেন।
তার মানে? মানসিক চাপ।
হ্যাঁ, তা তো আছেনই। রাতে ঘুমোত পারেন না। সর্বক্ষণ ছেলেকে নিয়ে দুশ্চিন্তা করছেন।
আপনার ছেলে কত বড়?
এই তো, আট বছর। ছেলেও বাপের ভীষণ ভক্ত। কিছু বদমাশ তোক ছেলেকে কিডন্যাপ করবে, মেরে ফেলবে বলে ভয় দেখাত বলে উনি এমন পাগলের মতো হয়ে গেলেন।
আপনিও কি ভয় পেয়েছেন?
পাব না? খুবই ভয় পেয়েছি। তবে আমি ওঁর মতো অতটা ভেঙে পড়িনি।
ভয় পাওয়ারই কথা। যাই হোক, ঘোষালবাবুকে একটু নজরে রাখবেন। আমি পরে খোঁজ নেব।
না, শবরের মন ভাল নেই, ফোনটা রাখার পর আবার তার একটা অস্বস্তি হচ্ছিল।
নিতান্ত ডাইভারশনের জন্যই সে জিপ নিয়ে বেরিয়ে পড়ল। বালিগঞ্জ ফাঁড়িতে এসে বড় রাস্তায় জিপ রেখে পায়ে হেঁটে পাড়ায় ঢুকল। ভয়–এই শব্দটাই বড় ভয়ংকর। এ যুগে দুটো স্পষ্ট দল দেখা যাচ্ছে। এক দল ভয় দেখায়, অন্য দল ভয় পায়।
‘আকাশ প্রদীপ’ বাড়িটার সামনে সে দাঁড়াল। গ্রিলের গেটের ভিতরে একটা লোক টুলের ওপর বসে হাই তুলছে। দারোয়ান হীরেন। সে ভিতরে ঢুকে হীরেনের সামনে দাঁড়াতেই সে উঠে পড়ে একটা সেলাম গোছের কিছু করে বলল, বলুন স্যার।
তুমি কি এ পাড়ার ছেলে?
আমার বাড়ি লাইনের ওধারে।
প্রকাশ বা কালুকে চেনো?
হীরেনের চোখে একটা ভয় ঘনিয়ে উঠল, চিনি স্যার।
কোথায় পাওয়া যাবে ওদের?
হীরেনের বাঁকবজিতে একটা সস্তা ইলেকট্রনিক ঘড়ি। টাইমটা দেখে নিয়ে সে বলল, এখন স্যার, বিকেল পাঁচটা বাজে। এ সময়ে ওরা থাকে না বড় একটা। তবে একটু এগিয়ে গিয়ে মোড়টা পেরোলে ডানদিকে পন্টুর চায়ের দোকান দেখবেন। এখানেই ওদের আড্ডা।
প্রকাশ থাকে কোথায়? আরও এগিয়ে বাঁয়ে লন্ড্রি দেখবেন, তার পিছনের বস্তিতে। লন্ড্রি ঘেঁষেই ঢোকার গলি।
ঠিক আছে।
আমি চিনিয়ে দিয়ে আসব স্যার?
না, আমি একাই ভাল।
পন্টুর দোকানে কেউ ছিল না। একজন বুড়োমতো লোক গামছা পরে বসে হাওয়া দিয়ে আঁচ তুলছিল। সময় নষ্ট না করে শবর এগিয়ে গেল। লন্ড্রির পাশের গলি দিয়ে ভিতরে ঢুকে একটা বেশ পরিচ্ছন্ন বস্তির উঠোনে পৌঁছল সে।
উঠোনটা পাকা না হলেও ইটে বাঁধানো। বিকেল পাঁচটা বাজলেও এখনও উঠোনে উনুন ধরানো হয়নি। তার মানে হয়তো বেশিরভাগ ঘরেই গ্যাস উনুন আছে। ইলেকট্রিকের কানেকশন যে আছে তা দেখতেই পাচ্ছিল শবর।
তিন-চারটে বাচ্চা খাপরা ছুঁড়ে ছুঁড়ে খেলছিল। এদের নানারকম খেলা আছে। নিত্য নতুন খেলা বানিয়েও নেয়। ওদের মধ্যে বড়জন ফ্রক পরা একটা মেয়ে। শবর তাকেই জিজ্ঞেস করল, প্রকাশের ঘর কোনটা বলো তো?
ওই যে। মেয়েটা আঙুল তুলে দেখাল।
ডানদিকের শেষ প্রান্তের ঘরটার সামনে গিয়ে শবর অনুচ্চ স্বরে ডাকল, প্রকাশ!
অপরাধীদের প্রতিক্রিয়া হয় দ্রুত। শবর ডাকতেই ঘরের জানালা টুক করে খুলে গেল।
