আমি ভিআইপি নই, সাধারণ গোয়েন্দা মাত্র।
আমাদের কাছে আপনিই ভিআইপি। ঠিক আছে স্যার, মাসিমাকে বলে দেবেন, কিছু দিতে হবে না।
আরে না। ছাড়বে কেন? কিছু নিয়ো।
কত নেব স্যার, দু-চারশো টাকা?
অত কম নয়। হাজার টাকা চেয়ে।
ঠিক আছে স্যার।
শবরের মন ভাল নেই। একটা অস্বস্তি হচ্ছে। বাসুদেবের মৃত্যুটা যে ঘটানো হয়েছে এতে তার আর সন্দেহ নেই। ইচ্ছে করলে সে ব্যাপারটা নাড়াঘাটা নাও করতে পারে। দুনিয়ার সব ঘটনার সমাধান কি হয়?
সে উঠল। বলল, আজ চলি। মনে হচ্ছে তোমাদের সঙ্গে আবার দেখা হবে।
গজু হঠাৎ বলল, স্যার বাসুদেববাবুর কেসটায় কি কিছু গড়বড় আছে?
শবর একটা শ্বাস ফেলে বলল, আছে গজু। হয়তো তোমাকে সাক্ষীও দিতে হতে পারে।
সাক্ষী দিলে কি স্যার মালকড়ি কিছু পাওয়া যাবে?
এমনিতে পাওয়া যায় না। তবে তোমার ব্যাপারটা আমি দেখব।
গজু একটু থ্রিল অনুভব করছে। বেশ খুশিয়াল গলায় বলল, কখনও সাক্ষী ফাক্ষি দিইনি স্যার। টিভিতে দেখাবে?
না। তবে কাগজে নাম উঠতে পারে।
উরেব্বাস৷ হেভি কেলো।
শবর বড় রাস্তায় এসে জিপে উঠল।
রাত দশটার পর সে ঘোষালের বাড়িতে ফোন করল।
ঘোষালগিন্নি একটু উত্তেজিত গলায় বললেন, উনি এইমাত্র ফিরলেন। কিন্তু ঘোর মাতাল অবস্থায়। কী হচ্ছে বলুন তো। উনি তো জীবনে কখনও এসব খাননি।
খুব মাতলামি করছেন?
মাতলামি করবে কী, উঠতেই পারছে না। ট্যাক্সিওলা ধরে ধরে ঘরে পৌঁছে দিয়ে গেল। তারপর একরাশ বমি করে এখন অচৈতন্য।
তা হলে ঘুমোতে দিন। সকালে ঘুম ভাঙলে ভাল করে পেট ভরে ব্রেকফাস্ট খাইয়ে দেবেন। ঠিক হয়ে যাবে।
আমার ভীষণ ভয় করছে। খুব হ্যাপি ফ্যামিলি ছিলাম আমরা, সব যে ভেঙে পড়ছে!
মানুষের খারাপ সময় তো আসে বউদি। কেটেও যায়।
ওঁর কোনও বিপদ হবে না তো? আপনি অভয় দিচ্ছেন?
দিচ্ছি।
চাকরি গেলে বা সাসপেন্ড হলে উনি বোধহয় মনের দুঃখেই মারা যাবেন।
আপনি অত ভাববেন না। সকালে আমি টেলিফোনে ওঁর সঙ্গে একটু কথা বলব।
বলবেন প্লিজ! উনি ভাল লোক, কিন্তু একটু একগুয়ে।
শবর টেলিফোন রেখে অন্ধকার ঘরে বিছানায় শুয়ে ঘোষালকে নিয়ে অনেকক্ষণ ভাবল। ভয়? ভয়ের ওপরে ওঠা মানুষের পক্ষে খুব শক্ত ব্যাপার। ভয় এক সাংঘাতিক জিনিস।
শবর ঘুমোল।
সকালে টেলিফোন করতেই ঘোষালগিন্নি প্রায় চেঁচিয়ে উঠলেন, মিস্টার দাশগুপ্ত, উনি বিষ খেয়েছেন।
বিষ!
হ্যাঁ, সকালে উঠে বাথরুমে গিয়েছিলেন। আমি চা করছিলাম। চা নিয়ে এসে দেখি উনি একটা পোকা-মারা বিষের টিন থেকে ঢকঢক করে খাচ্ছেন।
হাসপাতালে শিট করা হয়েছে?
অ্যাম্বুলেন্স আসছে। কী হবে মিস্টার দাশগুপ্ত?
আমি যাচ্ছি। শক্ত থাকুন। কতটা খেয়েছেন?
তা জানি না। আমি হাত থেকে কেড়ে নিয়েছিলাম।
শবর ফোন রেখে দ্রুত পোশাক পরে নিল। ঘোষালের মৃত্যুর প্রত্যক্ষ কারণ কি সে? শবর ভাবছিল, এও কি এক ধরনের প্যাসিভ মার্ডার? মানুষ যে আসলে কত অসহায় তা ভাবলে অবাক হতে হয়।
৫. কথাটা বলে দিতে চাই
আমি ওকে কথাটা বলে দিতে চাই।
কেন চাও? এতদিন পর কেন চাইছ?
ইট মাস্ট এন্ড সামহোয়ার। অভিনয় করে যাওয়ার আর কোনও মানে হয় না। সত্যটা প্রকাশিত হোক।
তুমি তো কোনওদিন ওর বাবার ভূমিকায় অভিনয় করোনি। তুমি তো ওকে সারাজীবন বুঝিয়েই দিয়েছ যে, তুমি ওর কেউ নও। আবার নতুন করে কেন তা বোঝাতে যাবে?
ওর আসল বাবা কে তা কি ওর জানা উচিত নয়?
কী দরকার? আমি যা করেছি তার শাস্তি আমি পাব। ওকে কেন? ওর তো কোনও দোষ নেই।
সমাজে ও আমার পরিচয়ে পরিচিত হবে কেন?
শোনো, ও কি আর এখন ওর স্কুলকলেজের সার্টিফিকেটে বাবার নাম বদলাতে পারবে? পারবে না। উপরন্তু ওকে যদি সব বলে দাও তা হলে ও পাগলের মতো হয়ে যাবে। ওর এত ক্ষতি তুমি করবে কেন?
আমি ওকে আমার ইনহেরিটর করতে চাই না রীণা। তোমাকে আগেও বলেছি। দীর্ঘদিন আমার টাকায় ও প্রতিপালিত হয়েছে। এডুকেশন, বোর্ড অ্যান্ড লজিং, একটা পাপের পিছনে আমার গুনোগার কিছু কম দিতে হয়নি। কিন্তু আর নয়।
যদি অজুকে এসব বলার এতই জরুরি দরকার ছিল তোমার তা হলে সেটা বাসুদেব বেঁচে থাকতে বলোনি কেন?
তাতে কী হত?
তাতে ও অন্তত বাসুদেবের সামনে গিয়ে দাঁড়াতে পারত, তাকে প্রশ্ন করতে পারত, বাসুদেবকে বাধ্য করতে পারত ওর ভার নেওয়ার। কেন তা করোনি?
শঙ্কর টক করে প্রশ্নটার জবাব দিতে পারল না।
রীণার দু’চোখ বেয়ে জল পড়ছিল। কান্না জড়ানো গলায় সে বলল, তুমি কি বাসুদেবকে ভয় পেতে?
শঙ্কর দুর্বল গলায় বলল, ভয়! ভয় কেন পাব?
তা হলে বলোনি কেন? তুমি তো বাসুদেবকেও গিয়ে বলতে পারতে, তোমার ছেলের ভার তুমি নাও, আমাকে রেহাই দাও!
বাসুদেবের মুখ দেখতে আমার ঘেন্না হত।
বাসুদেব আর আমি সমান অপরাধী। তুমি আমাকে ঘেন্না করো না?
না।
কেন করো না শঙ্কর?
সেটা তুমিই বলল।
তুমি আমাকে ভালবাসো। এতটাই বাসো যে, আমার সব অপরাধ তুমি মেনে নিয়েছ। এরকম ভালবাসা বোধহয় পৃথিবীতে আর কখনও ঘটেনি। আমি সেজন্য তোমাকে মনে মনে পুজো করি। তোমার জন্যই বেঁচে আছি শঙ্কর। আমাকে আর একবার দয়া করো, অজুকে কিছু বোলো না।
কিন্তু ইনহেরিটেন্স?
শোনো শঙ্কর, ওকে কিছু দিয়ো না তুমি। বাসুদেব ওর জন্য একটা ব্যবস্থা করে গেছে।
শঙ্কর অবাক হয়ে বলে, কী ব্যবস্থা?
