স্কুল ফাইনাল পরীক্ষায় বাংলায় অনেকদিন আগে একটা রচনা এসেছিল, কোনও মহাপুরুষের জীবনী। একটা ছেলে লিখেছিল, আমি একজন মহাপুরুষকে রোজ দেখতে পাই চোখের সামনে। তিনি সামান্য বেতনের একজন কর্মচারী। সংসার চালাতে তাকে উদয়াস্ত পরিশ্রম করতে হয়। তার একখানা মাত্র জামা, একখানা মাত্র কাপড়। সন্ধেবেলা এসে সেগুলো কাঁচেন, সকালবেলা ফের পরে বেরোন। তিনি কখনও কারও বিরুদ্ধে অভিযোগ করেন না, মিথ্যে কথা বলেন না, ভাগ্যকে দোষ দেন না। উপদেশ দিতেও তিনি ভালবাসেন না। এই মহাপুরুষটি হলেন আমার বাবা। এঁর জীবনী কখনও কোনও ইস্কুলে পড়ানো হবে না, এর কথা কেউ জানতেও পারবে না কখনও, কিন্তু আমার কাছে এমন মহাপুরুষ আর কে?…
দীর্ঘ রচনাটি পড়ে শবরের ইস্কুলমাস্টার জ্যাঠামশাই বাড়িসুদ্ধ লোককে তা পড়ে শুনিয়েছিলেন। তারপর বলেছিলেন, এমন সোনার টুকরো ছেলেকে কি এক নম্বরও কম দিতে পারি? কুড়িতে কুড়িই পেয়েছিল সেই ছেলেটা।
শবর ভাবছিল, এখনকার কোনও ছেলে কি আর তার বাবার ভিতরে মহাপুরুষ খুঁজে পায়?
দুপুরে ঘোষালের রিপোর্টটাই লিখছিল শবর, এমন সময়ে মধুমিতার ফোন এল।
টুকুদা, একটা প্রবলেম হয়েছে।
কী প্রবলেম?
পাড়ার একটা ক্লাবের কিছু ছেলে আমার শাশুড়ির কাছে টাকা চাইছে। পাড়ায় নতুন বাড়ি বা ফ্ল্যাটে কেউ এলে নাকি ওদের টাকা দিতে হয়।
ক্লাবটার নাম কী?
সবুজ সংঘ।
কত টাকা চাইছে?
সে অনেক টাকা। কুড়ি হাজার।
লোকাল থানায় জানিয়েছিস?
জানানো হয়েছে। তারা এসেছিল। কিন্তু সবুজ সংঘের সেক্রেটারি বলেছে, ক্লাব থেকে টাকা চাওয়া হয়নি। পাড়ার কিছু মস্তান ছেলে এসব করে।
এই প্রথম চাইল, না আগেও চেয়েছে?
শ্বশুরমশাই বেঁচে থাকতেও নাকি একবার এসেছিল। উনি কেমন মানুষ ছিলেন তা তো জানোই। রাগারাগি, চেঁচামেচি করে আর হুমকি দিয়ে ছেলেগুলোকে তাড়ান। কিন্তু শাশুড়ি তো তা পারবেন না। উনি ভয় পাচ্ছেন। তুমি কিছু করতে পারো না?
পারি। কিন্তু তাতে তোর শাশুড়ির প্রবলেম হয়তো বাড়বে।
ছেলেগুলো প্রতিশোধ নেবে বলছ?
সেটাই সম্ভব।
তা হলে?
অর্ক আর বুদ্ধকে বল ছেলেগুলোর সঙ্গে একটা মিটমাটে আসতে। ওদের বলুক যে, ফ্ল্যাটওনাররা সবাই এলে মিটিং করে একটা থোক টাকা দিয়ে দেওয়া হবে। ইনডিভিজুয়ালি দেওয়া হবে না।
ওরা যে ভয় দেখাচ্ছে। তুমি নেগোশিয়েট করতে পারো না?
শবর একটু ভেবে বলল, পারি, ছেলেগুলোর কারও নাম বলতে পারবি?
একজনের নাম প্রকাশ, আর একজন কালু। প্রকাশ নাকি বড় মস্তান, খুনখারাপিও করেছে।
ঠিক আছে।
আরও একটা কথা।
বল।
শ্বশুরমশাইয়ের একটা এলআইসি পলিসি পাওয়া গেছে, যার নমিনি অজাতশত্রু বসু।
সে আবার কে?
মধুমিতা একটু হেসে বলল, শ্বশুরমশাইয়ের অবৈধ সন্তান।
ওঃ, মাই গড! কত টাকার পলিসি?
পাঁচ লাখ।
হুঁ, তা এ ব্যাপারে তো আর আমার কিছু করার নেই রে।
না, তা নেই। কিন্তু পলিসিটা বেরোবার পর বাড়িতে প্রচণ্ড অশান্তি হচ্ছে।
কার সঙ্গে কার?
সকলের সঙ্গে সকলের, অর্ক আর বুদ্ধ তো ঠিক করে ফেলেছে তারা বাপের শ্রাদ্ধশান্তি করবে না। শাশুড়ি কান্নাকাটি করছেন।
কিন্তু পলিসিটার কী হবে?
সেটাই তোমার কাছে জানতে চাইছি। নমিনি বদল করা যায় না?
আমি কি সবজান্তা? উকিলের সঙ্গে কথা বলতে বল।
আর একটা কথা তোমাকে জানাতে বলেছে অর্ক।
কী কথা?
লিফট কোম্পানির লোক এসেছিল। অর্কই তাদের টেলিফোন করে জানিয়েছিল, লিফট খারাপ ছিল বলেই শ্বশুরমশাই সিঁড়ি ভেঙে উঠতে গিয়ে মারা যান। লিফট কোম্পানির লোকেরা বলে গেছে, সেদিন তাদের সার্ভিসিং-এর কোনও লোক এ বাড়িতে আসেনি।
শবর সংক্ষেপে বলল, ও।
আচ্ছা টুকুদা, তুমি নাকি শ্বশুরমশাইয়ের মৃত্যুটা স্বাভাবিক নয় বলে সন্দেহ করছ?
কে বললে?
অর্কই বলছিল। তুমি নাকি দারোয়ানকে জেরা করে গেছ সেদিন।
ও কিছু নয়।
ফাউল প্লে বলে সন্দেহ হয়?
হতেই পারে। তবে জল ঘোলা করে লাভ নেই। প্রমাণ করা শক্ত।
তুমি তো শক্ত কাজই ভালবাসো।
তোর কি ধারণা আমি সবকিছুর মধ্যেই রহস্য খুঁজে বেড়াই? দারোয়ানকে কয়েকটা কথা জিজ্ঞেস করেছিলাম, কারণ ঘটনাটার টাইমিং কিছু অদ্ভুত এবং একটু যেন সাজানো। দারোয়ানটা অবশ্য কিছু বলতে পারেনি।
তোমার কী ধারণা?
কোনও ধারণা নেই।
সত্যি করে বলো না টুকুদা, শ্বশুরমশাইকে কি কেউ খুনটুন করতে চেয়েছিল নাকি?
বললাম তো, জানি না।
আচ্ছা, আমরা যদি চাই তা হলে তদন্ত করবে তুমি?
দূর বোকা! এত সহজ নাকি? খুন কি না তার ঠিক নেই, তদন্তের কথা উঠছে কেন?
অর্কও যে সন্দেহ করছে।
তা হলে অর্ককে বল লোকাল থানায় ডায়েরি করতে।
তারপর কী হবে?
আগে লোকাল থানা রিপোর্ট দিক, তারা যদি না পারে তখন গোয়েন্দা পুলিশ কেস হাতে নিতেও পারে। তখন দেখা যাবে।
আচ্ছা, আমি অর্ককে বলছি একটা ডায়েরি করতে। আবার জিজ্ঞেস করছি, ডায়েরি করাই কি ঠিক হবে?
হুঁ।
ভাল করে বলো।
হ্যাঁ, করুক।
তারপর তুমি কেস হাতে নেবে তো?
গাছে কাঁঠাল, গোঁফে তেল। ডায়েরি হোক তো।
ফোন ছেড়ে শবর তার রিপোর্ট লিখতে লাগল। ঠিক এই সময়ে ঘোষাল ফের ঘরে ঢুকল।
মিস্টার দাশগুপ্ত?
হ্যাঁ, বলুন।
আই অ্যাম ফিনিশড।
শবর মৃদুস্বরে বলল, আপনি যা করেছেন তাতে ভবিষ্যতে আপনার ছেলেও আপনাকে শ্রদ্ধা করবে না। কাওয়ার্ডরা শ্রদ্ধা পায় না ঘোষালবাবু।
