কাউকে বেশি ভাল লাগে না?
কাউকে অন্য কারও চেয়ে বেশি ভাল লাগতে পারে। তবে সকলেরই আলাদা রকমের ইন্টারেস্টিং পয়েন্ট আছে।
ধর, কারও সঙ্গে প্রেম করিস না?
–প্রেমই তো। শুধু আন্ডারওয়্যার পরে বসে ছিল বীরু বেতের গোল চেয়ারে। লম্বা পা দুখানা সামনে ছড়ানো। এমনভাবে প্রেমই তো বলল, যেন ভিয়েতনামে মার্কিন নীতির নিন্দে করছে।
–তোর গার্ল ফ্রেন্ডদের মধ্যে সবচেয়ে সুন্দর কে?
–কে সুন্দর নয়! হাসল বীরু-সবাই নিজের মতো করে সুন্দর। আমি একদম হারিয়ে যাই ওদের মধ্যে। আজকাল আমার এমন হয়েছে যে রাতে শুয়ে যদি কারও কথা ভাবি তা হলে ওর চোখ ওর মুখে এসে বসে, এর ঠোঁট তার মুখে চলে যায়। বিশেষ কাউকে মনে পড়ে না। সে এক ভারী ঝামেলা। শোওয়ার সময়ে বিশেষ একজনকে ভাবতে ইচ্ছে করে, পারি না।
কাকে?
রোজ তো একজনকে নয়!
–তোর বন্ধুদের মধ্যে একজন আছে না, গৌরী! মাতাল মনোরম বলে ফেলল।
একটু স্থির হয়ে যায় বীরু, তারপর বলে, জানলে কী করে?
মনোরম মনে মনে ভয় পেয়ে যায়। কিন্তু ফেরার উপায় নেই।
খুব চালাক হওয়ার চেষ্টা করে বলল–গৌরী তো কমন নাম! আন্দাজে টোপ ফেললাম একটা।
–আন্দাজে! বলে একটু হাসে বীরু, তারপর বিষণ্ণ মুখে বলে–আন্দাজে হলেও লাগিয়েছ ঠিক। গৌরী একজন আছে।
-সে আসে?
–আসবে কী, সে এখন নার্সিং হোমে!
–কেন?
–বড্ড বোকা মেয়ে। আজকাল কেউ যে অত বোকা আছে তা জানতাম না।
মনোরম ধৈর্যভরে পান করল আর একটুক্ষণ।
কী হয়েছে?
–অ্যাকলেমশিয়া। তার ওপর ডানদিকটা পড়ে গেছে।
–সে সব তো বাচ্চাটাচ্চা হলে হয়।
তাই তো হয়েছে। প্রি-ম্যাচিওর বাচ্চা একটা।
কী করে হল?
–যেমন করে হয়। আজকাল যে এমন বোকা মেয়ে আছে, কে জানত! প্রেগন্যান্সিটা কেবলই অস্বীকার করে যেত। অথচ আমরা জানতাম। আমার মতো ওর অনেক বিশ্বস্ত এবং সৎ বন্ধু ছিল। ও স্বীকার করলে আমরা খুব সেফলি ব্যাপারটা মিটিয়ে ফেলতাম, কেউ জানত না। ও লজ্জায় কোনওদিন স্বীকার করেনি।
বাঁচবে?
চান্স কম। প্রচুর হেমারেজ হয়েছে। কোমায় পড়ে আছে। কথাটথা বলতে পারে না, জ্ঞানও ঠিক নেই। কাল থেকেই মনটা তাই খারাপ। মাঠ থেকেও সেজন্যই তাড়াতাড়ি চলে এলাম।
-তুই ওকে ভালবাসিস না বীরু?
বাসি। বিশেষ করে আজ তো ওকেই ভালবাসছি। কষ্ট হচ্ছে। কষ্ট হওয়া তো ভালবাসাই, না?
–ও যদি বাঁচে?
–খুব ভাল হয় তা হলে। আমি একটা পার্টি দেব।
বিয়ে করবি ওকে বীরু?
–বিয়ে? বীরু তাকায়। একটু ভাবে। তারপর বলে–ওকেই কেন করব?
বড় ভাল দেখতে মেয়েটা।
–কোথায় দেখলে? একটুও বিস্মিত না হয়ে সাধারণভাবে প্রশ্ন করে বীরু।
-দেখেছি।
-হ্যাঁ, ভালই। বিয়ে ওকেও করতে পারি। কোনও প্রেজুডিস নেই।
–কে ওকে প্রেগন্যান্ট করল?
-কে জানে। যেই হোক, গৌরীর সাবধান হওয়া উচিত ছিল। ওরই দোষ। মুঠো মুঠো ট্যাবলেট বাজারে বিক্রি হয়! কত মেয়ে নিজেরাই গিয়ে কেনে। ওরই কেবল লজ্জা আর লজ্জা।
-তুই ওকে বিয়ে করিস বীরু।
–আগে বাঁচুক তো! তুমি কি আরও খাবে? খেয়ো না। গাড়ি নিয়ে যাবে তো, না খাওয়াই ভাল। আমি আজ বাড়ি ফিরছি না। আর একটু খেয়ে পড়ে থাকব।
বাড়িতে খবর দেব?
–না না, কোনও দরকার নেই। মাঝে মাঝে আমি ফিরি না, সবাই জানে। তুমি যাও।
শূন্য গেলাস রেখে মনোরম উঠে এসেছিল।
সেই একটা সুদিন এসেছিল। তার পরদিন থেকেই বীরু আবার আলাদা মানুষ। গ্রাহ্য করে না, তাকায় না। কথা তো নেই-ই, আবার একজন অচেনা মানুষ হয়ে যায় বীরু।
খুঁজে খুঁজে নার্সিং হোমটা বের করেছিল মনোরম। মেয়েটা বেঁচে গেছে। বীরু আবার গাড়ি দাবড়াচ্ছে। মেয়েদের নিয়ে যাচ্ছে অ্যাপার্টমেন্টে। ওর ঘরে উদ্দাম বেজে যাচ্ছে স্টিরিওতে নাচের বাজনা। মনোরমের কথা কি মনে রেখেছে বীরু? না ভুলে গেছে?
ও কি উদাসীন সন্ন্যাসী? ও কি পাষণ্ড?ওকে ঠিক বুঝতে পারে না মনোরম। একেই কি জেনারেশন গ্যাপ বলে? বীরুর পিছু নিতে নিতেই মনোরম তার পোশাক পালটে ফেলল। রাখল বড় চুল, জুলফি। দিশি গাড়িটা নিয়ে সে যেমন বীরুর ফিয়াটের সঙ্গে তার দূরত্বটা কমিয়ে আনার চেষ্টা করেছে, তেমনি জেনারেশন গ্যাপটাও অতিক্রম করার চেষ্টা করেছে।
.
সেই মায়াদয়াহীন মুখখানা! বীরু বসে আছে টেবিলের উল্টোদিকে। ফাইলপত্র ঘাঁটছে। মনোরম অস্বস্তির সঙ্গে চেয়ে ছিল।
ফাইলটা বন্ধ করে বীরু মুখ তুলল। হঠাৎ আতৃঙ্কিত আনন্দে মনোরম দেখে ও হাসছে।
-তোমার বউকে কাল দেখলাম।
–কে! কার কথা বলছিস?
—তোমার বউ সীতা।
সীতা! বউ! বউদি নয়? একটু অবাক হয় মনোরম।
-কোথায়?
নিউ মার্কেটে। শি হ্যাড কোম্পানি।
–ওঃ! তোকে চিনল?
–এক-আধবারের দেখা, ঠিক চিনতে পারেনি। আমি চিনেছি। মেয়েদের মুখ আমার মনে থাকে।
–কথা-টথা বললি?
-হুঁ। সেইটেই একটা ভুল হয়ে গেল।
ভুল?
-চিনতে পেরেই হঠাৎ বউদি বলে ডেকে ফেলেছিলাম। খুব ঘাবড়ে গেল। তাই এগিয়ে গিয়ে পরিচয় দিলাম। একটু কষ্টে চিনল। দু-চারটে কথাবার্তা হল।
বউদি বলে ডাকলি?
তবে কী বলে? বউদিই তো হয়। ছাই সেটাও একটা গণ্ডগোল হয়ে গেল।
–কেন?
সঙ্গে যে লোকটা ছিল, ওয়েলবিল্ট কেম্যান, সে লোকটা আমার দিকে ভীষণভাবে চেয়ে রইল। আমি বউদির সঙ্গে কথা বলছি, আর লোকটা অপলক চেয়ে আছে, যেন খেয়ে ফেলবে। যখন চলে আসছি তখন লোকটা আমাকে ডাকল, একটু আলাদা ডেকে নিয়ে গিয়ে বলল–আপনি ওকে বউদি ডাকলেন, কিন্তু ও এখন কারও বউ নয়, জানেন? আমিও ভেবে দেখলাম কথাটা ঠিক। ক্ষমাউমা চেয়ে নিলাম। ও নিজেই বলল বরং ওকে নাম ধরে ডাকতে পারেন, কিংবা মিস সান্যাল বলে। আমি সেটাও মেনে নিলাম। চলে আসবার সময়ে তোমার এক্স বউকে ডেকে বললাম-সীতা চলি।
