মনোরম কিছু শুনছিল না। শুধু বলল হু।
লোকটা রুস্তম টাইপের, আর খুব জেলাস। গায়ে অনেক মাংস, সাতটা বাঘে খেয়ে শেষ করতে পারে না।
কৌতুকভরে বীরু চেয়ে আছে মনোরমের মুখের দিকে। মনোরম মুখটা ফিরিয়ে নেয়। জিভটা সব সময়েই নড়ে, কিন্তু অভ্যাস বলে সব সময়ে মনোরম তা টের পায় না। এখন পেল। মুখের ভিতরে যেন একটা হৃৎপিণ্ড, অবিরল তার মৃদু শব্দ।
৪. মেঘ করে আসে
০৪.
দিন যায়। মাঝে মাঝে খুব মেঘ করে আসে৷ বৃষ্টি হয়। কখনও রোদ উঠে নীল জলের মতো আকাশ দেখা যায়। ঘরে ভাল লাগে না। স্পষ্টই বোঝে, বাড়িতে কুমারী-জীবনে যেমন ছিল সে, তেমনটি আর নেই। বিবাহিতা অবস্থায় যেমন ছিল, তেমনটাও নেই। দাদাই যা একটু সহজ। কিন্তু সীতার সঙ্গে দাদার দেখা হয় কতটুকু সময়। মক্কেল আর কোর্টকাছারি নিয়ে দাদা বড় ব্যস্ত।
মনোরম জামাই হিসেবে এ বাড়ির কারও পছন্দের ছিল না। তবু সবাই একরকম তাকেই হোট জামাই হিসেবে মেনে নিয়েছিল। সীতা ভুল করেছে, এ কথা সবাই বুঝত। সীতাও বুঝেছে, একটু দেরিতে।
বাবা ইদানীং কানে বড় কম শোনে। একটা যন্ত্র আছে কানে পরবার। তাতেও খুব একটা কাজ হয়নি। একটু চেঁচিয়ে বললে শোনে।
“মেয়ে, কখনও পরপুরুষের সঙ্গে একা রাস্তায় হেঁটো না।”
“মেয়ে, বাবা আর ভাই ছাড়া কোনও পুরুষের উপহার নিয়ো না।”
বিয়ের আগে এ সব কথা একটা ক্ষুদে বই থেকে বাবা তাকে মাঝে মাঝে পড়ে শোনাত। বইটার নাম ছিল, নারীর নীতি। উপদেশ দুটো সীতা মানেনি। শিমুলতলার প্রকৃতিতে কী একটা ছিল, মাদকতাময়, বাধা ছিন্ন করার নিমন্ত্রণ।
বিয়েটা পছন্দের না হোক, বাবা তবু বিয়ের পর সেই বইটা থেকেই আবার শোনাত স্ত্রী হচ্ছে পুরুষের বিশ্রামের জায়গা। যখন খেটেখুটে সে ফিরে আসবে, তখনই তাকে অভাব-অভিযোগের কথা বোলো না। তাকে সেবা দিয়ে, সুস্থ করে তুলল, তারপর মৃদু নম্র ভাবে যা বলার বলল। মনে রেখো, তুমি তাকে তোমার দিকে আকৃষ্ট করে রাখার চেষ্টা করলে সে জগৎ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে আসবে। সার্থক হবে না সে। বরং তাকে আদর্শের দিকে ঠেলে দিয়ে, সে পৃথিবী জয় করবে…ইত্যাদি। বয়সে অনেক বড় ছিল মনোরম, সীতার চেয়ে প্রায় দশ বছরের বড়। বাবাকে এ ব্যাপারটা খুব খুশি করেছিল, স্বামীর সঙ্গে বয়সের বেশি তফাত থাকাই নাকি ভাল, এগুলো মনে রাখার কথা নয়। সীতা রাখেনি। উপদেশ হচ্ছে পেটেন্ট ওষুধের মতো। রোগ কী তা না জেনেই কিনে এনে খাও। সকলেরই তো একই রোগ নয়। বিশেষ অসুখের জন্য বিশেষ ওষুধ দরকার। তার জীবনে উপদেশটা ঠিক খাটেনি। তবু বিয়ের পর বহুকাল বাবা তাকে নারীর নীতি পড়ে শুনিয়েছে। মনোরমকে কোনও আদর্শের দিকেই ঠেলে দিতে পারেনি সীতা। তারা প্রেম করেছে, রতিক্রিয়া করেছে, খেয়েছে, ঘুরেছে। ঝগড়াঝাঁটি হয়েছে, আবার ভাবও। সন্দেহ এবং অবিশ্বাস এসেছে, আবার প্রেমও করেছে। এবং তারপর ক্লান্তি এসেছিল। এল নিস্পৃহতা। যত বয়স বাড়ছিল, ততই মনোরম পুরোপুরি বাধ্য পরিচারিকা তৈরি করতে চেয়েছিল সীতাকে। প্রেমের কথা, ভালবাসার স্পর্শ বন্ধ হয়ে যাচ্ছিল। অনেক সময়ে শরীর ঘাঁটত না একনাগাড়ে সপ্তাহভর। কেবল বুকের মাঝখানে কামগন্ধহীন মাথাটা এগিয়ে দিত। সীতা মাঝে মাঝে সে মাথাটা সন্তর্পণে বালিশে তুলে দিয়ে পাশ ফিরে শুয়েছে। মানস এসে বসত বাইরের ঘরে। একটু দূরত্ব বজায় রেখে বসত, কিন্তু তার হাসি, আন্তরিকতাময় কথাবার্তা শরীরের দূরতটুকু অতিক্রম করত অনায়াসে। কিন্তু এগুলো কারণ নয়। আসল কারণ ওই সন্দেহ। মাঝেমধ্যে একটা অস্পষ্ট যৌনঋণ-এর কথা উল্লেখ করতে থাকে মনোরম। চিৎ কদাচিৎ যখন তারা শরীরে শরীর মেলাত, তখন মনোরমের ছিল শাসকষ্টের মতো দম ফেলতে ফেলতে ওই প্রশ্ন-বলো তো, আমি কে?
–তুমি! তুমি তো তুমিই! আবার কে?
না, না, ঠিক করে বলল। ঠিক করে বলো। আমি কে?
তা হলে জানি না।
–তা হলে আমি বলি?
বলো!
রাগ করবে না?
কী এমন বলবে যে রাগ করব?
–আমি এখন-আমি বোধ হয়-মানস লাহিড়ি!
কী বলছ?
নই?
–তুমি অন্য লোক হতে যাবে কেন?
–আমি অন্য লোক নই। কিন্তু তুমি যাকে ভাব?
–ভাবব? ভাবব আবার কী? কেন ভাবব?
-আমি তো পুরনো হয়ে গেছি। আমি তো আর উত্তেজক নই! এই বয়সেই স্বামী-স্ত্রী অন্য মানুষকে ভাবতে শুরু করে।
স্তব্ধ হয়ে থেকেছে সীতা। বুকের ওপর মানুষ, কত কাছের মানুষ, তবু কী অস্বস্তিকর জটিলতা।
কোনওদিন বা সুখকর ঘনিষ্ঠতার মুহূর্তে
মানুষের মন, তার কোনও ছবি দেখা যায় না।
কী বলছ?
–মানুষ মনে যে কে কাকে ভাবে!
সীতা ঝাঁকি দিয়ে জিজ্ঞেস করেছে–স্পষ্ট করে বলো।
–আমি এখন তোমার মনের ভিতরটা দেখতে চাই।
–কেন?
—দেখতে চাই, সেখানে কে আছে!
-তুমি কি পাগল?
–কেন?
–তুমি আমাকে সন্দেহ কর?
মনোরম চুপ।
সীতা দুহাতে মনোরমের বাহু খামচে ধরে বলেছে-বলো, সন্দেহ করার মতো তুমি কী দেখেছ! কী করেছি আমি?
–কিছু দেখিনি। শুধু দেখেছি, তোমরা বাইরের ঘরের টেবিলের দুপাশে দুজন বসে আছ। তুমি উল বুনছ. মানস তোমার দিকে চেয়ে আছে। আর কিছু না।
-তবে?
–কিন্তু আমার মনে হয়েছে, তোমাদের দুজনের মাঝখানে একটা অদৃশ্য সার্কল। বিদ্যুৎ তরঙ্গের মতো কী একটা যাতায়াত করছে। একটা বলয়, সেটা শূন্য, অদৃশ্য, কিন্তু আছে। তোমরা ভালবাসার কথা বলো না। কিন্তু ও তোমাকে কমপ্লিমেন্ট দেয়, যা আমি আগে দিতাম তোমাকে, এখন আর দিতে পারি না। আমার স্টক ফুরিয়েছে। তোমাকে পেয়েছি যখন, তখনই হারিয়েছি। রহস্য শেষ হয়ে গেছে আমাদের। কিন্তু ও নতুন, বাইরে থেকে এসেছে। ওর দেওয়ার আছে অনেক। তুমিও নিচ্ছ। জমে উঠছে ঋণ। সে ঋণ কী ভাবে শোধ হবে?
