–আর খেলিস না।
–কেন? বীরু ভ্রূ তোলে।
খামোকা খেলবি। এক একটা দিন অনেকে কেবল হারে।
–আমি রোজ হারি! হারজিত তো আছেই। তবে এ রেসটার পর কেটে পড়ব। ভাল লাগছে না।
–আমিও।
–কোথায় যাবে?
–ঠিক নেই। মামার কাছে যেতে পারি।
–ঠিক আছে। একসঙ্গে ফিরব। আমার গাড়ি নেই, গ্যারেজে দিয়েছি, ট্যাক্সিতে ফেরা যাবে। সেটা জানত মনোরম। তাই একটু বিপদে পড়ল। তারও গাড়ি আছে। মামার দিশি গাড়িটা। বলল–আমার গাড়ি আছে।
অবাক হয়ে বীরু বলে নিজের গাড়ি?
না না, মামার গাড়িটাই। কয়েক ঘণ্টার জন্য চেয়ে এনেছি।
–বাবা দিল? কাউকে তো দেয় না।
–আমি তো বিজনেস টুর-এ আছি।
তাই বলো। নইলে দিত না।
রেস-এর পর তারা গাড়িতে এসে উঠল। বীরু গাড়িতে বসে চারদিকে চেয়ে গাড়িটা একটু দেখে বলে রদ্দি জিনিস।
-কী?
–এটা। গাড়িটা।
দিশি মাল, আর কত ভাল হবে।
তুমি তো ভালই চালাও।
অভ্যেস।
–অভ্যেস কেন? বাবা তোমাকে দিয়েই সফারের কাজ করায় নাকি?
না, তা নয়। স্ট্রোকের পর নিজে চালাতে ভরসা পায় না, আমিই চালাই।
অঃ!
একটু চুপ।
বাবা তোমাকে কত দেয়?
–দেয় কিছু। আমার চলে যায়।
–তোমার একটা বিজনেস ছিল না?
ছিল। বেহাত হয়ে গেছে।
–শুনেছি, খুব রোজগার করতে?
–হত মন্দ না।
তা হলে এখন চলে যাচ্ছে কী করে? বাবা বেশি দেওয়ার লোক নয়।
একা মানুষ তো, চলে যায়।
একা তো আমিও।
তুই একা কেন? মামা মামি কি হিসেবের মধ্যে নয়?
হলেও তারা ডিপেন্ডেন্ট তো নয়। বরং আমিই ডিপেডেন্ট। একা আমারই তো কত খরচ! গাড়িটা বাঁয়ে ঘুরিয়ে নাও, সামনের রাস্তায়।
-কেন?
–আমার একটা অ্যাপার্টমেন্ট আছে রিচি রোডে, যাব।
একটু চমকে গিয়েছিল মনোরম। ওর যে একটা অ্যাপার্টমেন্ট আছে সেটা জানতে মনোরমকে কত কষ্ট করতে হয়েছে আর সেই অত্যন্ত কষ্টসাধ্য খবরটা ও কত সহজেই দিয়ে দিচ্ছে নিজে। বিন্দুমাত্র গোপন করবার চেষ্টা নেই। একটু হতাশ হয় মনোরম।
মনোরম গাড়ি ঘোরাল।
যাবে আমার অ্যাপার্টমেন্টে?
সেখানে তুই কী করিস?
অনেক কিছু। তবে বেশিরভাগ সময়ে বসে রেস্ট নিই, আর বই পড়ি। তুমি ড্রিঙ্ক করো?
–কী বলছিস?
—-ড্রিঙ্ক করো তো?
একটু ভাবল মনোরম। বলল-করি।
–আমার ফ্ল্যাটে একটা ছোট্ট বার আছে। যাবে? রেস-এর পর তোমার টায়ার্ড লাগছে না?
লাগছে।
–তা হলে চলো। ওল্ড স্মাগলার হুইস্কি খাওয়াব।
একটু চুপ।
-মামা জানে?
কী?
–তোর যে একটা ফ্ল্যাট আছে!
–জানলে জানে। আমি তো লুকোইনি, আবার আগ বাড়িয়ে কিছু বলিওনি।
বলিসনি কেন?
–ওটা আমার একার জায়গা। আমার মেয়েবন্ধুরা আসে। ছেলেবন্ধুরা আসে। গেট-টুগেদার হয়। নাচ-গানও হয়। বাবা মা জানলে ওখানে হানা দিতে থাকবে। ফ্ল্যাট নেওয়ার উদ্দেশ্যটাই নষ্ট হবে তা হলে।
–আমাকে তবে নিচ্ছিস কেন?
বীরু হাসে, বলে–এমনিই। রেস-এর মাঠে তোমাকে দেখে খুব মায়া হল। ভারী ছন্নছাড়া দেখাচ্ছিল তোমাকে। ভাবলাম হঠাৎ বিপাকে পড়ে বাবার চাকরি করছ, নিশ্চয় তুমি খুব সুখে নেই। তাই ভাবলাম, তোমার সঙ্গে একটু ড্রিঙ্ক করি।
মনোরম একটু হেসে বলল–তুই আমার ছোট ভাই, তা জানিস?
সম্পর্কটা এখন খুঁচিয়ে তুলবে নাকি?
না, না, এমনি বললাম।
–আত্মীয়তা ব্যাপারটা আমি দু চোখে দেখতে পারি না। ওটার মধ্যে অনেক ভণ্ডামি আছে।
–কীরকম?
আত্মীয় বলেই অনেকে অনেকের কাছ থেকে কিছু সম্মান বা সুবিধে পায়, যেটা তাদের পাওনা নয়। সম্মান বা সুবিধে পাওয়ার জন্য মিনিমাম কিছু যোগ্যতা থাকা দরকার। কেবল আত্মীয়তা কখনও সেই যোগ্যতা হতে পারে না। সেইজন্য আমি গুরুজনটন মানি না।
মনোরম বুঝেছে, মাথা নাড়ল।
বীরু কী সুন্দর নরম ব্যবহার করছিল সেদিন! ভাবা যায় না। বীরু যে এত নরম এবং বিষয় স্বরে কথা বলতে পারে, তা কে জানত?
গোপনে গোয়েন্দার মতো দিনের পর দিন যে ফ্ল্যাটটার ওপর নজর রাখত মনোরম সেই ফ্ল্যাটে সেদিন সে অনায়াসে ঢুকল।
ফ্ল্যাটটা ভালই। এ সব ফ্ল্যাট যেমন হয়, তেমনি। তিনখানা ঘর, ডাইনিং স্পেসকাম-বৈঠকখানা, সবই আছে, কিন্তু আসবাবপত্র বেশি কিছু নেই। একটা বেশ বড় খাট, তাতে ফোম রবারের গদি, গদির ওপর মণিপুরি চাদরে ঢাকা বিছানা কুঁচকে আছে। চেয়ার টেবিলগুলো দামি কিন্তু যেখানে সেখানে ছড়ানো, মেঝে ভর্তি সিগারেটের শেষ টুকরো সব পড়ে আছে, টেবিলের ওপর ডাব্বাই অ্যাশ-ট্রে উপচে পড়ছে ছাই, দেশলাইয়ের কাঠি আর সিগারেটের টুকরোয়। মেঝের ওপর পড়ে আছে স্টিরিওটা। রেকর্ডের গাদা দুটো স্পিকারের ওপর রাখা। মেয়েলি হাতের স্পর্শ নেই। অজস্র বই চোখে পড়ে। সবই ইংরিজি। দর্শন, রাজনীতি থেকে ডিটেকটিভ বই পর্যন্ত। বৈঠকখানা ঘরের দেয়ালে বিল্ট-ইন ক্যাবিনেট খুলে গেলাস বের করে বীরু, আর হুইস্কির বোতল। বলে-ডাইলিউট করতে হলে ট্যাপ থেকে জল মিশিয়ে নাও। আমি নিট খাই, সোডা-ফোডার ঝামেলা নেই।
সন্ধে নাগাদ অনেকটাই মাতাল হয়ে গিয়েছিল মনোরম। কথা একটু এলোমেলো হয়ে যাচ্ছিল। পেটে পুরনো গ্যাসট্রিকের ব্যথা, খালি পেটে অ্যালকোহল পড়তে চিন চিন করে উঠছিল মাঝে মাঝে। ব্যথাটা কমাতেই বেশি খেল মনোরম।
–তোর মেয়ে বন্ধুরা এখানে আসে?
–আসবে না কেন?
একা?
একাও।
আবার কিছুক্ষণ মদ খেল দুজন।
-বীরু।
উ।
–মেয়েবন্ধুদের মধ্যে কাকে তোর ভাল লাগে সবচেয়ে?
সবাইকে। অদ্ভুত মদির হাসি হাসে বীরু, বলে-কে ভাল নয় বলো! মেয়েরা সবাই এত ভাল, এত সিমপ্যাথেটিক। আই লাভ দেম।
