কিছু জানোনা। আমরা কি সুখী পরিবারে বাস করি? ছোট্ট বাসা, জায়গা নেই, রোজ ঝগড়াঝাঁটি, সে এক বিচ্ছিরি পরিবেশ। আমার মা বাবা নেই, শুধু দুই ভাই, তিন কাকা কাকিমা আর খুড়তুতো ভাইবোনদের সঙ্গে থাকি। পিছুটানও কিছুই না। ও সংসার তো একদিন ছাড়তে হতই। আমি অনেকদিন ধরে ঠিক করে রেখেছিলাম যে, বিয়ের পরই আলাদা হব; বিশ্বাস করো।
সীতা সামলে গেল। হাসলও একটু। বলল–আমার সব সময়ে কেন যে কান্না পায়!
-কেন কান্না পাবে? আমরা খুব সুখী হব, দেখো।
কী করে বুঝলে?
আবেগভরে মানস বলে–আমি তোমাকে সুখী করবই। প্রতিজ্ঞা।
হালকা হাসি হাসছিল সীতা, বলল–গায়ের জোরে?
সেকথার উত্তর না দিয়ে অন্য কথা বলে মানস–শুধু তোমার নামটা পালটে দেব।
-কেন?
ও নামে তোমাকে ডাকতে আমার ভাল লাগে না।
–কেন গো?
মনোরম ডাকত।
তাতে কী? মানুষের তো একটাই নাম, সবাই ডাকে।
–তাতে মজা নেই। আলাদা নামে ডাকলেই মজা।
নাম নিয়ে তুমি একটা কিছু ভেবেছ নিশ্চয়ই?
–ভেবেছি।
–কী?
–সীতা নামটার জন্যই তুমি অত দুঃখ-দুঃখী ভাব করে থাক। যেন চারধারে তোমার অশোকবন, রাক্ষসের পাহারা, যেন নির্বাসনে আছ।
অশোকবন’ কথাটায় একটা বিস্মৃতপ্রায় বনভূমির ছায়া সীতার চোখের ওপর দুলে গেল বুঝি? এক পলকের অন্যমনস্কতা কাটিয়ে সে বলল–ডেকো! যেনামে খুশি।
আমি ভেবে রেখেছি।
–কী?
মৌ।
সীতা একটু অবাক হয়ে আবার হেসে ফেলে–বেশ এক অক্ষরের নাম তো?
ভাল নয়?
তুমি যে নাম দেবে, তাই ভাল।
না। তোমার পছন্দ হয়নি?
হয়েছে। ডাকলে কেউ ভুল করে শুনবে বউ বলে ডাকছ।
আসলে তো তাই ডাকা। মৌ মানে মধু।
–জানি।
বাংলার বধূ, বুকে তার মধু, পড়নি?
–জানি। সীতা স্মিতমুখে মুখ তুলে মানসের মুখে চেয়ে থাকে।
নিঃশব্দ পায়ে হঠাৎ বেয়ারা খাবার রেখে যায়।
খাও। মানস গাঢ় চোখে তাকিয়ে বলে।
–আর কি খিদে থাকে?
কেন?
থাকে না গো। ভেতরটা আনন্দে ফেটে পড়ছে।
মানস খুব খুশি হয়। ভারী বোকার মতো হাসতেই থাকে। অকপট হাসি। একটু ঘন হয়ে আসে। সীতা ঘুগনির বাটিতে চামচ ডোবায়।
ঝাল। মানস বলল।
ঝালই তো ভাল।
–আমি ঝাল খেতে পারি না।
তবে তোমাকে রোজ শুকতুনি রেঁধে দেব।
–আমি খাই ফ্যানসুন্ধু ভাত, লাল আটার রুটি, খোসাসুদ্ধ তরকারি, কাঁচা সবজি।
–ভিটামিন?
–ভিটামিন, ক্যালসিয়াম, প্রোটিন, ক্যালোরি। আমার কখনও অসুখ হয় না।
বলতে নেই।
–কী?
–অসুখ হয় না বলতে নেই।
বলব না তা হলে।
সীতা ঘুগনির সুন্দর স্বাদ জিভে নিয়ে উজ্জ্বল চোখে মানসের দিকে তাকাল। সে সুখী হবে।
আমার শুধু একটা ভয়। সীতা মুখ টিপে বলল।
–কীসের ভয়?
আমার একটা অতীত আছে।
তাতে কী?
–কোনওদিন যদি ও কিছু করে? যদি পিছু নেয়, যদি প্রতিশোধ নেয়?
ভ্রু কুঁচকে চেয়েছিল মানস। প্রবল হাতে হঠাৎ সীতার হাতটা চেপে ধরে বলল–তা হলে ও আমার হাতে শেষ হয়ে যাবে।
সীতা ততটা উদ্বেগে নয়, যতটা ঠাট্টার গলায় বলল–ভয় তোমাকেও।
-কেন?
–যদি কখনও তোমার মনে কিছু হয়?
তক্ষুনি আবেগে মানস প্রায় সীতাকে বুকে টেনে নিতে যাচ্ছিল। রেস্তোরাঁ বলে পারল না। কিন্তু তার মুখচোখ লাল হয়ে গেল উত্তেজনায়, আবেগে, ভালবাসায়। প্রায় বুজেযাওয়া গলায় বলল কোনওদিন না। তুমি এ সব কী বলছ? আমি তোমার জন্য তোমার জন্য বলতে বলতে কথা খুঁজে না পেয়ে মানস রুমাল বের করে মুখ মুছল।
পুরুষকে পাগল করার আয়ুধগুলি মেয়েদের প্রকৃতিদত্ত। এই প্রকাণ্ড মানুষটার শরীরে এখন আর হাড়গোড় নেই। একতাল পিণ্ডের মতো সীতার অভিমান, সংশয় আর ভালবাসার উত্তাপে গলে গলে যাচ্ছে। এখুনি সর্বস্ব দিয়ে দিতে প্রস্তুত। ও এখন সীতার জন্য দশদিন উপোস করতে পারে, খুন করতে পারে, যা খুশি করতে পারে।
সীতা সতর্ক হয়ে গেল। ওকে পাগল করার ইচ্ছে তার নেই। বরং গভীর মায়ায় সীতা বলল তোমার কথা আমাকে কখনও কিছু বল না।
মানস আস্তে আস্তে সহজ হয়ে বসল। রেডিয়োর ঘোষণাকারীর মতো গভীর ঘুমভাঙা সুন্দর গলায় বলল কী বলব! আমার ছেলেবেলা সুন্দর ছিল না। অল্প বয়সে বাবা মারা গেছে, আমরা দু ভাই আর মা কাকাদের কাছে ছিলাম। দুঃখে কষ্টেই। কাকারা খারাপ লোক নয়, কাকিমারাও ভাল ব্যবহার করেছে, কিন্তু মা আমাদের শাস্তি দেয়নি। স্বামী হারিয়ে মা বড় অভিমানী, খুঁতখুঁতে হয়ে গিয়েছিল। কাকিমাদের বা কাকাদের সঙ্গে একটু কিছু হলেই কাঁদত, বিলাপ করত, আমাদের দুই ভাইকে নিয়ে বেরিয়ে পড়ত রাস্তায়, বাড়ি ছেড়ে চলে যাবে বলে। এইভাবেই মে কাকাদের আর কাকিমাদের ধৈর্য ভেঙে গিয়েছিল। ঝগড়াঝাটি অশান্তি। তাই মাকে নিয়ে আলাদা হব বলে ছেলেবেলা থেকেই চাকরির চেষ্টা করতাম। করেছিও চাকরি। খেলাধুলোয় ভাল ছিলাম বলে স্কুলের শেষ ক্লাসে পড়ার সময় থেকেই চাকরি করেছি। আলাদা বাসা করার মতোটা পেমন, বকিছুটাকা আসত। এইভাবে বড় হয়েছি আর কী?
কখনও স্বপ্ন দেখনি তুমি?
কীসের স্বপ্ন।
–অনেকে তো অনেক রকম স্বপ্নটপ্ন দেখে।
একটু অন্যমনস্ক হয়ে গেল মানস। ভেবে ভেবে বলল–স্বপ্ন ছাড়া বোধহয় মানুষ নেই। আমিও কি দেখিনি? অলিম্পিকে যাব, সেনা আনব-এ খুব স্বপ্ন দেখতাম। হল না। ন্যাশনাল মিট-এ বার থেকে পড়ে যাই, তারপর আর জিমন্যাস্টিকসে ফিরে যাওয়া হল না।
কখনও মেয়েদের কথা ভাবনি?
মান হাসে মানস,বলে–মেয়ে! তাদের চিন্তা করতে সাহসই পেতামনা। মা আর ভাইকে নিয়ে আলাদা একটা বাসা হবে, শুধু সেই চিন্তাই করতাম। মাত্র তো কয়েক বছর আগে রেলে চাকরি পেয়েছি। কিন্তু ততদিনে মা মরে গেছে ককাদের সংসারে কিছু টাকাপয়সা দিই বলে কাকারাও আর ছাড়েনি। রয়ে গেলাম। মেয়েদের চিন্তা প্রথম অহয় তোমাকে দেখে। মনোরম তো একটা ক্রিপল, ওর মনও সুস্থ নয়। ওর ঘরে তোমাকে দেখে আমার কী যে হত!
