কী কথা হল।
–এই যে, যা করলে, এটাও তো কথাই। মানস হাসল খুব। একটু অন্ধকার এখন। তাই মানসের হরিণ চোখজোড়া দেখতে পাচ্ছে না সীতা। দেখতে ইচ্ছে করছিল খুব।
গড়ের ময়দান ছেড়ে চৌরঙ্গিতে পড়তেই রাস্তার আলো অপসৃয়মাণ উজ্জ্বলতা ফেলছিল গাড়ির মধ্যে। এই আলো, সেই আলো, লাল-সবুজসাদা। সেইসব আলোতে পলকে পলকে মুখখানা পালটে যায়। মানসের মুখ খুব কাছে। ভাল দেখা যাচ্ছে না। ভালবাসায় স্নেহে ওর মাথায় হাত রাখল সীতা। ওর হরিণ:চোখ একবার আলোকে স্পষ্ট, আবার অন্ধকারে মিলিয়ে যাচ্ছে। সীতা নিবিড় চোখে দেখে।
চুল উঠে যাচ্ছে বুঝি? মানসের মাথার চুল নেড়ে সীতা বলল।
–প্রায়। টাক পড়ে যাবে শিগগির। তার আগে টোপর না পরলে…
–টোপর? একটু অবাক গলায় সীতা বলে।
নয় কেন?
টোপর পরা মানে তো সামাজিক বিয়ে, তা কি হবে?
হবে না কেন? একটু অস্বস্তির গলায় মানস বলে।
সীতা হাসল একটু, বিষণ্ণ হাসিটি। বলল–তা কি হয়? কুমারী মেয়েরই সম্প্রদান হয়।
মানস হেলে পড়েছিল সীতার গায়ে, উঠে বসল।
না হয় রেজেস্ট্রিই হল। টোপর পরাটা না হয় এ জন্মে বাদ দিলাম।
সীতা হঠাৎ তার চোখভরা জল টের পেয়ে আঁচল তুলল চোখে, বলল–টোপর পরার শখ থাকলে না হয় আমি সরে যাই…
কী বলে রে মেয়েটা? এঃ মা, কাঁদছ? বলে মানস দুহাতে তাকে টেনে নেয় এবং তখন মানসের শরীরের মাখনের মতো নরম এবং লোহার মতো শক্ত দুরকম পেশির অস্তিত্ব টের পায় সীতা।
কাঁদে না, কাঁদে না। টোপরটা তো ঠাট্টার কথা, আজকাল কেউ পরতেই চায় না। মানস আকুল গলায় বলে।
না। তা কেন? বিয়েতে আলো, সানাই, টোপর-সিথিমোর, কড়িখেলা এ সবের একটা আলাদা স্বাদ। অনেকে বিয়ে বলতে এ সব ভাবে। তুমিও ভাব।
–কে বলল?
–আমি জানি।
–আমার বয়স কত জান?
কত?
–একত্রিশ। এ বয়সে যে রোমাঞ্চ-টোমাঞ্চ সব ঝরে যেতে থাকে। আমি স্বপ্ন দেখি না।
–শুভদৃষ্টির কথাও কখনও ভাব না?
–ও সব নিয়ে ভাববার সময় কোথায়?
–আর ফুলশয্যা?
তুমি ঠাট্টা করছ।
না গো।
–শোনো, আমি বড্ড ব্যস্ত মানুষ। সারা ভারতবর্ষ ঘুরে বেড়াই। তিন-চার বার ইউরোপ,ফার ইস্ট ঘুরেছি। অনেক দেখতে দেখতে আর অনেক ব্যস্ততার মধ্যে আমার ও সব সংস্কার কেটে গেছে। লক্ষ্মীটি, একদম ভেবো না। আমি সত্যি ঠাট্টা করছিলাম।
আর তখন সীতার ভাল লাগছিল খুব, মস্ত বুকে হেলান দিয়ে বসে থাকতে। সে মনে মনে হিরে করে দেখল, যদি মানসের একত্ৰিশ হয়, মনোরমের এখন ছত্রিশ এবং মানস তার চেয়ে পাঁচ বছরের ছোট। সীতা কলকাতার রাস্তায় একটা বিজ্ঞাপনের হেডিং দেখেছে প্রায়ই-গেট ইওরসেলফ এ ইয়ং হাজব্যান্ড। সে কথাটা ভাবতে ভাবতে সে হঠাৎ আস্তে বললআই অ্যাম গেটি…
কী?
–এ ইয়ংগার হাজব্যান্ড। বলে হাসল সীতা, সম্মোহিতের হাসি।
মানসের সাহসী ও সরল হাত একটু ওপরে উঠেছে তখন। বুকে।
ট্যাক্সিওয়ালা পার্ক স্ট্রিটের ট্রাফিক সিগন্যাল পার হয়ে সামান্য ঘাড় ঘুরিয়ে বলল–কোথায় যাবেন?
চৌরঙ্গি মার্কেট। মানস ভেবে রেখেছিল জায়গাটা। চট করে বলল। ভাবল না। এবং যেখানে হাত ছিল সেখানেই রেখে দিল। সরাল না।
বড় অবাক করা সাহস ওর। সীতা ঠিক এরকমই চেয়েছিল।
সুরেন ব্যানার্জি রোডে ট্যাক্সি ছেড়ে ওরা ঢুকল চৌরঙ্গি মার্কেটে। ছোট্ট ছিমছাম একটা রেস্তরাঁ। খদ্দের নেই।
অনেক খাবারের অর্ডার দিল মানস। দইবড়া, চপ, ঘুগনি।
আর কী খাবে?
–আরও? চোখ কপালে তোলে সীতা।
খাও না বলেই তুমি রোগা।
সীতা মুখে রুমাল চেপে স্রোতস্বিনীর মতো হাসে-মেয়েরা অত খায় না মশাই।
কারও খাওয়া দেখলে তুমি ঘেন্না পাও না তো? অনেকে পায়।
যাঃ! যে খেতে পারে সে খাবে না কেন? ঘেন্নার কী?
আমার বাসায় তো বড় পরিবার। সেখানে অনেকে আছে যারা আমার খাওয়া দেখতে পারেনা।
–আমি পারব। ভয় নেই।
সেই তৃপ্তির হাসিটা আবার হাসে মানস। চৌকো থুতনি আর চোয়ালে হাসিটা খুব জোরালো দেখায়। ঝকঝকে সাজানো দাঁত। মুখে খুব সুন্দর একটা সুস্থতার গন্ধ পেয়েছিল সীতা, চুমুর সময়ে। হরিণ চোখ, তাতে দীর্ঘ পাতা। এত জোরালো মুখে চোখ দুটো বড় বেমানান রকমের মায়াবী। বড় পরিবার কথাটা সীতার মনের মধ্যে নড়ছিল। একটু সময় নিল সে, বলল–বিয়ের পর তোমার পরিবারের কে কী বলবে?
বললেই শুনছে কে? আমি তো গভর্নমেন্টের ফ্ল্যাট পেয়েই গেছি তারাতলায়। অগাস্টে অ্যালটমেন্ট, তুমি তো জানো।
আলাদা থাকাটাই তো সব নয়। সম্পর্ক তো থাকবেই। আর যাতায়াতও।
সব সম্পর্ক কেটে দিচ্ছি।
–কেন?
–কেটে না দিয়ে উপায় কী?
সীতা আবার সংশয়ের যন্ত্রণা ভোগ করে বলে–কেন কেটে দিচ্ছ? আমার জন্যই তো।
ঠিক তা নয়। তবে তোমাকে নিয়ে আলাদা থাকতে চাই। একদম আলাদা আর একা।
–কেন? প্রশ্ন করেই আবার সীতার ঠোঁট কেঁপে ওঠে। চোখে জল চলে আসতে থাকে। আজকাল তার এরকম হয়। ছন্নছাড়া, কারণহীন কান্না পায়। খুব কি বেশি অভিমানী হয়ে গেছে সে?
মানস তার হরিণ চোখ দুখানা সম্পূর্ণ মেলে চেয়ে থাকে। তারপর হাত বাড়িয়ে টেবিলের ওপর পড়ে থাকা সীতার একখানা হাত চেপে ধরে বলে–ও কী! সীতা!
মুখোমুখি বসে ছিল তারা। মানস উঠে সীতার পাশে এসে বসল, কাঁধের ওপর হাত রেখে বলল, কী হল হঠাৎ।
আমার জন্যই তুমি পরিবার ছাড়ছ তো!
–কে বলল?
ফলতে হয় না, টের পাওয়া যায়।
