বলে আবার গাঢ় চোখে তাকায় মানস। হঠাৎ গলা নামিয়ে ফিসফিস করে বলে–তোমার কিছু হত না আমাকে দেখে?
সীতা অস্বস্তি বোধ করল একটু। না, হত না। মনোর বড় ভুল করেছিল ওই একটা জায়গায়। মানসকে দেখে কেন কিছু মনে হবেসীতার?তা তো সীতা সেই কদমছাঁট চুলওলা মাথাটাকে নিজের বুকের মধ্যে নিতে শিখে গিয়েছিল।
সীতা মৃদুস্বরে একটা মিথ্যে কথা বলল হত।
বলে মুখ নামিয়ে নিল টেবিলের ওপর। টেবিলে গাঢ় সবুজ রঙের কচি তাতে তার আবছা মুখচ্ছবি, ও কি নদীর জলে তার ছায়া?
কী হত?
কী জানি! অত কি বলা যায়।
বলো না। আমি বুঝে নিয়েছি।
সীতা হাসল।
চলো, কোথাও যাই।
–কোথায়?
চলো না।
রাত হয়ে যাচ্ছে।
–তাতে কী? তোমাকে কেউ কিছু বলবেনা।
সীতা চুপ করে বসে থাকে। মাথা নোয়ানো।
–ভয় পাচ্ছ? আমাকে একটা জীবন আমার সঙ্গেই তো থাকতে হবে।
সীতা একটু চমকায়। ঠিকই তো? ভয়ের কী? বাধ্য মেয়ের মতো সে উঠল।
ট্যাক্সি ধরে তারা এল মস্ত একটা ক্লব ঘরে। বহু পুরনো আমলের প্রকাণ্ড ক্লাব, সাহেবরা তৈরি করেছিল। সামনে লন, তারপর পেটিকো, রিশেপনহল। মানসসীতার হাত ধরে নিয়ে গেল, কোথাও বাধা পেল না, কেউ চেয়েও দেখলনা। রাত প্রায় সাড়েনটা। ক্লাব ঘর প্রায় ফাঁকা। দুচারজন খুব দামি পোশাক পরা লোক গেলাস হাতে বসে আছে, চোখ নিমীলিত।
তারা সিঁড়ি বেয়ে ওপরে উঠল। কেউ নেই। একটা ঘরে সারি সারি টেবিল টেনিসের টেবিল পাতা। সব বালি, কেবল একটা টেবিলে দুজন ক্লান্ত ছেলে একনাগাড়ে খেলে যাচ্ছে। খুটখাট-টিং শব্দ হচ্ছে। ঘরটা পেরিয়ে তারা আর একটা ঘরে এল। ফকা, আলো জ্বলছে। সুন্দর সাজানো ঘর।
দরজাটা ভেজিয়ে দিয়ে মুখ ঘোরাল মানস। আর তখনই সীতা হঠাৎ বুঝতে পারল, মানস প্রকৃতিস্থ নেই। ওর চোখ জ্বলজ্বল করছে, মুখে রওশ, ঠটিনহে। সীতার একটুও ভয় করল না।
মানস এগিয়ে এসে তার দুকাঁধ ধরে বলল-একটা কথা–
বলো।
আমার কাছে মেয়েরা রহস্যই থেকে গেছে। মানসের গলা কাপল।
–জানি।
–আমি মেয়েদের কিছু জানি না। তাদের শরীর–তুমি আমাকে এই এক্সপিরিয়েন্সটা দেবে?
নির্দ্বিধায় সীতা বলে দেব।
এখনই। দ্রুত দৌড়ে গিয়ে দরজার ছিটকিনিটা তুলে দিয়ে এল মানস।
পর মুহূর্তেই তারা পাগল হয়ে যাচ্ছিল। ডিভান না সোফা কে জানে, তার ওপর তারা ঘুর্ণি ঝড়ের মতো ওলটপালট খাছিল।
প্রথম কিন্তু সীতার এ তো প্রথম নয়। সে তো কুমারী নয়। তার রহস্য দেখেছিল প্রথম আর একজন। বনভূমি পিছনে রেখে একটা ঢাল বেয়ে নেমে এসেছিল এক কৃশ ও সুন্দর পুরুষ। বহুদিন, সে কি বহুদিন হয়ে গেল? সেই পুরুষ মনোরম না হয়ে মানস হতে পারত। হলে সে আজ কত সুখী হত।
ঝড়টা যখন তাকে ঘিরে ফেটে পড়ছে তখন সীতা আকুল শ্বাস টানছিল বার বার। কোথাও…কোথাও…কোথাও সামান্য একটু সিগারেটের গন্ধ নেই। নেই কেন? তার পিপাসায় সীতা শুকছিল মানসের মুখ, গাল, গলা, শ্বাস। না নেই। কিন্তু একটু সিগারেটের কণামাত্র গন্ধের জন্য বড় পাগল পাগল লাগছিল সীতার। সে অস্ফুট গলায় পেঁচিয়ে বলল–এ রকম নয়। না, না…
বসন খোলার মুহূর্তেই থেমে গেল মানস! একটু উদভ্রান্ত সে। কিন্তু চট করে নিজেকে সংযত করার অতুলনীয় ক্ষমতার অধিকারী। ঘোলাটে চোখে সেসীতার দিকে চেয়ে বলে–না?
সীতা কষ্টে হাসল একটু। মাথা নেড়ে জানাল, না।
-কেন?
সীতা উত্তর দিল না।
মানস একপলকে গায়ের র বেড়ে ফেলল। হাল। তা হলে থাক। আমার তাড়া নেই।
টিক টক টুং শব্দ আসছে। বলটা মেঝেতে লাফিয়ে পড়ল। গড়াল। একটা অস্পষ্ট গলা শোনা গেল–নাইন সিক্স..সাইড আউট। অবার টিক টিক শন।
যখন বেরিয়ে আসছিল তারা তখনও পাশের ঘরে সেই দুটি ক্লান্ত ছেলে ফাঁকা ঘরে একনাগাড়ে টেবিল টেনিস খেলে যাচ্ছে। টিকটক টিকটকটিক টক
আবার ট্যাক্সি। আবছা অন্ধকার। বাইরের আলো নানা রং ফেলে যাচ্ছে তাদের ওপর।
আমার তাড়া নেই।
সীতা একটু হাসল, স্নায়ুবিকালের হাসি।
মানস রাগ করেনি, একটু হতাশ হয়েছে বোধহয়। কিন্তু সে কিছু না। আবার বলল যখন নিমন্ত্রণ করে পাতপিড়ি পেড়ে খাওয়াবে, তখন খাব।
কী?
–তোমাকে।
সীতা হাসে।
–পাতিয়ালায় যাওয়ার আগে আমি বিয়ে কর সীতা।
আইন?
দূর হোক গে।
সীতা শ্বাস টানে, একটা সুন্দর সিগারেটের গন্ধ আসছে কোথা থেকে। সীতা চেয়ে দেখে, ড্রাইভারের পাশে বসা অ্যাসিস্ট্যান্ট ছেলেটা একটা সিগারেট ধরিয়েছে। বুক ভরে বাতাস টানল সীতা।
বাড়ির সামনে নেমে যাওয়ার আগে সীতা হঠাৎ জিগ্যেস করল তুমি সিগারেট খাও না?
না। কেন?
–খাও না কেন?
মানস বুঝতে না পেরে বলে আমার কোনও নেশা নেই। সিগারেট খেলে দমের ক্ষতি হয়।
-খুব ক্ষতি।
মানস হাসল, বলল–কেন, সিগারেট খাওয়া তুমি পছন্দ কর?
মাঝে মাঝে খেয়ো, যদি খুব ক্ষতি না হয়।
মানস সঙ্গে সঙ্গে মাথা নাড়ল–খাব। আমার ঠিক সহ্য হয় না। তবে মাঝে মাঝে খাব, এবার থেকে। ঠিক আছে?
সীতা সুন্দর ভালবাসার হাসি হাসল। নেমে যেতে যেতে বলল–খেয়ো। মাঝে মাঝে।
কাল আসব যখন তোমার কাছে, তখন…
–আচ্ছা।
–যাই।
.
দাদার ঘরে তখনও মক্কেল আছে। আলো জ্বলছে। কথাবার্তা শুনতে পেল সীতা। সিঁড়িটা অন্ধকার। সীতা পা টিপে টিপে উঠে এল দোতলায়।
বারান্দায় আলো জ্বলছে। বউদি রেলিং থেকে ঝুঁকে আকাশ দেখছে। এ সময়টায় বাচ্চাকে ঘুম পাড়িয়ে বউদি রোজই সিঁড়ির মুখে বারান্দায় দাঁড়িয়ে থাকে, যতক্ষণ দাদা উঠে না আসে। দ্বিতীয় পক্ষের বউ, তাই এখনও স্বামীর জন্যে আগ্রহ শেষ হয়নি।
