চন্দ্র এবার হাসিল। সে যেন আত্মস্থ হইয়াছে। ঠিক বলেছেন ভাবী। আমার মনে যা হয়, মুখে তা বলে ফেলি। কিন্তু খাঁ ভাই? উহ্ জান গেলেও বেশি কথা বলে না। যদি কারও হাজার টাকায় চুপ শয়তান দরকার হতো, আমি তোমার বাবাকে বেচে দিতাম বাবা। চন্দ্র হা হা শব্দে হাসিতে লাগিল। আমজাদ সঙ্গে যোগ দিল।
এমন সময় ভিতর হইতে ধমকের সুরে দরিয়াবিবি ডাকিল, আমু, তোর কাকাকে জমির কথা জিজ্ঞেস কর।
দুই জনের হাসি হঠাৎ বন্ধ হইল। আমজাদ নয়, জবাব দিল কোটাল।
ভাবী সাহেব, তার জন্য আপনি ঘাবড়াবেন না। ধান আমি নিজে কেটে দেব। এবার খড়ের দাম খুব বেশি। মানুষ ঘরদোর ছাওয়াচ্ছে। পনেরো-ষোলো টাকা কাহন। আমি ভাবছি, খড় কিছু রেখে বাকি বেচে দেব।
কাহন খানেক রেখে দেবেন। মৃদুকণ্ঠে দরিয়াবিবি জবাব দিল।
চন্দ্র আবার বলিল, শুধু ধান কাটা নয়, তরমুজ আর কুমড়া বিঘে খানেক জমিতে দেব ভাবছি। কিন্তু আমার আসর গানের বায়না আছে। আমজাদ চাচা আছে, দেখি কি বন্দোবস্ত করা যায়।
দরিয়াবিবি এবার আমজাদকে ডাকিয়া বলে, আমু, তোর চাচাকে পান তামাক এনে দে।
ঘোর আপত্তি জানাইল চন্দ্র। না, এখন কিছু দরকার নেই। আমি আজ উঠি, ভাবী সাহেব। আমার ক্ষেতে অনেক কাজ পড়ে আছে। সত্যই চন্দ্র কোটাল উঠিয়া পড়িল। আমজাদ তার অনুসরণে গেল। মহেশডাঙার জলাজঙ্গল ভরা পথে পথে চন্দ্র কাকার সহিত বেড়াইতে পাইলে সে আর কিছু চায় না। কত হাসির গান, মশকরা আর প্রাণ ঢালা আদর না পাওয়া যায় চন্দ্র কাকার কাছ হইতে!
ভাবী সাহেব, ঘাবড়াবেন না– চন্দ্রের স্তোকবাক্যে দরিয়াবিবি জোর পায়, কিন্তু অসোয়াস্তি যায় না। গত বিশ বছর এমন কতবার ঘটিয়াছে। বার-ফাট্টা আবার ফিরিয়া আসিয়াছে। কিন্তু যদি আর না আসে। দৈহিক শক্তি এতদিন দরিয়াবিবির সহায় ছিল। আজও স্বাস্থ্য তার অটুট। কিন্তু মন বড় নিস্তেজ ও নিঃসঙ্গ।
আত্ম-চিন্তায় মশগুল দরিয়াবিবি। উঠানে একটি ছাগলকে কাঁঠাল পাতা খাওয়াইতেছিল। শরী দাওয়ায় চুপচাপ একা ঘুমাইয়া। সে বড় লক্ষ্মী মেয়ে, কেবল ক্ষুধার সময় কাঁদে। পেটভরা থাকিলে শুধু ঘুমায়। দরিয়াবিবি তাই বড় নিশ্চিন্ত, নির্বিঘ্নে সাংসারিক কাজ সম্পন্ন করিতে পারে। ছাগলগুলি দরিয়াবিবির বড় প্রিয়। প্রতি বছর বছর বাচ্চা হয়। ঈদ ইত্যাদি পর্ব উপলক্ষে লোকে ছাগল কেনে। তখন ছাগল বেচায় একটা আনন্দ আছে। দাম বেশি পাওয়া যায়, তা ছাড়া টানাটানির দিন একটু সহজ হয়।
এই প্রাণীদের লইয়া দরিয়াবিবি ব্যস্ত। আমিরন চাচি কখন ধীরে ধীরে উঠানে ঢুকিয়াছে তা সে লক্ষ করে নাই। পাতা খাওয়ানো তো একটা দৈনন্দিন কাজ। দরিয়াবিবি ছাগলগুলির দিকে ভালোরূপে তাকায় নাই। কাঁঠালের ডালপালা শুধু আগাইয়া দিতেছিল। মনে নানা হিসাব নিকাশের ঝড়।
আমিরন চাচি দরিয়াবিবির থমথমে মুখের দিকে চাহিয়া রহিল। পরে হঠাৎ মৃদুকণ্ঠে ডাক দিল, বুবু।
দরিয়াবিবির ঠোঁটে অভ্যর্থনামুখর হাসি।
কখন এলে?
তারও খোঁজ নেই? কর্তাবিরাগী, গিন্নীর মন এমন উদাস না হলে চলে– বলিয়া আমিরন চাচি হাসিয়া উঠিলেন।
দরিয়াবিবির মুখ আবার থমথমে। আমিরন চাচি অপ্রস্তুত হইয়া যায়। দরিয়াবিবি সেদিকে চোখপড়া মাত্র সে ছাগলগুলিকে হাঁকাইয়া দিয়া চাচির কোমর জড়াইয়া বলিল, ঘরের ভিতর চল বুবু। কি আমার কর্তা রে– তার জন্য আবার চিন্তা!
আমিরন চাচি সহানুভূতির সুরে জবাব দিল, এমন লোক।
কিন্তু যেন ঝাপটা দিয়া দরিয়াবিবি তার মুখের কথা নিভাইয়া দিল। চল, পান খাই, দুটো কথা বলি।
নদীর ধারে বাস
দুক্ষু বারো মাস
রাখো বাজে কথা।
আমিরন চাচি দরিয়াবিবির সুখের কৃত্রিমতা কিছুই ধরিতে পারে না।
দুইজনে সত্যই কিছুক্ষণ আজেবাজে আলাপ করিল। গ্রামের কথা, পাড়া-পড়শীদের। কথা। সাকের কোথায় দাঙ্গা করিতে গিয়াছে, হাসুবৌ শাশুড়ির গঞ্জনা আজকাল অনেক বেশি শোনে ইত্যাদি।
আমিরন চাচি কাজের লোক। গরু-বাছুর-হাঁস-মুরগি লইয়া সে এক রাজ্যের অধিশ্বরী। বেশিক্ষণ কথা-ফোড়নের সময় কোথায়? একটি খবর দিতে আসিয়া সে এতক্ষণ সুযোগ খুঁজিতেছিল। হঠাৎ চাচি বলিয়া ফেলিল, দরিয়াবুবু, একটা খবর আছে।
কত সংবাদের জন্যই দরিয়াবিবি হা-প্রত্যাশায় নিমজ্জিত, তখনই উৎকর্ণ উন্মুখ ব্যগ্রতায় চাচির দিকে তাকাইল।
আমাদের মুনি চাচার খবর পেয়েছি।
দরিয়াবিবি অন্য কোনো সংবাদ পাইলে যেন সন্তুষ্ট হইত। বেশি উৎসাহ না দেখাইয়া সহজ গলায় বলিল, কি খবর?
মুনি চাচাও বাড়ি থেকে চলে গেছে। আরো পাঁচ ক্রোশ দূরে কি স্কুল আছে, সেখানেই পড়ে। চাচাঁদের সঙ্গে কোনো সম্বন্ধ আর নেই। আমিরন চাচি খুব তরল গলায় পরিবেশন করিল।
যেখানেই থাক, ভালো থাক। আমার ছেলে তো নয়, আমার কি জোর আছে! ভয়ানক নির্লিপ্ত শোনায় দরিয়াবিবির কণ্ঠ।
প্রতিবাদ জানাইল আমিরন চাচি, তোমার ছেলে নয় কে বললে? দেখ রক্তের টান, চাচা আবার তোমার কোলেই ফিরে আসবে।
আসুক বা না আসুক, যেখানে থাক বেঁচে থাক। তুমি কোথা থেকে খবর পেলে?
আমি খবর পেয়েছি। আমার এক মামাতো ভাই আছে মুনিদের গাঁয়ের পাশে। তাকে খোঁজ নিতে বলেছিলাম। …তোমার মেহেরবানি বুবু।
তারপর আমিরন চাচি কর্তব্যের ডাকেই উঠিয়া পড়িল। আম্বিয়া একা বাড়িতে আছে। দেবর বিধবার সম্পত্তি হরণের নানা পাঁয়তারা কষিতেছে। আর বেশিক্ষণ এখানে কাটানো। চলে না। আমিরন চাচি কিন্তু অবাক হয়। আজ তার বুবু পুত্র প্রসঙ্গ আর উত্থাপন করিল না। অথচ অন্য সময় ঘণ্টার পর ঘণ্টা এই এক কথাই বড় হইয়া দেখা দেয়।
