দরিয়াবিবি আমিরন চাচিকে দহলিজ পর্যন্ত আগাইয়া দিল ও আবার আসার জন্য অনুরোধ করিল। কিন্তু উঠানের দিকে অগ্রসর হইতে তার পা যেন আর চলে না। ধীরে ধীরে ছোট্ট শরীর বিছানার পাশে আসিয়া সে দাঁড়াইয়া রহিল ও তার ঘুমন্ত মুখের দিকে একদৃষ্টে চাহিয়া রহিল। তখন দরিয়াবিবি কী ভাবিতেছিল, শুধু সেই তার খবর রাখে।
.
৩০.
গঞ্জের পথে ইয়াকুব আসিয়াছিল খোঁজ-খবর লইতে। সে খালি হাতে আসে না। ছেলেদের জন্য মিষ্টি, তা ছাড়া এত জিনিসপত্র আনে যার প্রাচুর্যই যে কোনো সংসারের পক্ষে তিন-চার দিনের জন্য লোভনীয়। দরিয়াবিবি প্রথম প্রথম মৃদু আপত্তি জানাইত। এখন নিজেই ইয়াকুব আনীত মায়া পেটিকা নিজের হাতে খোলে। অবশ্য উৎসাহ দেখায় না বিশেষ।
এবার ইয়াকুব বড় বড় কই ও বড় বড় চিংড়ি মাছ পর্যন্ত আনিয়াছিল। আজহার ঘরে থাকিলে মাঝে মাঝে মাছ ধরিতে যায়। তখন এমন মাছ এই বাড়ির হাঁড়িতে উঠে। নচেৎ এত দামে এমন আমিষ আহারের সামর্থ্য কোথায়?
ইয়াকুব ফোড়ন দিয়া বলিল, ভাবী, এবার মটরশুটি পাওয়া গেল না। বড় চিংড়ি আর মটরশুটি আমার খুব পছন্দ।
তোমার ক্ষেতে হয় না? দরিয়াবিবি জিজ্ঞাসা করিল।
না। অসময়ে সব সময় কি আর এই ফসল তোলা যায়?
ছেলেরা ইয়াকুব চাচাকে ঘিরিয়া থাকে। নঈমা কাছ ছাড়া হয় না; বরং অন্য সময় মাকে জিজ্ঞাসা করে, চাচা কবে আসবে মা? কারণ চাচা একা আসে না। আমজাদ কাছ ঘেঁষিয়া বসে। সে লাজুক, তাই সে কম কথা বলে। কিন্তু ঘণ্টার পর ঘণ্টা ইয়াকুবের সঙ্গ ত্যাগ করে না।
লৌকিকতার রেশ আর নাই। মেহমান হইলেও ইয়াকুব আহারের ফিরিস্তি নিজেই দিয়া থাকে। কারণ যোগাড় সে বহন করিয়া আনে।
দরিয়াবিবি বিকালে লুচি ভাজিতেছিল। পাশে কোনো ছেলেপুলে নাই। নঈমা একবার আসিয়াছিল শিশুসুলভ প্রত্যাশায়। কিন্তু মা বসিতে দেয় নাই, ধমক দিয়া তাহাদের ভাগাইয়াছে। আরো বকুনি খাইয়াছে আমজাদ। এত বড় ছেলে স্কুলে পড়িস। এমন হাঁ খেয়ে কেন? কোনোদিন লুচি দেখিসনি চোখে? ইহার চোটে দুরন্ত পেটুকও ছুটিয়া পলাইত।
আজহারের কথা এই বাড়িতে ছেলেরা কেহ মুখে আনে না। ইয়াকুব তার কথা জিজ্ঞাসা করে সারাদিন। কুশল জিজ্ঞাসার রীতিটুকু পর্যন্ত সে পালন করে নাই। অথচ আত্মীয়।
কড়ায় গরম তেলে ফেলা লুচির হ্যাঁক শব্দ হইতেছিল। দরিয়াবিবি আনমনা কাজ। করিয়া যায়। সে নিজের চিন্তায় কুঁদ, তা-ও মুখাবয়বে প্রমাণ। দরিয়াবিবি সুডৌল গৌর মুখ চুলার আঁচে ঘামিতেছিল।
ভাবী, ভাবী–আপনার রান্না কত দূর। ডাক দিতে দিতে ইয়াকুব চুলাশালে প্রবেশ করিল।
বেগুন ভাজা হয়ে গেছে, এখন লুচি ভাজছি। ইয়াকুবের দিকে না তাকাইয়া চুলার ভিতর এক খণ্ড লাকড়ি ঠেলিতে ঠেলিতে দরিয়াবিবি জবাব দিল।
এখানেই দিন, গরম গরম লুচি খাওয়া যাক।
বেশ। কিন্তু বসার জায়গা কোথায়?
বসার জায়গা কি হবে? এই আমি বসে দেখিয়ে দিচ্ছি–বলিয়া ইয়াকুব উবু বসিয়া পড়িল।
তোমার কাপড়চোপড় ময়লা হবে। ইয়াকুবের পরনে সিল্কের লুঙি, গায়ে শাদা শার্ট। দরিয়াবিবি মিথ্যা বলে নাই।
না, আমি তো আর ছেলেমানুষ নই। যেন কত রসিকতা করা হইল। ইয়াকুব বেদম হাসিয়া উঠিল।
বেশ, বসো। আমি থালা বাটি নামিয়ে আনি।
দরিয়াবিবি মাচাং হইতে লোয়াজিমা কয়েকটি নামাইয়া আনিল এবং বেগুনভাজা ও লুচি পরিবেশন করিতে লাগিল।
থালায় হাত নামাইয়া ইয়াকুব বলিল, ভাবী, ছেলেদের ডাকেন।
ওরা খেয়েছে। সংক্ষিপ্ত জবাব। ইয়াকুব চাহিয়া দেখিল দরিয়াবিবি তখন লুচি বেলায় মগ্ন। উত্তপ্ত কড়ার দিকে তার আড়চোখের দৃষ্টি। সেখানে টগবগ শব্দে তেল ফুটিতেছে।
সত্যি ওরা খেয়েছে?
হ্যাঁ। দরিয়াবিবির কণ্ঠ ঈষৎ তীক্ষ্ণ শোনায়।
দরিয়াবিবি গরম লুচি ছাঁকিয়া পাতে দিতে লাগিল। ইয়াকুব ধীরে ধীরে খাওয়া শুরু করে।
ভাবী, একটু পানি।
দরিয়াবিবি ঝটপট হুকুম তামিল করিল। আর কোনো বাক্যালাপ যেন এগোয় না। ইয়াকুব দরিয়াবিবিকে রীতিমতো ভয় করে। তার চোখের দিকে সহজে তাকাইতে পারে না। থমথমে মুখ যেন শাসনভঙ্গির আদল। ইয়াকুব অসোয়াস্তি বোধ করে। তবে সে দুই স্ত্রীর পতিদেব। মনের গোপনে একটা আত্মবিশ্বাস আছে তার। কিন্তু এখানে যেন সব ঠাণ্ডা হইয়া যায়। দরিয়াবিবি কত শান্ত। অথচ ইয়াকুব অসোয়াস্তি অনুভব করে।
নিজের মনেই সে বলিয়া যায়, আপনার বাড়ি এলে যা শান্তি পাওয়া যায়, আর কোথাও তা মেলে না।
আবার সংক্ষিপ্ত প্রশ্ন কেন?
কেন? যত্নআত্যি কে করে?
যত্নআত্যি! দরিয়াবিবি হাসিয়া উঠিল। ইয়াকুব কান খাড়া করিল। কথাটা বিদ্রুপের মতো শুনাইতেছে না তো? কিন্তু কিছু উপলব্ধি করিতে পারে না। দরিয়াবিবি কোনো সুযোগ না দিয়া বলিল, তুমি যত্নআত্যি কোথায় দেখলে?
কণ্ঠস্বরের মধ্যে একটা দোকানদারী ভাব।
ইয়াকুব মনে মনে ক্ষুব্ধ হয়। তবু আবহাওয়া আরো সন্নিকট করিতে বলিল, না, ভাবী, এসব কপালের কথা। এমন শান্তি আমি ঘরেও পাই না।
তোমার তো খোদার মরজি দুবিবি আছে?
বিবি! বিবি কোথায় দেখলেন ভাবী?
ঘরের সে দুটো তবে কি?
গোশতের ঢিবি।
দরিয়াবিবি এবার হাসিয়া ইয়াকুবের দিকে তাকাইল। তখনই চোখ নামাইয়া বলিল, আমি বিবিসাবদের দেখিনি। মোটা হলে যদি গোশতের ঢিবি হয়, আমি তো গোশতের পাহাড়।
