আমজাদের ডাক পড়িল। সে পড়া ছাড়িয়া উঠিয়া আসিল।
দরিয়াবিবি জিজ্ঞাসা করে, আমু, তোর মুনিভাই তবে যে তার চাচার বাড়িতে আছে, আগে বলেছিলি?
আমি তো তাদের বাড়ি যাইনি। শুনে এসেছিলাম।
দরিয়াবিবি ক্ষোভে আগুন হইয়া উঠে, শুনে এসেছিলি
তারপর পুত্রের দিকে কটমট চোখে তাকায়।
আমজাদ প্রায় কাঁদিয়া ফেলার উপক্রম। নিজের সাফাই সে দক্ষ আসামীর মতো গাহিয়া গেল। আজহারের আফশোস বড় কম নয়। নিজের উপর বারবার ধিক্কার দিতে লাগিল।
আমার চণ্ডাল মেজাজে সেদিন আগুন ধরেছিল। এই হাতে আজার হোক।
দরিয়াবিবি আর কোনো কথা বলিল না। কারো বাক্যালাপ তার কর্ণকুহরে প্রবেশ করিতেছিল কি-না সন্দেহের ব্যাপার।
সমগ্র দাওয়া স্তব্ধ এক নিমেষে।
আমজাদ পা টিপিয়া নিজের ঘরে চলিয়া গেল। তার পাঠ্যাভ্যাস নিভিয়া গিয়াছে। কণ্ঠস্বর শোনা যায় না। আজহার হাঁটুর ভিতর মুখ খুঁজিয়া বসিয়া রহিল। দরিয়াবিবি কখন শরীকে লইয়া উঠিয়া গিয়াছে, তার খোঁজও সে রাখিল না। সেই অবস্থায় সে ঘুমাইয়া পড়িয়াছিল। ঘুম ভাঙার পর তার অচেনা ঠেকে সব জায়গা। দাওয়ায় পিদিম নাই। উঠানে অন্ধকার আর অন্ধকার। একরাশ ঝিঁঝি ঊধ্বশ্বাসে ডাকিতেছে। আজহারের মস্তিষ্কে তার অনুকরণ চলে। সন্তর্পণে সে ঘরের দুয়ারে করাঘাত করিল। না, সব বন্ধ। আমজাদের ঘরও ভোলা নাই। অভুক্ত সকলে ঘুমাইয়া পড়িয়াছে। সেও ঘুমাইয়া পড়িল দাওয়ায় মাদুর পাতিয়া।
পরদিন খুব ভোরে আজহার মাঠে চলিয়া গেল।
দরিয়াবিবির ডাকে আমিরন চাচি হাজির হইল পরদিন। মুনির খোঁজ গ্রহণের সে প্রতিশ্রুতি দিল।
বিকালে আমিরন চাচি হতাশ। সংবাদ দিয়া গেল মুনি চাচার বাড়ি যায় নাই। ভয়ানক কান্না জুড়িল দরিয়াবিবি। কারো স্তোক বাক্যে থামে না। হাসুবৌ আসিয়াছিল। তারও চোখের পানি সহজে থামে না।
ও যদি একদম আর এ বাড়ি না আসত আমার দুঃখ ছিল না। কিন্তু এলো, আমি তাড়িয়ে দিলাম।
দরিয়াবিবি ফোঁপাইতে থাকে।
বেটাছেলে, কোথাও গেছে। আমি আরো খোঁজ নিচ্ছি। আশ্বাস দিল আমিরন চাচি।
আর সে ফিরে আসবে! কোথা গেল, অতটুকু কচি ছেলে।
আমি গণৎকারের কাছে গুনিয়ে আসব। কোনদিকে গেছে, কবে ফিরে আসবে ঠিক বলে দেবে, সেবার আমার বোনের দেবর এমনি।
আমিরন চাচি নিরুদ্দিষ্ট ব্যক্তির প্রত্যাবর্তনের কাহিনী বলিল।
দরিয়াবিবি আশ্বস্ত হয় না, তবু অনুরোধ করিল, আমি পাঁচ পয়সা দেব, বোন।
পাঁচ পয়সা আর একটা সুপারি লাগে।
আমিরন চাচি জবাব দিল।
তুমি এখনই নিয়ে যাও।
আম্বিয়া বাড়িতে আছে, আমিরন চাচি আর দেরি করিতে পারে না। সন্ধ্যা হইয়া গিয়াছিল। বেশ অন্ধকার চারদিক। বন-বাদাড় ভাঙিয়া যাইতে হইবে।
পয়সা, সুপারি আমি দেব। মুনি আমার ছেলে নয় নাকি? চাচির সহানুভূতি অকৃত্রিম।
হাসুবৌ ও আমিরন চাচি বিদায় লইল।
আজহার মাঠ হইতে ফিরিয়া আসিয়াছিল। আমজাদ শুধু সে সংবাদ জানে। থমথমে আবহাওয়ার জন্য পিতাকে একবার দেখিয়া সে নিজের ঘরে ডিপার আলোয় চুপিচুপি পড়িতেছিল। কিন্তু পড়ায় তার কোনো মন ছিল না।
দরিয়াবিবি সকলে চলিয়া গেলে আমজাদের ঘরে আসিল।
আমু।
মা।
কাল ও গায়ে গিয়ে খোঁজ নিয়ে আসবি। আর একবার গঞ্জের দিকে যাস।
আচ্ছা, মা। মুনিভাইয়ের জন্য আমারও মন কেমন করে।
সত্যি সজল হইয়া উঠে আমজাদের চক্ষু।
তোর আব্বা মাঠ থেকে আসেনি?
এসেছিল তো। খানিক আগে দেখেছি।
ডিপা হাতে দরিয়াবিবি ঘরে প্রবেশ করিল। বাঁশের আলনায় আজহারের লুঙি পিরহান কিছু নাই। কাটা দেওয়ালের গায়ে একটি কুলুঙ্গী ছিল। আজহারের সূতা কন্নিক-পাটা উষো ও যাবতীয় রাজমিস্ত্রীর সরঞ্জাম থাকিত। সব শূন্য।
দরিয়াবিবি চারদিকে তীক্ষ্ণদৃষ্টিতে তাকাইল এবং সবকিছু নিমেষে উপলব্ধি করিল।
.
২৯.
তোমার বাবা আবার রুই-পোনা ধরতে গেছে। চুনো চানা খেয়ে কি খাঁ সাহেবের দিন কাটে? জানো, চাচা?
চন্দ্র ও আমজাদের মধ্যে বাক্যালাপ হইতেছিল। হাসিয়া হাসিয়া কোটাল কথাগুলি উচ্চারণ করিল। দরিয়াবিবি দহলিজের আড়ালে দাঁড়াইয়া আছে, চন্দ্রের তা খেয়াল ছিল না। তার মুখের হাসি তখনই নিভিয়া গেল।
দরিয়াবিবি চন্দ্রকে ডাকাইয়া আনিয়াছিল। আমজাদ জানে, বিপদে আপদে মা প্রথমে চন্দ্র কাকার কথাই মনে করে। পুত্রের মারফৎ এতক্ষণ অনেক কথাই দরিয়াবিবি তাহাকে শোনাইয়াছে।
তাই।
হাসি চাপা দিতে চন্দ্র কোটাল আবার উচ্চারণ করিল, তাই তো ভাবী সাহেব। এমন মানুষ আমি আর একটা দেখিনি। মাঝে মাঝে কি যেন ঝোঁক চাপে! দুহপ্তা গেল। মানুষ একটা খবর তো দেয়। তা-ও না।
দরিয়াবিবির দীর্ঘশ্বাস কোটালের কানে যায়। চন্দ্র সহসা কোনো জবাব দিতে পারে। আবহাওয়া হালকা করিতে সে ওস্তাদ। কিন্তু সেও কেমন যেন ম্লান হইয়া গিয়াছিল।
আমজাদ বলিল, জানো কাকা, আব্বা আমাদের দেখতে পারে না। তাই বাড়ি ছেড়ে পালায়।
চন্দ্র প্রতিবাদ জানাইল, তা না, চাচা। খেয়ালী মানুষ। সংসার নিয়ে কষ্ট পায়। তাই মাঝে মাঝে ঐ সব করে। ভাবে দুঃখ যাবে। কিন্তু দুঃখ কি সহজে যায়? ব্রিটিশ রাজত্ব। আগে ব্রিটিশ যাক, রোহিণী-হাতেম বখশ ঐ শালারা যাক, তবে না দুঃখ যাবে।
আমজাদ এত কথা বোঝে না।
সে সায় দিতে রাজি নয়। পিতার প্রতি তার আক্রোশ আছে।
কিন্তু ব্যাপার কি জানো, তোমার বাবা। চন্দ্র কোটালের বাক্য আড়াল হইতে পূর্ণ করিল দরিয়াবিবি, চুপ শয়তান।
