পানের বাটার নিকট ফিরিয়া আসিল দরিয়াবিবি সংকুচিত।
চোখাচোখি ইয়াকুবের দিকে সে তাকায়। না, তার দৃষ্টিভ্রম। আসলে ইয়াকুবের দৃষ্টি যেন এইরূপ।
অবসর সময়ে তার মনে আন্দোলন জাগে। আসলে লোকটা খারাপ নয়। তবে অমার্জিত রুচি। এই জাতীয় দ্বন্দ্বের ভিতর দরিয়াবিবি সমস্যার সমাধান খোঁজে। ব্যবসাদার লম্পট সম্বন্ধে দরিয়াবিবির কোনো জ্ঞান ছিল না। আজহার তার গুণগ্রামের হদিস জানিত বলিয়া দূরে দূরে থাকিত।
সেদিন সকালেই ইয়াকুব চলিয়া গেল। দুপুরবেলা বিছানা পরিষ্কার করিতে গিয়া বালিশের নিচে একটা দশ টাকার নোট পাইল, দাঁড়াইয়া রহিল দরিয়াবিবি কিছুক্ষণ স্তব্ধ। মুঠির মধ্যে নোট অজানিতেই সে দুমড়াইতে থাকে। সচেতন হইলে সে সংকুচিত নোটটি আঁচলে বাঁধিয়া রাখিল।
মাঠের সামান্য কাজ করিয়া আজহার চন্দ্র কোটালের বাড়ি গিয়াছিল। সে বিকালে গানের বায়নায় যাইবে। সাজগোজ হইতেছে সকালে।
চন্দ্র আজহারকে বসিতে দিয়া তামাক সাজিতে লাগিল। শিবুর বৌ আগে আসিয়াছিল। একটি বছর চার বয়সের ছেলে মার অঙ্গসংলগ্ন হইয়া আঙুল চুষিতেছে। কাঁখে আর একটি মেয়ে।
আজহারের চোখে পড়িতে শিবুর বৌ ঘোমটা বাড়াইয়া দিল।
কেমন আছ, বৌ।
বৌ অশ্রুসজল কণ্ঠেই জবাব দিল, ভগবান মেরেছেন। আমাদের আর থাকাথাকি, চাচা।
শিবু আজহারকে চাচা বলিয়া ডাকিত। সেই সূত্রে এই আত্মীয়তা।
আজহার সমবেদনার কোনো কথা যেন খুঁজিয়া পায় না। দীর্ঘনিঃশ্বাস ফেলিল। শিবুর বৌর কানে তা পৌঁছায়।
চন্দ্র এমন সময় কলিকা হাতে আজহারের পাশে আসিয়া বসিল।
দেখেছ তো খাঁ সাহেব। এই তোমার-আমার ধর্ম।
তা দেখছি।
দেখছ। ঘোড়ার ডিম দেখছ। ধর্ম না কচু। হাতেম বখশ যদি মুসলমান হয়, কি রোহিণী হিন্দু হয় তবে চণ্ডাল কে?
দেখছি সব।
তুসি কিছু দেখতে পাও না, খাঁ। টাকার নামে শালারা ধার্মিক। খামাখা দুটো গরিবের প্রাণ গেল।
শিবুর বৌকে সম্বোধন করিয়া বলিল, তুমি গিয়েছিলে মা, রোহিণী চৌধুরীর কাছে?
গিয়েছিলাম, পাঁচটা টাকা দিয়েছিল।
বড় ম্রিয়মাণ কণ্ঠ শিবুর বৌর।
শোনো, খাঁ। পাঁচ টাকা। অমন টাকায় মুতে দাও। একটা লোকের দাম পাঁচ টাকা। আজহার ভাই, গরিবে গরিবে যদ্দিন বেঁচে আছি, আর ধর্মের কথা কানে আনছি না। আমিও রোহিণীর ফাঁদে পড়েছিলাম। শালা রোহিণী।
গালাগাল দিয়ো না খামাখা।
গালাগাল দেব না। তুমি শিবুর বৌকে খাওয়াতে পারবে? ধরো, খাওয়াতে পারলে, কিন্তু ওর স্বামীকে জ্যান্ত করে দিতে পারবে? গালাগাল দেব না?
রক্তচক্ষু কোটাল হুঁকা টানিতে লাগিল।
শিবুর ছেলেটা দুইজনের দিকে অবোধ নয়নে চাহিয়া থাকে।
গালাগাল দেব না। ইসমাইলের বৌ ছেলেপুলে নিয়ে বাবার বাড়ি চলে গেল। তারাও গরিব। তুমি তো চেন দশহাটার মল্লিকদের।
হুঁ চিনি।
শিবুর বৌর কেউ নেই। তার চালে খড় নেই দুআঁটি। বলছি, বৌ এখানে এসে থাক। আমি আর একটা কুঁড়ে তুলব। গাঁয়ের বাসেদ, পাড়, গণেশ সবাই গায়ে-গতরে খেটে দেবে বলেছে।
আজহার বলিল, যখন যা দরকার আমাকে ডেকো।
তা আলবৎ ডাকব। হাতেম বখশের গুষ্টিশুদ্ধ শহরে মদ টানে, সে মুসলমান, তুমিও তার কথায় উঠো বসো, না?
তুমিও তো রোহিণীর কথায় নেচেছিলে?
লজ্জিত কোটাল জবাব দিল, তা ঠিক। কিন্তু আর নয়। শালাদের ধর্মের নিকুচি। আর আজহার ভাই, তোমার মিনমিনে স্বভাব আমার ভালো লাগে না। জোর গলায় বুক ঠুকে ওদের কাছে কথা বলতে হবে।
ওরা বড়লোক। পুলিশ-দারোগা।
কথা তার মুখ হইতে চন্দ্র যেন লুফিয়া লইল, আইন নেই? আমরা তো দুচারজন নই। গাঁয়ের হাজার হাজার গরিব। পুলিশ যদি আইনমতো না চলে, ওদের কথায় ওঠে বসে; আমাদের লাঠি নেই, বল নেই?
ভাঁটার মতো চক্ষু ঘোরে কোটালের।
হঠাৎ থামিয়া সে বলে, কথায় কথায় দেরি হয়ে গেল, অনেক গোছগাছ বাকি। পরে এসো তুমি। শিবু বৌমা, এখানে খেয়ে সন্ধ্যায় বাড়ি যেয়ো–
দুইজনে আসর ভাঙিয়া দিল।
আজহার গ্রামের পথে শিবুর বৌর কথা ভাবে। ভবিষ্যতের সংস্থান তারও নাই। একমাত্র আশ্রয় পথ। না, সে আবার ভাগ্য অন্বেষণে বাহির হইবে। টাকার জন্য এত হীনতা যখন স্বীকার করিয়াছে, ঘরে পড়িয়া থাকা ভালো নয়। কপাল ফিরিবে না তার?
খোদার মরজি হইলে কতক্ষণ?
.
২৮.
সকাল-সকাল দরিয়াবিবি গৃহস্থালির কাজ সারিয়া বসিয়াছিল। কোলে ছোট খুকি শরী।
ঈষৎ সন্ধ্যা উত্তীর্ণ হইয়া উঠিতেছিল। আমজাদ নিজের ঘরে জোরে জোরে পাঠাভ্যাস করিতেছে। আজহার দাওয়ায় বসিয়া হুঁকা লইয়া মশগুল। গুড়গুড় শব্দ উঠিতেছে।
মুনির মা!
আজহার ডাক দিল। মোনাদির আসিবার পর দরিয়াবিবির নাম বদলাইয়া ফেলিয়াছিল সে। কালেভদ্রে আমুর মা বলিয়া ডাক দিত।
কেন?
আজ ওদিকের গাঁয়ে গিয়েছিলাম।
কেন?
বীজ ধান কেনা দরকার।
উত্তপ্ত কণ্ঠ দরিয়াবিবির, তা আমাকে শোনানোর কোনো দরকার আছে?
না। এমনি।
আজহার চুপ করিয়া গেল। কিন্তু তার কথার খেই শেষ হয় নাই, কণ্ঠে তার পরিচয়।
কিছুক্ষণ স্তব্ধ থাকিয়া হঠাৎ সে বলে, ও গাঁয়ে গিয়েছিলাম, শুনলাম মুনি নাকি
দরিয়াবিবি উৎকর্ণ হয় এইবার।
আজহার বলিতে থাকে : মুনি, ওগাঁয়ে নেই।
নেই!
শ্রুতি-ভ্রমের উপর এখনো বিশ্বাস আছে দরিয়াবিবির।
পুনরুক্তি করিল, কে নেই?
মুনি।
মুনি ও-গাঁয়ে নেই?
না।
কতদিন নেই!
এখান থেকে যাওয়ার পর আর নাকি ওখানে যায়নি।
