প্রায় সন্ধ্যা। এবার বাড়ি ফিরিতে হয়। মার ডাক আম্বিয়ার কানে যায় না।
তুমি যাও না, মা। তু
ই এই বাড়িতে থাক তবে, বুবুর বৌ হয়ে।
দরিয়াবিবি কিছুক্ষণ আগে তার গোপন-মনে এমনই কল্পনার দুর্গ রচনা করিয়াছিল। মোনাদির আর চার বছরে মোলোয় পড়িবে। তখন
আমিরন চাচির কথা শুনিয়া দরিয়াবিবি হাসিয়া উঠিল।
বেশ, রেখে যাও।
আমার গাডেয় হাওয়া লাগে। খাইয়ে-পরিয়ে এখন মানুষ তো করো।
হাসুবৌ কথা গায়ে মাখিয়া লইল।
আমাকে দাও, আমি খাওয়াব-পরাব।
বেশ, নিয়ে যা।
আয়, আম্বিয়া আয় না, মা।
সাকেরের মার চড়া আওয়াজ দূর হইতে শোনা যায়। হাসুবৌ চলিয়া গেল।
আমজাদ চাচিদের আগাইয়া দিতে আসিল। মার বারণ সে শোনে না। তার আর ভূতের ভয় করে না। চন্দ্র কাকার গানের ঢেউয়ে সব কোথায় ভাসিয়া গিয়াছে। হোক না সন্ধ্যা।
অস্পষ্ট বনের সড়কে মা-মেয়ে সন্তর্পণে অগ্রসর হয়। আমজাদ কিছুদূর গিয়া থমকিয়া দাঁড়াইল।
সন্ধ্যার আঁধার-বন্দী বাতাস বেতগাছে শিরশির বহিয়া যায়। সেদিনও সন্ধ্যা ছিল। সেদিন মুনিভাই সঙ্গে ছিল। হঠাৎ তার দুই চোখ ছাপাইয়া পানি আসে। মুনিভাইকে সে সত্যি ভালোবাসিয়াছিল।
.
২৭.
চন্দ্র কোটালের অবসর নাই।
এই বছর ভালো ফসল হইয়াছিল। গ্রামে গ্রামে ভাড়-নাচের আসর বসে। অনেক বায়না কোটালের। রাজেন্দ্র সাজ-পোশাক আনিয়াছিল। বেশ জাঁক-জমকের সঙ্গে তার দল জমিয়া উঠিয়াছে। এই জন্য বিভিন্ন গ্রাম হইতে ডাক আসে।
আজহার নূতন ব্যবসা-পত্তনের সঙ্গী পায় না। কোটালও তাকে কিছুদিন সবুর করিতে বলিল। মনঃক্ষুণ্ণ হয় আজহার। হয়ত পরে তার হাতে টাকা থাকিবে না। সে নিজেই কোনো সুরাহা করিবে।
গঞ্জের দিনে ইয়াকুব আসিয়াছিল। সেও প্রসঙ্গ উত্থাপন করিল। আজহার তার কথায় সায় দেয় না। ইয়াকুব একা আসে না তো। সঙ্গে হাট-বাজার। মুরগি, ঘি, এমনকি সরু চাল পর্যন্ত সে লইয়া আসে। আজহার এসব পছন্দ করে না। তার আত্মসম্মানে ঘা লাগে। এইজন্য ইয়াকুবের সঙ্গে কোনো অংশীদারী কাজ তার ভালো লাগে না।
দরিয়াবিবি আজকাল ইয়াকুবের চাল-চলন সহজে গ্রহণ করে। তার আত্মসম্মান সহজে তীক্ষ্ণ হইয়া ওঠে না। আপনজন আত্মীয়, সে কিছু সঙ্গে আনিলে, অত সংবেদনশীল হইলে চলিবে কেন?
আজহার চুপচাপ থাকে। মেহমানদারীর কাজে দরিয়াবিবির বেশ উৎসাহ দেখা যায়। বহুদিন পরে এই বাড়িতে পলান্নের সৌরভ পাওয়া গেল। আরো দুতিন রকমের তরকারী হইল। ইয়াকুব লুচি তৈয়ারি করিতে বলিয়াছিল। দরিয়াবিবির সম্মতি ছিল না। কাল সকালে নাস্তার সময় তৈয়ারি হইবে। বাড়ির ছেলেরা ইয়াকুবের নামে উৎফুল্ল হইয়া ওঠে। ইয়াকুব চাচা নামে মধু ঝরে না শুধু, নঈমার জিহ্বায় রীতিমতো লালা ঝরে।
আমজাদের স্কুলের বেতন সে নিয়মিত দিয়া আসিতেছে।
কয়েক বছর পূর্বে দরিয়াবিবি সামান্য দান-গ্রহণে আসেকজানের সহিত বিবাদ করিত। সেই তেজ অন্তর্হিত হইয়াছে। স্বামীর মানসিকতা সে চেনে। আজহারের উপর তার ক্ষোভ হ্রাস পায় না। আত্মীয়স্বজনের সহিত অত বাঁধাবাঁধি নিয়ম চলে না।
রাত্রে আহারের সময় আজহার ডাল ও দৈনন্দিন বরাদ্দ একটি আলুর তরকারি দিয়া ভোজ সমাধা করিল। মাগুর মাছ আনিয়াছিল ইয়াকুব। সে তা স্পর্শ করিল না।
দরিয়াবিবি শুধায়, গোশত খাবে না?
না, আমার পেটের গোলমাল আছে।
আসলে আজহার মনের কথা চাপিয়া গেল। ইয়াকুবের কয়েকটি টাকা সে লইয়াছে তাহা যেন তার গায়ে হুল ফুটাইতেছে। টাকা ফেরত দেওয়ার উপায় নাই। তার স্বপ্নরাজ্য যে ধূলিসাৎ হইয়া যায় টাকাগুলির অভাবে। এই বাধ্য-বাধকতার ছায়ায় আজহার নিরুপায়। নচেৎ সে ইয়াকুবের মুখোমুখি এই দাঁতব্যগিরি বন্ধ করিবার হুকুম দিত।
দরিয়াবিবি কোথায় ঘা দিতে হয়, ভালোরূপেই জানে।
রাত্রে স্বামীকে বলিল, আমুর ইস্কুলের মাইনে মাসে মাসে দিতে হয়রান। সামনের বছর ফসল যদি না হয়, কিভাবে যে দিন কাটবে।
আজহার কিছুক্ষণ নিরুত্তর রহিল।
জবাব দাও, এসব কথা মনে আছে! খালি ব্যবসা-ব্যবসা। কতবারই কত টাকা উড়িয়ে দিলে।
আল্লার মরজি হলে কতক্ষণ।
বিরক্ত হয় দরিয়াবিবি, আল্লার মরজি মরজি করে তো দশ বছর কেটে গেল। এখন তোমার মরজি হলে বাঁচা যায়।
আজহার জবাব দিতে গিয়া থামিয়া গেল।
ইয়াকুব ভাইয়ের সঙ্গে ব্যবসা কর না। দেখ না, আল্লার মরজি কোন দিকে যায়।
ওর সঙ্গে ব্যবসা পোষাবে না।
তা পোষাবে কেন?
দরিয়াবিবি উত্তপ্ত হইয়া উঠিয়াছিল। আজহারের নির্বুদ্ধিতার শত রকম ব্যাখ্যা করিল।
কিন্তু অপর পক্ষ নীরব। আনমনা কখন ঘুমাইয়া পড়িয়াছে, সে জানে না।
পরদিন সকালে আবার নাস্তার বহর। ইয়াকুব দরিয়াবিবিকে তার বাৎসরিক মুনাফার বয়ান দিল। তিন হাজার টাকা পাইয়াছে পাটে, গোলদারীর দোকানে দুহাজার ইত্যাদি ইত্যাদি।
নাস্তা খাওয়ার সময় আজহারকে পাওয়া গেল না। সে মাঠে চলিয়া গিয়াছে। গোয়ালঘরে গরু-ছাগল কিছু নাই। দরিয়াবিবির অনুমান মিথ্যা নয়।
ইয়াকুব বলিল, ভাবী সাহেব, কেমন যেন আমাদের ভাই সাহেব। আমার সঙ্গে কাজকর্ম করত, আল্লা মুখ তুলে চাইতেন।
মাথায় ছিট আছে। কে পারবে বল ওর সঙ্গে।
আপনার মতো আক্কেল থাকলে আমি এতদিনে লাখপতি হয়ে যেতাম।
প্রশংসায় সন্তুষ্ট হয় দরিয়াবিবি। দেবরকে সে পান সাজিয়া দিতেছিল। বাটায় সুপারি নাই। একবার উঠিয়া দরিয়াবিবিসিকায় সুপারি আছে। ঘরে প্রবেশের সময় সে একবার পিছন ফেরে। ইয়াকুব তার গমনপথ অথবা নিতম্বের দিকে চাহিয়া আছে, বোঝা যায় না। কিন্তু তার দৃষ্টি খুব শোভন মনে হয় না।
