জলকর লইয়া দাঙ্গার সময় শিবু ও ইসমাইল বেশ জখম হইয়াছিল। সদর হাসপাতালে ছিল তারা এতদিন। দুইজনে খুব পরিচিত বন্ধু।
অনেকক্ষণ চুপচাপ বসিয়া থাকে তিনজন। সন্ধ্যার কালিমালেপন শুরু হইয়াছে দিকদিগন্তরে।
ফোঁপাইয়া উঠিল চন্দ্র, ওদের বাড়িতে কি কান্না। শিবুর বৌ ছেলেপুলে নিয়ে হয়ত খেয়ে মরবে। রোহিণী আর হাতেম শালার কি আসে যায়। আমার চোখ খুলে গেছে কাল সদরের হাসপাতালে।
ফোঁপাইতে থাকে চন্দ্র, কথা শেষ হয় না।
আজহার নির্বাক। চন্দ্র আর কোনো কথা বলিল না, নির্জীবের মতো বসিয়া রহিল।
সন্ধ্যার অন্ধকারে আর কাহারো মুখ দেখা যায় না। নিস্তব্ধতা প্রথম ভাঙিয়া আজহার বলিল, চল চন্দর, বাড়ি চল।
চন্দ্র কোনো জবাব না দিয়া উঠিয়া পড়িল। আর কোনো বাক্যালাপ করিল না মাত্র। সে মাঠের পথ ধরিয়াছে।
পিতা-পুত্র হতবাক। তাহারা গ্রামের পথে অগ্রসর হইল। আমজাদের অসোয়াস্তি, বহুদিন পরে চন্দ্র কাকার সঙ্গে দেখা। কিন্তু সন্ধ্যাটি আজ মাঠেই মারা গেল।
কাঠা দশেক জমি পার হইয়া আমজাদ শুনিতে পায় চন্দ্র কোটাল যেন গান ধরিয়াছে।
আজহার বলে, সত্যি পাগল চন্দর। তাড়ি গিলেছে বোধহয়।
না, আব্বা। মুখে গন্ধ নেই একদম।
সায়ং-আচ্ছন্ন মাঠের প্রান্তরে মেঠো সুর বাতাসের আলিঙ্গনে ভাসিয়া যায়। আমজাদের শ্রুতিভ্রম মাত্র।
ভগবান, তোমার মাথায় ঝাঁটা
ও তোমার মাথায় ঝাঁটা
যে চেয়েছে তোমার দিকে
তারই চোখে লঙ্কা বাটা।
ও তোমার মাথায় ঝাঁটা।
আমজাদের কান সুরের অন্বেষণে চলে।
হঠাৎ সে জিজ্ঞাসা করিল, আব্বা, ভগবান মানে আল্লা, না?
আজহার ঠাণ্ডা কণ্ঠে জবাব দিল, হ্যাঁ।
২৬-৩০. দরিয়াবিবির খোঁজ
হাসুবৌ আজকাল প্রায়ই দরিয়াবিবির খোঁজ লইতে আসে। শাশুড়ীর কড়া তাগিদের তাড়া না আসিলে এই বাড়ি হইতে যাওয়ার নাম করে না সে।
আমজাদ মোনাদিরের খবর লইয়াছিল। সে তার আগেকার বাড়িতে যায় নাই। দরিয়াবিবি এ খবর জানে না। হাসুবৌ আমজাদকে তাহা বলিতে বারণ করিয়াছিল। পাছে তার মা আরো ব্যাকুল হইয়া পড়ে। আমজাদ তাই মিথ্যা কথা বলিয়াছিল। সে ওই গাঁয়ে আছে, মা।
হাসুবৌ গোপনে আমজাদের উপর ভর দিয়াছে, মুনির খবর আনা চাই-ই কিন্তু। হাসু চাচি, আমি আরো কয়েকজনকে তাগাদা দিয়েছি। এই ষড়যন্ত্রের কোনো খোঁজ দরিয়াবিবি রাখে না। সে চলিয়া গিয়াছে, তা যাক। কোনো উপায় তো আর নাই। তবু আত্মীয়দের সঙ্গে আছে, দরিয়াবিবির বুকে যেন বাঁধা থাকে সে।
হাসুবৌ জিজ্ঞাসা করিল, আমুর মা বুবু, তোমার নূতন মেয়েটি কিন্তু বেশ। আমাকে দিয়ে দাও, আমার তো ছেলেমেয়ে নেই।
তা কি দেওয়া যায়, পাগলী।
আমার কত সাধ একটা ছেলে–কানা খোঁড়াও যদি একটা ছেলে কি মেয়ে পেতাম।
দরিয়াবিবি এই বন্ধ্যা-নারীর ব্যথা অনুভব করে।
আল্লা দিলে হবে। তোর বয়স তো চলে যায়নি।
দীর্ঘ নিশ্বাস ফেলিল হাসুবৌ নীরবে।
এমন সময় আসিল আমিরন চাচি। সঙ্গে আম্বিয়া।
দরিয়াবিবি খুব খুশি হয়, এসো বুবু।
কৈফিয়ত দিতে থাকে আমিরন চাচি, এতদিন পরে আজ একটু ফুরসত পেয়েছি জান-জালাপালা কাজে কাজে।
আসলে আমাদের মনে নেই।
দরিয়াবিবি কৃত্রিম ও কুটিল হাসির ছায়ায় চাহিয়া থাকে।
তুমি তো বলবেই দরিয়াবুবু! সত্যি নানা ঝঞ্ঝাট।
পেটে আর ভাত সেঁধোয় না।
কেন?
তারপর আমিরন চাচি তার দেবরের কাহিনী বলে। জমিগুলি হস্তগত করিতে সে উঠিয়া পড়িয়া লাগিয়াছে। তিন-চার বছর পরে আম্বিয়াকে বিদায় করিতে এই জমিগুলি কাজে লাগিত। হয়ত জমি দেখাইয়া কোনো ঘর-জামাই পাওয়া যাইত। ওই তো এক রত্তি মেয়ে। তাহাকে ছাড়িয়া দিয়া ভিটায় বাস অসম্ভব।
দরিয়াবিবির সহানুভূতি আজও হ্রাস হয় না।
আম্বিয়ার জন্য অত মাথা ঘামিয়ো না। আল্লার মাল আল্লার হাতে সঁপে দেবে। কিন্তু তোমার দেবরটা এত ছোটলোক!
আর ঘরে বসে খাবে কী? পরের দিকে চেয়ে আছে শকুনের মতো।
আম্বিয়া মার পাশে ছিল না। আমজাদের সহিত সে দাওয়ার বাহিরে কাঁঠাল তলায় নানা কথায় ব্যস্ত।
মুনি আর এল না।
আমজাদ বিমর্ষ কণ্ঠে জবাব দিল, সে চলে গেছে কি-না। মা এখনো তার জন্য কত কাঁদে।
কবে যে আবার আসবে। তোর মুনিভাই কিন্তু বেশ।
বেশ, না?
হ্যাঁ।
মুনিভাই আমার সঙ্গে ঝগড়া করে না।
খোঁজ করে নিয়ে আয় না তাকে।
খোঁজ নিয়েছি।
আসল কথা প্রায় প্রকাশ হইয়া পড়িয়াছিল। হাসুবৌর উপদেশ স্মরণ হয় অকস্মাৎ।
কথা ঘুরাইয়া আমজাদ বলে, খোঁজ নিয়েছি। আসবে ইচ্ছামতো।
আম্বিয়া জবাবে সন্তুষ্ট হয় না।
তুমি বড় মিছে কথা বল। খোঁজ নিলে আর আসে না?
সে আসতে চায় না।
তার মুখে পড়া বেশ মানায়।
মোনাদির সকল প্রশ্ন ও জবাবের কেন্দ্র। আর যেন কোনো কথা নাই পৃথিবীতে।
আমিরন চাচি, হাসুবৌ, দরিয়াবিবি গৃহস্থালির নানা গল্প করে। দুঃখ-লাঘবিনী শক্তি আছে কথার। একের বেদনা-কাহিনী অপরের দুঃখাগ্নির মুখে ছাই চাপা দিতে পারে। সহানুভূতির হেতু আরো অটুট হয় তার জোরে।
হাসুবৌকে আমিরন চাচি বলে, হতভাগী, ছেলেমেয়ে চাস, এই দ্যাখ, আমরা পুড়ে মরছি।
এমন পুড়ে মরতেই বা জায়গা পাই কোথায়?
দরিয়াবিবির মন কয়েকদিন ভালো ছিল। নিত্যনূতন অভাব-বিজড়িত সংসারে যেন সামান্য সচ্ছলতার হাওয়া ঢুকিয়াছে। গল্পে গল্পে সময় কাটিয়া যায়। আম্বিয়া এই বাড়ি আসিলে আর যাইতে চায় না।
