হঠাৎ আজহারকে দেখিয়া সে উফুল্ল হয় না।
অমনি বলে, আব্বা।
আব্বা, তুমি অনেক কাজ এগিয়ে রেখেছে, দেখছি।
হ্যাঁ আব্বা।
বেশ।
এবার লঙ্কা হলে হাটে নিয়ে যাব না। আমাদের সারাবছর কিনতে হয়।
কিন্তু তখন হাত টান থাকলে তুমি কি তা মনে রাখবে?
লজ্জিত হয় আজহার মন্তব্যে। সত্যি তার খেয়াল থাকে না তখন। অথচ ক্ষেতের ফসল বেচিয়া দিয়া সারা বছর মুদির দোকানের দিকে চাহিয়া থাকিতে হয়।
না, এবার আর বেচব না আল্লা চায়-তো।
থামিয়া গেল আজহার। হাতে টাকা আছে, তবু খটকা তার মনে। আল্লার করুণা মুছিয়া যাইতে কতক্ষণ।
দিনের আলো নিভিয়া আসিতেছে। মাঠের রূপ বদলাইয়া যায়। পিতা-পুত্রে রবি ফসলের টুকিটাকি কাজ করে।
হঠাৎ গানের আওয়াজ শোনা গেল।
পিতা-পুত্র উৎকর্ণ। গানের কলি দোহরাইয়া গায়ক গাহিতেছে :
ভগবান, তোমার মাথায় ঝাঁটা,
ও তোমার মাথায় ঝাঁটা।
যে চেয়েছে তোমার দিকে
তারই চোখে লঙ্কা-বাটা।
ও ছড়িয়ে দিলে, ছড়িয়ে দিলে
মারলে তারে তিলে তিলে
ও আমার বৃথা ফসল কাটা
ও তোমার মাথায় ঝাঁটা।
কণ্ঠস্বর পরিচিত।
আজহার আবার নিজ মনে কাজ করিতে লাগিল।
চন্দ্ৰকাকা, না আব্বা?
আজহার কোনো জবাব দিল না। আমজাদ মাঠের দিকে চাহিয়াছিল। গায়কের অবয়ব তখনো দৃষ্টির বাহিরে।
আনমনা আমজাদ। আজহার লক্ষ করে। কাজের গাফিলতি সে পছন্দ করে না।
কাজ কর, আমু।
চন্দ্ৰকাকা, না?
হুঁ, তা কি করতে চাও?
পিতার কণ্ঠস্বর উষ্ণ। আমজাদ মাথা হেঁট করিয়া ক্ষেতের লঙ্কাচারা বসায়। আড়চোখে মাঠের দিকে চাহিয়া থাকে।
যে চেয়েছে তোমার দিকে
তারই চোখে লঙ্কা বাটা।
গান পুনরায় শুরু হইয়াছে।
আমজাদ হাসিয়া বলে, আব্বা, চন্দ্র কাকা পাগল। ভগবান মানে আল্লা না, আব্বা?
কাজ কর।
ধমক দিয়া উঠিল আজহার।
কলাবনের আড়াল হইতে মেঠোপথে চন্দ্র বাহির হইল। কণ্ঠস্বর নিকটবর্তী হইতেছে। আমজাদ মনে মনে খুশি হয়। কিন্তু আনন্দ আর বেশিক্ষণ স্থায়ী হয় না। চন্দ্ৰকাকা আর এদিকে আসিবে না। হিন্দু-মুসলমান ঝগড়া। নিকুচি করি ঝগড়ার, কি-সব বাজে কথা। আমজাদ ভিতরে তাতিয়া উঠে।
আজহার আবার আনমনা আমজাদকে কাজে মনোযোগ দিতে বলিল।
গায়ক এইদিকে আসিতেছে। আড়চোখে আমজাদ দেখিল, আজ চন্দ্র কোটাল জমির বেড়ার ওপারে থমকিয়া দাঁড়ায় নাই। সে তাহাদের দিকেই ক্রমশ অগ্রসর হইতেছে। আরো নিকটে, ঠিক তাহাদের পাশে আসিয়া দাঁড়াইল চন্দ্র কোটাল।
আজহার চুপচাপ কাজ করিয়া যাইতেছে। কোটালের উপস্থিতি যেন সে অবহেলা করিতে চায়। পিতার ভয়ে আমজাদ তাহার দিকে তাকায় না।
তিনজনে নিস্তব্ধ। এমন অসোয়াস্তিকর মুহূর্ত কারো জীবনে যেন আসে নাই। কোটাল হঠাৎ বোকার মতো হাসিয়া উঠিল। আমজাদ তার দিকে একবার আড়চোখে চাহিয়া মাটি খুঁড়িতে লাগিল। হাসি পায় তার। শুধু পিতার ভয়ে চুপ করিয়া আছে।
–আজহার ভাই, ও খাঁ সাহেব। বলিয়া চন্দ্র থামিয়া গেল। অপরপক্ষ তখনো নীরব।
এই চাচা, তোমার বাবা এবার বোবা হয়ে গেছে নাকি?
বোবা বাবা। ও-কার আর আ-কার।
চন্দ্র আমজাদকে লক্ষ্য করিয়া বলিল।
আজহার বিন্দুমাত্র নড়িল না। তার হাতের কাজ অবশ্য স্তব্ধ। তারপর খিলখিল হাসিয়া চন্দ্র হঠাৎ দণ্ডায়মান আজহারের ঠিক পায়ের সম্মুখে উবু হইয়া বসিয়া তার চোখের দিকে তাকাইল। চোখে চোখ পড়ে। কোটালের হাসি সংক্রামক। আজহার না। হাসিয়া পারে না।
চন্দ্র তখন তুড়ি দিয়া এক লাফে উঠিয়া আমজাদকে কাঁধে তুলিয়া লইল। আমজাদ আজকাল বড় হইয়াছে। কাঁধে উঠিতে তার লজ্জা লাগে। কিন্তু বারণের অবসর কোথায়। এতক্ষণে সে শূন্যে।
চন্দ্র নাচিতে নাচিতে বলে, ধৰ্ম্ম-উম্ম আমি মানি নে। যতসব বেজন্মাদের কীর্তি। গান ধরিল সে,
ভগবান, তোমার মাথায় ঝাঁটা,
ও তোমার মাথায় ঝাটা।
তারপরই সে বলে, আজহার ভাই, আমি ভাবতাম আমাদের সাত রকম জাত আছে। তোমাদেরও তাই। ঠিক করেছে সাকের। আমাদের শালা পুরুত ঠাউর (ঠাকুর) আর তোমাদের ওই–।
কথা শেষ করিতে পারে না সে। খিলখিল হাসির শব্দে বেলাশেষের মাঠ ভরিয়া ওঠে।
সুইৎ শব্দে আমজাদকে কাঁধ হইতে নামাইয়া সে বলিল, তামাক দাও।
অন্য কারো কথা বলার অবসর নাই।
চন্দ্র আবার কহিল, আমাদের পুরুত এলে আমিও দাড়ি ছিঁড়ে লেঙ্গা। ধর্মের নিকুচি। যতসব চালবাজি শালাদের ঝগড়া লাগানোর।
আজহার এতক্ষণে মুখ খুলিল, এই পাগল চন্দর।
ঝাঁকড়া-চুল মাথা নাড়িয়া চন্দ্র পদবী গ্রহণ করিল। তারপর আমজাদের দিকে চাহিয়া সে বলিল, চাচা, তোমার বাবার দাড়ি ছিঁড়ে লেঙ্গা।
তিনজনে দম ভরিয়া হাসিতে থাকে এইবার।
আজহার জিজ্ঞাসা করিল, চন্দ্র, তোমার হয়েছিল কি এতদিন?
ভূতে ধরেছিল।
একদম মামদো ভূত।
হ্যাঁ, খাঁ ভাই। আমার চোখ খুলে গেছে কাল।
কাল!
হ্যাঁ।
হঠাৎ স্তব্ধ হইয়া যায় চন্দ্র। তার মুখাবয়বে থরথর কম্পন দেখা যায়। অশ্রুসজল চোখ।
আজহার ভাবে, কি হইল চন্দরের। এ আবার কোন রকম পাগলামি! এতক্ষণ তো সে হাসিতেছিল।
চন্দ্র পাথর। তার চোখ দিয়া অশ্রুর ফোঁটা ঝরিতেছে।
কি হলো, চন্দর?
আজহার নিকটে আসিয়া সমব্যথা মাখা দুই হাত বাড়াইল।
কি হয়েছে?
শালতরু যেন শিলীভূত।
কি হয়েছে?
শিবু, ইসমাইল সদরের হাসপাতালে মারা গেছে।
মারা গেছে।
আজহারের মুখে আর কোনো কথা নাই। সেও বজ্রাহত, স্তব্ধ হইয়া গেল।
