লা-মজহাবীরা খুব সন্তুষ্ট। সভায় তাদের দলে আনন্দের গুঞ্জন শুরু হয়। কিন্তু হানাফিরা মৌলানার উপর চটিয়া উঠিতেছিল।
প্রথম মৌলানা আবার বলিলেন, চুপ করুন। কিন্তু দ্বিতীয় ব্যক্তি চুপ করার বান্দা নন।
কোন দলিলে এমন আজগুবি কথা পেয়েছো? তিরমিজী শরীফে আছে, হযরত আলীর দাড়ি নাভি পর্যন্ত নয়।
ঝুট তোমার তিরমিজী।
হানাফিরা তাহাদের মৌলানার সমর্থক। তাহারা আর চুপ থাকে না। সভায় ফিসফাস শব্দ শুরু হয়।
চুপ করুন।
না, আমি চুপ করব না।
বেয়াদব।
কিছুক্ষণ কথা কাটাকাটি চলিল। তুমুল বাক-যুদ্ধ।
প্রথম মৌলানার ধৈর্য আর টেকে না। তিনি চিৎকার করিয়া বলিলেন, তুমি বেয়াদবের বাচ্চা।
তবে রে হারামজাদা।
দ্বিতীয় মৌলানা অতর্কিত উঠিয়া প্রথম মৌলানা শাহ ফখরুদ্দিনের গালে এক চড় মারিলেন।
দ্বিতীয় মৌলানা হেফজুল্লা সাহেব প্রাথমিক তাল সামলাইয়া ধরিলেন ফখরুদ্দিনের দাড়ি। তারপর ঠাস এক চড়।
শেষে দুইজনে পরস্পরের দাড়ি ধরিয়া চুলাচুলি শুরু করিল। সভায় হট্টগোল। দুই দল সমর্থক ছুটিয়া আসিল। মৌলানাদের দ্বন্দ্ব মুরীদানদের মধ্যেও হাতাহাতির সুযোগ খুলিয়া দিল।
মারো শালা- লা-মজহাবীদের-মারো শালা- হানাফিদের– ওয়াজের মজলিশে ধর্মপ্রাণ মুসলমান ভ্রাতারা হঠাৎ খিস্তী বয়ান শুরু করিলেন।
হাতেম বখশ এতক্ষণে সক্রিয়। প্রথম মৌলানার সমর্থনে তিনি চিৎকার করিতে লাগিলেন। হাতাহাতি থামিল না দেখিয়া তিনি অন্ধকারে গা আড়াল দিলেন। ইজ্জত বাঁচাইলেন চতুরজনের মতো।
আজহার খাঁও এই ওয়াজের মজলিশে আসিয়াছিল। সে নিরীহ ব্যক্তি কিন্তু এই ব্যাপারে সে পাক্কা মুসলমান। এমন বর্বর হইয়া উঠিতে পারে সে হাত আজহার কম চালায় নাই। মজলিশের বাতি নিভিয়া গিয়াছিল। মনের সুখে সে হাতের সাধ মিটাইল। গলা-ফাটা চিৎকার করে সে : শালা হানাফিদের খতম করে দাও। কে বলিবে, আজহার নিতান্ত বেচারা মানুষ। পাকা মুসলমান। ধর্মের অপমান সে সহ্য করিতে পারে না।
দাড়ি লইয়া বিরোধ বাধিয়াছিল। সভা শেষে অনেকে আস্ত দাড়ি লইয়া ঘরে ফিরিতে পারিল না, কয়েকজন জখম হইল। শুধু তাই নয়, দুই গ্রাম দুই শিবিরে পরিণত হইল।
পরদিন লা-মজহাবী পাড়ার লোক হানাফিদের সুযোগ পাইয়া মার দিল। হানাফিরা তার পাল্টা প্রতিশোধ লইল। মৌলানাগণ সেনাপতিরূপে এই গ্রাম-যুদ্ধ পরিচালনা করিতে লাগিলেন। কিন্তু ফিল্ড-মার্শালদের ফিল্ডে দেখা গেল না। তাহারা সদর অন্দরে অবস্থান করিয়া কচি মুরগির আস্বাদ লইতেছিলেন, সঙ্গে পোলাও পরোটা বাদ পড়ে নাই।
এক সপ্তাহ গ্রামে এই অবস্থা। আরো কতদিন কাটিত, কে জানে। সাকের এই সময় সকলের একটি উপকার করিল। প্রথম দিন সেও হুজুগে মাতিয়াছিল। পরে মৌলানাদের কীর্তি সে বুঝিতে পারে। ইহারাই এত গোলমালের খুঁটি। ভয়ানক চটিয়া গেল সে।
লাঠি হাতে সে প্রথমে হানাফি পাড়ায় উপস্থিত হইল। সে পাড়ায় প্রবেশের আগেই চিৎকার করিতে লাগিল : আমি মারামারি করতে আসিনি, যদিও আমার হাতে লাঠি আছে।
অন্যান্য প্রতিবেশী মজা দেখিতে দাঁড়াইল। এই গোয়র লোকের সঙ্গে লাঠিবাজি করিতে কেহ সক্ষম হইবে না।
দহলিজ হইতে সে এক মৌলানাকে কান ধরিয়া টানিয়া আনিল। তারপর দুই চড় ও এক লাঠির ঘা দিয়া বলিল : নিকালো হিয়াসে কাইজ্যা বাধাতে এসেছো, শালারা। চশমখোর শালারা নিজের রাগ সামলাতে পারে না। কুকুর-কুকুর। আবার মুরীদ করতে এসেছে।
মৌলানার মুরীদগণ স্তব্ধ। হুজুরের দুর্দশার মুখে কেহ ছুটিয়া আসিল না।
সাকের নিজে ওহাবী। নিজের পাড়ায় এক মৌলানাকে ভয়ানক চাবুক বাজির পর হাঁকাইয়া দিল।
গ্রাম হাঁফ ছাড়িয়া বাঁচিল। প্রথমে কয়েকজন সাকেরের উপর অসন্তুষ্ট হইয়াছিল, পরে দুই হাত তুলিয়া শোকর। মেয়েমহলের অনেকে সাকেরের জন্য আল্লাহর দরগায় দোয়া প্রার্থনা করিল। ছেলেপুলে লইয়া এতদিন শান্তি ছিল না। কখন কে জখম হয়। অনেক মেয়ের বুকের ধুকধুকানি ভাব এতদিনে গেল।
গ্রাম দুই দিনে স্বাভাবিক।
আজহার প্রকৃতিস্থ হইয়াছে পুনরায়। এই কয়দিন দরিয়াবিবি পর্যন্ত তার চেহারা দেখিয়া মনে মনে ভয় পাইত। ধর্মের নামে সে যেন জানোয়ার বনিয়া যায়, অথচ আর কখনো তার এই তেজ চোখে পড়ে না।
সুযোগ বুঝিয়া দরিয়াবিবি একদিন ব্যক্ত করিয়া বলিল, যখন কেউ বিনা দোষে তোমার উপর জুলুম করে, তখন তো ভিজে বিড়াল সেজে বসে রইলে।
হুঁ।
দরিয়াবিবি ব্যঙ্গ-শব্দ করিল, হুঁ।
তারপর সে সাকেরের পৌরুষের প্রশংসা আরম্ভ মাত্র আজহার নিঃশব্দে মাঠের দিকে চলিয়া গেল।
আমজাদ বহু পূর্বে মাঠে গিয়াছে। স্কুলের ছুটি। তার লজ্জা লাগে মাঠের কাজে। কিন্তু বাড়ির দুর্দশা দেখিয়া পিতাকে সাহায্য করিতে বেশ আনন্দ পায়। যদিও পিতার উপর তার শ্রদ্ধা দিনদিন কমিয়া যাইতেছে। তার আব্বা যেন কি রকম!
জমির এক কোণে লঙ্কাচারা রোপণের জন্য মাটি তৈয়ারি হইতেছিল। লাঙল হইয়া গিয়াছে। এখন শুধু পরিপাটি বাকি।
বেড়া দিতে হইবে মজবুত করিয়া। গরু ছাগলের উৎপাত লঙ্কা গাছের উপর বেশি। সারি বন্দী চারা পুঁতিবার জন্য আইল সোজা করিতে হইবে।
আমজাদ এইসব কাজ খুব ভালোবাসে। ছোট কোদাল লইয়া সে সোজা রেখাকার মাটি সাজাইতেছিল। এই সময় পশলা বৃষ্টি হইয়া গেল, পানি-বওয়ার মেহনত দরকার হইল না।
