এমন মানুষ। জ্বরের বিকার নয় তো? দরিয়াবিবি নোটটা নাড়াচাড়া করিয়া ইয়াকুবের ব্যাগেই রাখিয়া দিল। নিঃশব্দে লক্ষ্য করিল ইয়াকুব, আর কোনো কথা বলিল না।
ডাক্তার ডাকি। কি বলো ভাই?
না। যদি ডাক্তার ডাকো, আমি জ্বর গায়েই বাড়ি ফিরব।
দরিয়াবিবি নিরুপায়। বড় একরোখা ইয়াকুব, সামান্য কয়েক মাসের পরিচয়ে সে উপলব্ধি করিয়াছিল। চুপ করিয়া গেল সে।
ঘুমাইয়া পড়িল ইয়াকুব কয়েক মিনিটে। দরিয়াবিবি মাথা টেপা বন্ধ করিল। আমজাদের গলার আওয়াজ পাইয়া সে বিছানার পাশ ছাড়িয়া বাহিরে আসিল। বেশি বেলা নাই। সংসারের হাজার কাজ অপেক্ষা করিতেছে।
সন্ধ্যার একটু পূর্বে বস্তা মাথায় ফিরিয়া আসিল আজহার। পটল বীজ পায় নাই। পটল আলের দাম বেশি। তাও প্রায় শুষ্ক।
ইয়াকুব এখানে জ্বরে ভুগিতেছে। সে-সংবাদ তার কানে গেল। তার সঙ্গে সাক্ষাতের তেমন কোনো উৎসাহ দেখাইল না আজহার।
হাত-মুখ ধুইয়া, কিছু আহারের পর সে দাওয়ায় তামাক নিঃশেষ করিতে লাগিল।
দরিয়াবিবি বলিল, একবার দেখে এসো। তোমার কী একটু মেনসত্বে (মনুষ্যত্ব) নেই। কি মনে করবে।
আজহার এই ধমকে সন্তুষ্ট হয়। সংসারের কাজে দরিয়াবিবি আবার পরামর্শ করিতেছে তার সহিত। সহযোগিতার দরদই তো সে প্রত্যাশা করে। ইয়াকুবের সহিত অনেক কথা হইল। সংসার, চাষ-বাস, ছেলেদের লেখাপড়া, নঈমার চোখের অসুখ ইত্যাদি। পটল-আলের কথাও বলিল আজহার।
ইয়াকুব পকেট হইতে কুড়িটি টাকা আজহারের হাতে দিয়া বলিল, বড় ভাই, আপনি কত জায়গায় ঘুরছেন। আমার সঙ্গে ব্যবসা করুন। কোনো কিছু আটকাবে না।
আজহার নোট লইয়া বসিয়া রহিল। দ্বিধা-দ্বন্দ্বে সে গ্রহণ করিল এই দান।
জবাব দিন।
হ্যাঁ। কত কষ্ট করছি। তোমার সঙ্গে ব্যবসা করব, সে তো ভালো কথা।
আজহার আরো গল্প ছাড়িল।
কয়েক প্রহর রাত্রি অতিবাহিত। দরিয়াবিবির ধমকে আজহার গল্প সমাপ্ত করিল।
ভাত পরিবেশনের সময় দরিয়াবিবি হাসিয়া বলিল, ওর সঙ্গে দেখা করছিলেন না, এখন যে আঠার মতো জড়িয়ে গিয়েছ?
.
২৫.
বৈশাখের এক ঝঞ্ঝা-উতোল রাত্রে আসেকজান মরিয়া গেল। কেহ খোঁজও রাখে নাই। আমজাদ অন্য ঘরে ঘুমাইত আজকাল। পরদিন অনেক বেলা হইয়া গেলে, আসেকজান উঠিল না। খোঁজ লইতে গেল দরিয়াবিবি। বৃদ্ধার ঠাণ্ডা মৃতদেহ পড়িয়া রহিয়াছে।
অনেকক্ষণ কান্নাকাটি করিল দরিয়াবিবি। আমজাদ, নঈমা, আজহার বোকার মতো চাহিয়া রহিল অনেকক্ষণ। বুড়ির আত্মীয়-স্বজন কেহই ছিল না। প্রতিবেশীদের সহায়তায় দাফন-কাফন শেষ করিল আজহার।
আসেকজানের একটি পেঁটরা খোলা হইল। দশ-বারোটি খুচরো টাকা ও কয়েকখানি কাপড় পাওয়া গেল। বিশেষ লাভ হয় নাই দরিয়াবিবির। কাফনেই দশ টাকা গিয়াছে।
এই অসহায় বৃদ্ধার কথা বারবার মনে পড়ে দরিয়াবিবির। তার জীবনের পরিসমাপ্তি কিরূপে ঘটিবে, সে কি জানে? হয়তো এমন অপমৃত্যু তারও কপালে লেখা আছে। কতদিন হইল শৈরমী মরিয়া গিয়াছে। কত দিন!
এক সপ্তাহে আসেকজানের নাম মিটিয়া গেল এই বাড়ি হইতে। চতুর্থ দিনে পাড়ার দুইজন ভিক্ষুককে খাওয়াইয়া দাওয়াইয়া দরিয়াবিবি চালাম সমাপ্ত করিল।
আমজাদ কিন্তু ভয়ে একা ঘুমাইতে পারিল না কয়েকদিন। মোনাদির নাই কাছে। নিজের ছোট কুঠরীতে শুইতে তার বড় ভয় লাগে।
দরিয়াবিবি ধমক দিয়া বলিল, ভয় কি, ব্যাটা। তোমার দাদি আম্মা তার ভেস্ত নসিব করেছে। ভয় কী?
আমজাদের তবু ভয় কাটিল না।
কয়েকদিন দরিয়াবিবি শরীফনকে লইয়া আমজাদের ঘরে আস্তানা পাতিল।
স্কুলে পণ্ডিতের মুখে আমজাদ ভূতের কাহিনী শুনিয়াছিল। মন হইতে তা সহজে মুছিয়া যায় না।
মাকে সে জিজ্ঞাসা করিল, মা, মরে গেলে ভূত হয় মানুষ?
যারা খারাপ লোক, তারা ভূত হয়।
আসেক দাদি কি হয়েছে?
ছিঃ ভয় কি, আমু। সে ভালো মানুষ। আল্লা তার ভেস্ত নসিব করেছে।
ভালো মানুষ আবার পরের বাড়ি খায়!
গরিব ছিল যে। গরিব।
দরিয়াবিবি ঈষৎ বিচলিত হয় মনে মনে। জবাব যেন ছেলের মন মতো হয় নাই।
আমার ভয় করে। দাদি রাত্রে পাশে ঘুমায়।
থুথু-কুঁড়ি ছড়াইল দরিয়াবিবি পুত্রের গায়ে।
তার পাশে শুয়ে এত বড় হলে কিনা, তাই মনে হয়।
আমার ভয় করে কেন, মা?
বেটাছেলে। তোর বুকের পাটা নেই।
ইস।
আমজাদ তবু রাত্রে দরিয়াবিবির কোল ঘেঁষিয়া ঘুমাইত। বাহিরে কাঁঠাল গাছের বনে বনে দমকা বাতাস লাগিলে সে মাকে জড়াইয়া ধরিত। গোরস্তান হইতে আসেকজান দাদি লাঠি হাতে কারো চল্লিশা খাইতে যাইতেছে।
ব্যাপারটা আজহারের কানে গেলে সে একদিন আমজাদকে মখতবের মৌলবী সাহেবের কাছে লইয়া গেল। তিনি ফুক দিয়া দিলেন। সঙ্গে এক গ্লাস পানি-পড়া। গোটা একটি টাকা বাহির হইয়া গেল দুই ফুকের ঠেলায়।
মৌলবী সাহেব জুম্মাবারে আর একবার আমজাদকে আসিতে বলিল, আজহার তা শুনিল মাত্র। আবার এক টাকার বন্দোবস্ত আর কি। আজহার মনে মনে যোগ করিল।
আমজাদের ভয় সহজে কাটিল না। আজকাল সন্ধ্যায় একা একা সে দাওয়ায় বসিয়া থাকিতে পারে না। কিন্তু মার কাছে সে সব চাপিয়া গেল। বাগাড়ম্বরে তার বুকের পাটা কয়েক মাইল চওড়া।
আমজাদের ভয় গেল অন্য এক ঘটনার ধাক্কায়।
আজহারের হাতে ইয়াকুবের দেওয়া টাকা ছাড়া আরো কিছু টাকা জমিয়াছে। আসেকজানের একটি ছোট বাক্স তার কাছে গচ্ছিত ছিল। দরিয়াবিবি তাহা জানিত। ভিতরে আরো গোটা কুড়ি টাকা ছিল। এই ব্যাপার ঘুণাক্ষরে দরিয়াবিবি কানে ইমামের কথা ঠিক নয়।
