আজকাল নাচে বেশ পয়সা আসছে।
তা আসছে। রাজেন্দ্র ছোঁড়াটা বেশ কাজের। এখন বলে যাত্রার দল করব।
আরো সাংসারিক কথা হইতেছিল। উঠানে হঠাৎ আগন্তুকের ছায়া পড়িল। এলোকেশী লোকটিকে কখনো এখানে দেখে নাই। সে তাড়াতাড়ি ঘোমটা টানিল।
দরিয়াবিবি উঠানের দিকে চাহিয়া হাসিয়া উঠিল।
এসো ভাই। দরিয়াবিবির ঠোঁটে কৌতুক-মাখা হাসি। আগন্তুক ইয়াকুব। দরিয়াবিবি এলোকেশীর কানে কানে বলিল, আমার দেওর।
ইয়াকুব দাওয়ায় একটি মাদুরের উপর বসিয়া পড়িল। হাতে একটি পুঁটলি ছিল। সে খবরদারীর ভার দরিয়াবিবির উপর।
সব ভালো? দরিয়াবিবি জিজ্ঞাসা করিল। এলোকেশী লজ্জায় কলাবৌ সাজিয়া বসিয়া ছিল। ধমকের সুরে দরিয়াবিবি বলিল, ঘোমটা খোল না বৌ। ও আমাদের দেওর।
এলোকেশী ঘোমটা খুলিয়া ইয়াকুবকে ভালোরূপে দেখিয়া লইল।
শরীর ভালো নয়, ভাবী! আজ চার দিন জ্বর। তোমার এখানে এসে পড়লাম।
বাড়ি থেকে দুদিন-তাহলে জ্বর গায়েই বেরিয়েছ?
হ্যাঁ।
এলোকেশী বিদায় হইল।
দরিয়াবিবি জিজ্ঞাসাবাদে কসুর করে না। জ্বর গায়ে বেরিয়েছে?
হ্যাঁ।
এ কি? আর কেউ ছিল না ব্যবসার জন্য। এতক্ষণ ইয়াকুব কোনো অস্থিরতা দেখায় নাই। হঠাৎ সে চাপিয়া বলিল, ভাবী, একটু ঘুমোবার জায়গা করে দাও।
দিচ্ছি। কিন্তু আমার বোনেরা কেমন-ধারা মেয়ে! তোমার জ্বর, অথচ গঞ্জে আসতে দিল।
চুপ করিয়া রহিল ইয়াকুব। রৌদ্রের উত্তাপ তার শরীরে মনোরম লাগিতেছিল। সে বাহিরে মাথা বাড়াইয়া দিল। ছেলেদের পড়ার ঘরে দরিয়াবিবি শয্যা রচনা করিয়া ফিরিয়া আসিল। তার মুখের কামাই নাই : ভারি খারাপ কথা। তোমার জ্বর। অথচ ছেড়ে দিল। কেউ খোঁজ নেয়নি বোধহয়।
নিস্তব্ধতা যেন ইয়াকুবের জবাব। তবু সে মুখ বিকৃত করিয়া বলিল, না। খোঁজ নিয়েছিল বৈকি। আমার মাথাটায় হাত দিয়ে দ্যাখো।
দরিয়াবিবি কপালের উষ্ণতা পরীক্ষা করিল। ভারি গরম। তোমার মুখ দেখে অসুখ হয়েছে বলে মনে হয় না। উঠে গিয়ে শুয়ে পড়।
দরিয়াবিবি আবার বলিল, বাড়ির লোকগুলো কী! এত জ্বর, ছেড়ে দিল?
ইয়াকুব জবাব দিল, আমি গঞ্জ থেকে আসছি।
আসলে ইয়াকুবের মতো মিথ্যাবাদী সংসারে অল্প। দাম্পত্য-জীবনে তার সুখ নাই। প্রায়ই দুই স্ত্রী কোন্দল বাধাইয়া থাকে। তা ছাড়া তার মতো পেশাদার লম্পটের কীর্তিকাহিনী স্ত্রীদের কানেও প্রবেশ করে বৈকি।
স্ত্রীর সহিত ঝগড়া করিয়া সে ঘর ছাড়িয়া আসিয়াছিল। দরিয়াবিবি ইহার বিন্দু বিসর্গ জানে না। গ্রামের সঙ্গতিপন্ন মানুষদের মধ্যে ইয়াকুবের প্রতিপত্তি খুব বেশি। কারণ সে তাদের সমগোত্র। ধান-আলু-পেঁয়াজের কারবারে ইয়াকুব কত উপার্জন করে, তা দরিয়াবিবির অবগতির বাহিরে।
গত কয়েক মাস ইয়াকুব যাতায়াত করিতেছে। তার ভোলা মন স্বতঃই সমীহ আকর্ষণ করে। কোনো ত্রুটি রহিল না দরিয়াবিবির সেবায়। মাথায় উত্তাপ উঠিয়াছিল। ঠাণ্ডা পানি দিয়া তাহা সে ধুইয়া দিল। মোটা কাঁথা বিছাইয়া দিল তক্তপোশে। অবশ্য তা ইয়াকুবের টাকায় কেনা। গায়ে একটি তাঁতের চাদর দিল দরিয়াবিবি।
আসেকজান নিজে ঘর হইতে বাহির হয় না। সে আমজাদের নিকট খবর সংগ্রহ করিত। একটি পুরাতন শাল ছিল তার সিন্দুকে। কোনো মৃত ব্যক্তির সম্পত্তি, আত্মীয়রা দান করিয়াছিল। দরিয়াবিবি চাঁদরের জায়গায় শালের আবরণ চড়াইল। বড় নির্ঝঞ্ঝাট গৃহসুখ অনুভব করিতেছিল ইয়াকুব, আমজাদ নিজে মাথা টিপিয়া দিতে লাগিল। নঈমা পিঁচুটি ভরা চোখ লইয়া কৌতূহলে সবকিছু দেখিতেছিল।
আজও ইয়াকুব কুটুম্বপনার কোনো খুঁত রাখে নাই। ছেলেদের জন্য মিষ্টান্ন ও অন্যান্য খাবার আনিয়াছিল। পুঁটলি নয়, ছেলেদের রত্ন-ভাণ্ডার। ছোট খুকির কথা পর্যন্ত ইয়াকুব ভোলে নাই। তার জন্য পাতলা জামা আনিয়াছিল।
দরিয়াবিবি পথ্য তৈয়ার করিয়া আনিল। ইয়াকুব নিস্তেজ চোখে চারিদিকে দৃষ্টিপাত করে। বড় আরাম তার।
দরিয়াবিবি বলিল, ডাক্তার ডাকাই, ভাই।
ঘোর আপত্তি জানাইল ইয়াকুব। না, এমনি সেরে যাবে। ওষুধ গেলা আমার ভালো লাগে না।
একটি নোট বাহির করিল সে, কথা ও সাগু শেষ করিয়া।
দরিয়াবিবি কোনো আপত্তি জানাইল না। কারণ এই ক্ষেত্রে অনিচ্ছা বৃথা। ইয়াকুবের হাত হইতে নিস্তার নাই। হাজার কথা বলিতে শুরু করিবে।
দুপুরে ইয়াকুব জ্বরের ঘরে উ-উ শব্দ করিতেছিল। ঘরে আর কেউ ছিল না। হঠাৎ খুট শব্দে সে জাগিয়া উঠিল। দরিয়াবিবি তার সম্মুখে।
খাঁ-পত্নী জিজ্ঞাসা করিল, শরীর ভালো?
না, ভাবী।
তারপর ইয়াকুব কাতরোক্তি আরো বাড়াইয়া কহিল, মাথা ভেঙে পড়েছে। একটু টিপে দিলে ভালো লাগে।
দরিয়াবিবি কয়েকবার আমজাদকে ডাকিল, কোনো জবাব নাই। ইয়াকুব ইঙ্গিত করিল বিছানার উপর বসিতে।
আচ্ছা, আমি টিপে দিচ্ছি। ছেলেগুলো বজ্জাত। বলিয়া দরিয়াবিবি ইয়াকুবের মাথা টিপিয়া দিতে লাগিল।
ইয়াকুব নিরুত্তর। সে নীরবে একবার চক্ষুর পাতা খুলিতেছিল, পর মুহূর্তে বন্ধ করিতেছিল।
ভাবী, তোমার কাছে বেশি ঋণ কচ্ছি।
ধার। আমি বরং–
ইয়াকুব হঠাৎ হাত তুলিয়া তার মুখে চাপা দিতে গেল। দরিয়াবিবি মুখ তার নাগালের বাহিরে রাখিয়া বলিল, ঋণ আমরাই করছি।
ইয়াকুব আবার একটি নোট বাহির করিল। তবে আর একটু ঋণ বাড়াও ভাবী। না হলে আমি মরে যাব। আমার শেষ জ্বর।
