ও কাকা।
কাকা কোনো জবাব দিল না।
আজহার কোদাল চালাইয়া জমি পরিপাটি করিতেছিল। সে মুখ তুলিয়া আবার চক্ষু অবনত করিল।
আমজাদ হাসিমুখে অগ্রসর হইতে গেল। আজহার ধমক দিল, কাজ কর, আমু।
চন্দ্র কোটাল দাঁড়াইয়া রহিয়াছে। তার দৃষ্টি অন্যদিকে। আজহার নীরব, নত মুখে কাজ করিতে লাগিল। দুজনে যেন কোনো পরিচয় নাই। আমজাদ মুখ চাওয়া চাওয়ি করিতেছিল। গায়ে হিন্দু-মুসলমান দাঙ্গা বাধিবার উপক্রম হইয়াছে। তারই কী ফল এই।
চন্দ্র কোটাল জমির পাশ দিয়া ধীরে ধীরে অগ্রসর হইতে লাগিল, ক্রমশ অদৃশ্য হইয়া গেল গাছপালার আড়ালে, সন্ধ্যার বেশি দেরি নাই।
আমজাদ জিজ্ঞাসা করিল, চন্দর কাকা কথা বলল না যে?
না।
পিতার জবাবের ধাচ দেখিয়া আমজাদ আর অন্য প্রশ্ন করিল না।
শিসের আওয়াজ ভাসিয়া আসিতেছিল। নিশ্চয় চন্দ্র কাকা। আমজাদ স্বয়ং বিষণ্ণ, মাঠের দিকে বারবার দৃষ্টিপাত করিতে লাগিল।
.
২৩.
চন্দ্রমণির সঙ্গে আজহারের পথে হঠাৎ দেখা হইয়াছিল। মাঝে মাঝে চন্দ্রমণি গ্রামের ভিতরে আসে। চন্দ্রই কেবল গ্রাম-ছাড়া, তার অন্যান্য আত্মীয়েরা এখনো পূর্ব পুরুষের ভিটায় বাস করিতেছে।
আজহার অন্যমনস্ক পথ হাঁটিতেছিল। ও দাদা শব্দে সে চমকিত হইয়া প্রশ্নকর্তীর মুখের দিকে তাকাইল। না, চন্দ্রমণিকে সহজে চেনা যায় না। তার খোলস-পরিবর্তন ঘটিয়াছে। বেশ পরিষ্কার কাপড় পরনে, পানের কষে ঠোঁট দুটি রাঙা। বিধবা বলিয়া চন্দ্রমণির যেন কোনো পরিচয় নাই। আজহার চন্দ্রমণিকে কোনো যুবতী পরস্ত্রী মনে। করিয়া হঠাৎ অপ্রস্তুত বোধ করিতেছিল।
ও দাদা, আমি চন্দ্রমণি।
আজহার সেদিন বৈকালে চন্দ্রমণির এই রূপ দেখে নাই। অবাক হইয়া গেল সে। চন্দ্র কোটালের আয়-উপার্জন নিশ্চয় বাড়িয়াছে। রাজেন্দ্রের সঙ্গে ভাঁজ-নাচের দল গড়িয়া সে ভালোই করিয়াছে।
ও মণি, তুই! আমি তো ভাবছিলাম আর কেউ।
চন্দ্রমণি কিশোরীর মতো হাসিতে লাগিল। বছর আগে ম্যালেরিয়া জ্বরে কি ছিরি না হইয়াছিল তার।
তুমি আর যাও না যে দাদা!
আজহার লজ্জায় মুখ নিচু করিল।
কি রে যাই! চন্দর একদম কথা পর্যন্ত বলে না।
ও নিয়ে বৌদির সঙ্গে রোজ ঝগড়া বাধে।
চন্দ্রমণি এলোকেশীর প্রসঙ্গ উত্থাপন করিল।
চন্দ্রকে সেদিন দেখলাম। ওর শরীরটা খারাপ।
রাখালেরা একপাল গরু তাড়াইয়া আসিতেছিল। চন্দ্রমণি ও আজহার পথের এক পাশ হইয়া কথাবার্তা আরম্ভ করিল।
শরীর খারাপ হবে না। কত তাড়ি গেলে। আর আজকাল দাদা কি যেন হয়ে গেছে।
কি হয়েছে?
সে মন-মেজাজ আর নেই। আমাকে দেখতে পারে না। কথায় কথায় গালিগালাজ।
খামাখা?
হ্যাঁ, দাদা।
আজহার চন্দ্র কোটালের এই অধঃপতনে কোনো দুঃখ প্রকাশ করিল না। গুম হইয়া দাঁড়াইয়া রহিল। আরো একপাল গরু আসিতেছে। আজহার সেইদিকে চক্ষু ফিরাইয়া বলিল, চন্দ্র আসলে ভালোমানুষ। ও কেন এমন হয়ে গেল।
কি জানি।
রাজেন্দ্রের পাল্লায় পড়েছে?
চন্দ্রমণি হঠাৎ কোনো জবাব দিল না, চুপ করিয়া গেল।
আজহার প্রসঙ্গ-স্রোত বন্ধ করিল না : রাজেন্দ্র ছোঁড়াটা তেমন ভালো নয়। ওর সঙ্গে বশি তাড়ি গেলে বোধহয়।
না দাদা!
চন্দ্রমণি অসোয়াস্তি বোধ করিতেছিল, কণ্ঠস্বরে তার প্রমাণ।
গাঁয়ের বড় লোকদের ঝগড়া থেকে দাদার মেজাজ আরো বিগড়ে গেছে।
সত্যি, মণি। আমিও রাগে সেদিন চন্দ্রের সঙ্গে কথা বললাম না। ও মাঠে এসেছিল। আমারও মেজাজের ঠিক নেই।
চন্দ্রমণি আবার হাসিতে লাগিল। আমার দুই দাদাই পাগল।
আজহারকে রসিকতা স্পর্শও করিল না।
পুরাতন খেই টানিতে ব্যস্ত সে : আজকার রোজগার কেমন করছে।
তা, মা লক্ষ্মীর কৃপায় বেশ। নাচের দলে দুপয়সা হয়।
আজহার হঠাৎ হিংসুকের মতো বেদনা অনুভব করে। বেশ আছে চন্দ্র কোটাল।
আমি যাই দাদা, আর একদিন আসবেন।
চন্দ্রমণি আর সেখানে দাঁড়াইল না।
.
২৪.
দুই জমিদারে মামলা বাধিয়াছে। গ্রামে আর কোনো গোলমাল নাই। সাময়িক উত্তেজনা নিভিয়া গিয়াছিল। চন্দ্র কোটাল আজহারকে এড়াইয়া চলে। দুই পরিবারে পূর্বের মতো সদ্ভাব নাই। এলোকেশী কোনোদিন ঝগড়া-কলহ পছন্দ করে না। কোটালের সঙ্গে তার মতবিরোধ প্রায় দেখা যায়। আজহার বহুদিন চন্দ্রের বাড়ির ভিটার পাশে গিয়াও তার সঙ্গে সাক্ষাৎ করা সাহসে কুলাইয়া উঠিতে পারে নাই। সাকের আবার রোহিণী চৌধুরীর সঙ্গে খাতির পাতাইয়াছে। কিষাণেরা রবি-ফসল লইয়া ব্যস্ত। জমিদারের কোন্দলে কারো কোনো উৎসাহ নাই।
এলোকেশী একদিন স্বেচ্ছায় দরিয়াবিবির সঙ্গে দেখা করিতে আসিল। আজহার বাড়ি ছিল না, আলু-বীজ ক্রয় করিতে ভিন-গাঁয়ে গিয়াছিল।
দরিয়াবিবি রৌদ্রে বসিয়া পান্তা খাইতেছিল তখন।
এলোকেশী হাসিয়া বলিল, ঠিক সময় এসেছি।
এসো দিদি।
শশব্যস্ত দরিয়াবিবি একটা পিঁড়া আগাইয়া দিল।
কিন্তু এলোকেশী আরো ব্যস্ততা দেখাইতেছিল।
তুমি খেয়ে নাও, আমি এখখনি উঠব।
এত তাড়া কেন? ও, আমার সঙ্গে ঝগড়া আছে নাকি?
এলোকেশী হাসিতে লাগিল।
কেন, বলো দিদি। সব জায়গায় খালি কোন্দল। গাঁয়ে, আমার ঘরে।
কোটালের সঙ্গে?
হ্যাঁ।
দরিয়াবিবি যথা দ্রুত আহার সম্পন্ন করিল। এলোকেশী তারপর দশটা টাকা বাহির করিয়া বলিল, দিদি, এই টাকা কটা রেখে দিও। জমা রাখলাম।
আমার কাছে কেন?
রেখে দাও।
পরে কানে কানে ফিসফিস করিয়া সে বলিল, রেখে গেলাম। ঘরে কী রাখার জো আছে?
