আজহার খাঁ বিলম্ব করিল না। খাওয়া দাওয়া শেষ করিয়া একদম মাঠের দিকে গেল। বাজে ঝঞ্ঝাটের চেয়ে মাঠের অবস্থা তার প্রথমে জানা দরকার। মাঠ, ফসল, তার কামধেনু। ওই বছর ফসল পাইয়াছিল বলিয়া সংসারেও শ্ৰী বজায় আছে। সকলে রবিফসলের চাষ দিতেছে। গরু-বাছুরের জুলুমের জন্যে কয়েকজন চাষি বাখারীর বেড়া প্রস্তুত করিতেছে। পটল দিবে সকলে এবার। তরমুজ গত বছর ভালো ফলে নাই। কুমড়া আর মূলোর চাষ চলিতেছে।
দেরি হইয়া গিয়াছে তার। তাহোক। নাবি ফসল হইবে। সেজন্য আজহার বেশি অনুতাপ করিল না।
চন্দ্র কোটালের সঙ্গে দেখা করা দরকার, চন্দর! মনে মনে হাসিয়া উঠিল আজহার। সন্ধ্যার পদক্ষেপে শূন্য মাঠের আইল বিচিত্র বর্ণে অদৃশ্য হইতেছে।
চন্দ্র দাওয়ায় বসিয়াছিল, আজহারকে দে অভিভাষণ জানাইল না, বসিতে পর্যন্ত বলিল না।
চন্দ্র।
সে নিরুত্তর।
এলোকেশী একটি পিড়া বাহির করিয়া আজহারকে বসিতে দিল। চন্দ্রমণি আসিল পিছু পিছু। আজহার ডাকিল, চন্দ্র!
কোনো জবাব দিতেছে না সে। এলোকেশীর দিকে ফিরিয়া আজহার বলিল, কি, আজ চন্দ্র নেশা করে বসে আছে?
এলোকেশী ভয়ানক রাগিয়া চিৎকার করিয়া উঠিল : ও কী, বসে আছে যেন সং। লোক এল, কথা বল। গায়ে হিন্দু-মুসলমান ঝগড়া তো ভাইয়ের সঙ্গে কী। যতসব অপসিষ্টি, হতচ্ছাড়া তোক।
এলোকেশী বলিতে লাগিল, জমিদারে জমিদারে ঝগড়া। বড়লোকে বড়লোকে দলাদলি তোদের কী? তোদের জমিদারি দিয়ে যাবে– ওই যে বসে আছে, রোহিণী বাবু জলাশয়টা ওকে দিয়ে যাবে। তাই নিয়ে দিন-রাত টইটই হিন্দুপাড়ায় ঘুরছে।
যার উদ্দেশে বাক্যবাণ বর্ষিত হইতেছিল, সে নির্জীব মূর্তির মতো বসিয়া রহিল। বোকা-চোখ মিটমিট করিয়া সে আজহারের দিকে চাহিয়া আবার চোখ ফিরাইয়া লইল।
কল্কে সাজিয়া আনিল চন্দ্রমণি। আজহার নীরবে টানিতে লাগিল। ধোঁয়া ছাড়ার অবকাশে সে আবার ডাকিল, চন্দ্রর।
আজহার স্তিমিত হইয়া আসিতেছে। বড় ক্ষুণকণ্ঠ তার : চন্দ্রর! আমি এতদিন দেশছাড়া। জানি চন্দর আছে। বড়লোকে বড়লোকে দলাদলি, আমরা গরিবেরা কেন ওর মধ্যে?
এলোকেশী আবার এক পশলা বর্ষণ করিয়া গেল। দাওয়ায় একটা মাদুরে আড় হইয়া চন্দ্র হুঁকা পান করিতে লাগিল। ভীষ্মের শরশয্যা আরম্ভ হইল। এলোকেশীর বাণ তা হইলে ব্যর্থ হয় নাই, কিন্তু ভীষ্মদেব শরে কাতর নন, কণ্ঠস্বরে কাতর হওয়ার কোনো লক্ষণ দেখা গেল না। একবার সে হাই তুলিল।
সন্ধ্যায় গ্রাম ছাইয়া গিয়াছে।
উঠানে নীরবতা। দূরে মাঠে বাছুর ডাকিতেছিল।
আজহার উঠিবার পূর্বে বলিল, যোগীনের মা, আবার কাল আসব, আজ ওর মেজাজ ঠিক নেই।
ভিটার উপর হইতে নামিয়া পড়িল আজহার অন্ধকার প্রলেপিত মাঠে; তার মনের মতোই শূন্য। সে বাতাসের পদ-সঞ্চালন-ধ্বনি শুনিতে লাগিল।
একবার উৎকর্ণ হইল আজহার। চন্দ্র কোটাল গাল পাড়িতেছে : না, আমার দুচোখ নেই আর মুসলমানদের দেখি– চোখ নেই।
এলোকেশী কণ্ঠস্বর তার সঙ্গে : তা থাকবে কেন? তাড়ি গিলে গিলে চোখের। মাথাও যে গিলেছে।
আবার ভর্ৎসনার শরজাল : চুপ, শালী।
এলোকেশীর জবাব : আমার বোনের সঙ্গে অত কেন। নিজের বোনকে দিয়ে এসো রোহিণীবাবুকে। এখনো তো বয়স রয়েছে- পীরিতি করবে।
আজহার হাঁটিতে লাগিল। এই একটিমাত্র আত্মভোলা মানুষকে চিনিয়াছিল, সে তার কত নিকট। এতটুকু দরদের জায়গা আর নাই তার পৃথিবীতে।
পেছনে ফিরিয়া আজহার অব্যক্ত বেদনায় কোটালের ভিটের দিকে আবার চাহিল। দুই চোখ তার জলে ভরিয়া উঠিল। দরিয়াবিবি কি মরিয়া গিয়াছে?
পরদিন বিকালে আজহার রবি-ফসলের জন্য জমি তৈয়ারি করিতেছিল। বহুদিন মূলা চাষ করে নাই সে। এইবার মূলা ও তরমুজ দেওয়া হইবে এইখানে। জমির কিনারায় শকরগঞ্জ আলু। আমজাদও সঙ্গে আসিয়াছিল। আজকাল আজহারকে সে খুব এড়াইয়া চলে। কিন্তু পিতার নিস্তব্ধ গাম্ভীর্যের সম্মুখে সে ভয়ানক ভীরু। মাঠে কাজ করা তার ভালো লাগে না। স্কুলের পড়য়া, সে কেন সাধারণ চাষির মতো এই বয়সে জমির খবরদারী করিবে?
পিতার আদেশ নীরবে পালন করে। কয়েকটি বাঁশ কাটিয়া আনিয়াছিল আজহার। আমজাদ তার বাখারী তুলিতেছিল। গরু-বাছুরের যা জুলুম, বেড়া না দিলে ফসল আদায় হইবে না।
আরেক কৃষক দূরে কর্মব্যস্ত। এক মাসে এইখানে সমীর চঞ্চল ধান-বন রঙ রেখায় মাঠগুলি সাজাইয়া রাখিয়াছিল। এখন শূন্য ক্ষেত! খামারে গাদা উঠিয়াছে। অবেলার শূন্যতার মধ্যেও তেমনি কুটির ছোঁয়া নাই। গ্রীষ্মকালে সমস্ত প্রান্তর যেন গ্রাস করিতে আসে।
আজহার সমগ্র মাঠের দিকে তাকায় না। আমজাদ নীরবে কাজ করিতেছিল।
শিস-ধ্বনি শুনিয়া সে চমকিয়া উঠিল। নিশ্চয় চন্দ্র কাকা আসছে, কয়েক বিঘা দূরেই তার জমি। খালের ঢালু পাড় হইতে চন্দ্র কোটালের অবয়ব ক্রমশ দৃশ্যমান হইতে লাগিল।
আমজাদের কাজে মন নাই। এখনি চন্দ্র কাকা আসিয়া পড়িবে। তখন হয়ত তাকে কোনো কাজই করিতে হইবে না। তার মৃদু হাস্যে কপোল রাঙিয়া উঠিতেছিল।
চন্দ্র কোটাল সোজা এই জমির দিকে আসিল না। একটি কলাগাছের আড়ালে কিছুক্ষণ দাঁড়াইয়া আত্মপ্রকাশ করিল। কিন্তু স্বতঃস্ফুর্ত শিস বহু আগে নিভিয়া গিয়াছে।
আমজাদই প্রথম সম্ভাষণ জানাইল, ও চন্দর কাকা। চোখাচোখি দুইজন। হাস্য। সংবরণ করিয়া অন্যদিকে মুখ ফিরাইল কোটাল।
