নিরুত্তর হাসুবৌ।
আচ্ছা, চাচি, প্রজাপতির রঙে জামা রঙ করা যায়?
হ্যাঁ। আমি তোমার জামা রঙ করে দেব। তুমি একবার মুনির খবর এনে দাও। দেখ না, তোমার মা কত কাঁদে।
মার নামে আমজাদের করুণা হয়। দৃঢ়কণ্ঠে সে জবাব দিল, নিশ্চয় যাব। চার আনা গরুর গাড়ির ভাড়া। আমি চার আনার মুড়ি কিনব।
বেশ।
হাসুবৌ হাত বাড়াইল আমজাদের দিকে। সে তখন এক দৌড়ে অদৃশ্য হইয়া গিয়াছে।
.
২২.
দরিয়াবিবি ছোট মেয়েটির নাম রাখিয়াছিল শরীফন। ডাকনাম শরী। শৈরমীর স্মৃতি একবার তার মনে জাগিয়াছিল বৈকি। সেই দীন-জীবনের করুণ অবসান-মুহূর্ত! ডাক নামে শৈরমীর স্মৃতি বাঁচিয়া থাক। দেশের বিশাল মানচিত্রের এক কোণে নামহীন গ্রাম্য জননীর দীন প্রচেষ্টা-জাতি-ধর্ম যেখানে মানবতার উপর নৈরাজ্যের কোনো ফণা মেলিতে পারে না।
কিন্তু গ্রামে হিন্দু-মুসলমানে দাঙ্গা বাধিবার উপক্রম হইয়াছিল।
রোহিণী চৌধুরী ও হাতেম খাঁর মধ্যে গত কয়েক বছর একটি বিঘা-পঞ্চাশের জলাশয় লইয়া মন-কষাকষি চলিতেছিল। এতদিন জলাশয় চৌধুরীদের দখলে ছিল। দলিলে হাতেম খাঁর প্রাপ্য হইলেও সে ইহার কাছে ঘেঁষিতে পারে নাই। জলাশয় জমা। লইয়াছিল কয়েকজন মুসলমান জেলে। ইহাদের ভদ্রবংশীয় মুসলমানেরা আতরাফ বলে। বিলের আয় মন্দ নয়। হাতেম খাঁ কয়েকজন আফকে হাত করিয়া খাজনা বন্ধ করিয়া দেওয়ার প্ররোচনা দিল। তাহারা সেইমত খাজনা বন্ধ করিয়াছে। রোহিণী চৌধুরী। এই শলাপরামর্শ ভালোরূপে আঁচ করিয়াছিল। তিলি-বাগদী-ডোম শ্রেণীর কৃষক হিন্দু হাত করিয়া গ্রামে তিনি দাঙ্গার প্ররোচনা দিতে লাগিলেন।
হাতেম বকশ ইদানীং ঘোরতর মুসলমান সাজিয়াছেন। তাঁর পুত্রেরা অন্দরমহলেই শরাব পান করেন। তিনি কোনো কথা বলেন না। নিজেও নামাজ-রোজার ধার ধারেন না। বর্তমানে জুম্মার নামাজের সময় হাতেম বখ্শকে মসজিদে দেখা যায়। তার কালোশাদা দাড়ি শ্বেত-খোজাফে আরো শুভ্র রঙ ধারণ করিয়াছে। শাদা পিরহান হাঁটু পর্যন্ত ঝুলাইয়া একটি আসা (ছড়ি) হাতে গ্রামের অন্ধকারে দারোয়ান সঙ্গে ঘুরিয়া বেড়ান। বৈঠক, শলা-পরামর্শ আর যুক্তির বহর। নামাজের সময় না হইলেও তিনি এত্তেলা দেন। নামাজ কাজা করা শক্ত গোনাহ। হাদিস-কোরানের সম্প্রতি এজেন্সী লইয়াছেন তিনি। গ্রামের মখতবগুলির জীর্ণ-দশা। এক পয়সা তিনি খরচ করেন নাই। বর্তমানে তিনি একটি তামদারী করিয়া গ্রামের মুসলমানদের পোলাও-কোর্মা খাওয়াইলেন। কাফের হিন্দু জমিদার মুসলমানদের সর্বস্বান্ত করিয়া ছাড়িবে, এই কথা পাকে প্রকারে প্রচারণার খোলসে বিতরণ করিতে লাগিলেন।
নিস্তেজ মহেশডাঙার জীবনে তবু চাঞ্চল্য ফিরিয়া আসিয়াছে। হিন্দুপাড়ায় রোহিণী চৌধুরীর কার্পণ্য নাই। প্রচারণা শক্তি তাঁরও কম নয়।
সাকেরকে হাতেম বখশ এতদিন আমল দিত না। তার লাঠির জোর দশ গা জানে। হাতেম বখশ দাওয়াত খাওয়াইয়া, টাকা-পয়সার ঘুষে তাহাকে ক্রয় করিয়া ফেলিল। সেও হালফিল ভয়ানক মুসলমান হইয়া উঠিয়াছে। ইমামের পেছনে ইমামের যা নিয়ত আমারও তাই বলিয়া ঈদ ও বকর ঈদে সে বছরে দুইবার মাত্র নামাজ পড়িত, সেও নামাজ শিখিতেছে। বাংলা নামাজ শিক্ষা গঞ্জ হইতে কিনিয়া আনিয়াছে ঠিকমতো আরবি উচ্চারণ হয় না, তা লইয়া হাসাহাসি করিতে গিয়া হাসুবৌ ভয়ানক তাড়া খাইল। নূতন কাক নাকি বিষ্ঠা খাওয়ার যম, এমন মন্তব্য করিয়াছিল নিরীহ বৌটি। সুপারী খাওয়া ছাড়ো, তোমার জিভ সরল হোক।
চন্দ্র কোটাল পালের গোদা সাজিয়াছে। শেখপাড়ার একজন মুসলমানের সঙ্গে জমির আল লইয়া গত বৎসর তার বচসা হইয়াছিল। রোহিণী চৌধুরীর মোসাহেবরা সেই উপলক্ষ যথারীতি কাজে লাগাইল। পাড়ায় পাড়ায় চন্দ্র কোটাল বলিয়া বেড়াইতেছে, মুসলমানেরা যদি টু-শব্দ করে, উড়িয়ে দাও তুড়ি দিয়ে।
জলাশয়ের পাশে একদিন দুই প্রজাদলে ছোটখাটো সংঘর্ষ বাধিয়া গেল। কয়েকজন জখম হইয়াছিল। আদালতে মামলা দায়ের হইল। আহতদের পয়সা নাই। চৌধুরী ও হাতেম বখশের যখন পয়সা আছে, তখন কিছুর অভাব হইবে না।
গ্রাম থমথম করিতেছে।
এমনই আসন্ন অপরাহ্নে আজহার খাঁ ফিরিয়া আসিল। কাঁধে ঝোলানো থলে, তার ভিতর মনিহারী দ্রব্য। লাটিম, আলতার ডিবা, ছোট মেয়েদের হাতের চুড়ি ইত্যাদি।
নঈমা ও আমজাদ উৎফুল্ল হইয়া উঠিল। প্রত্যেকে উপহার পাইয়াছে। আমজাদের জন্য খাতা-পেন্সিল, লাল রবার। লাটু-লেত্তি জোর করিয়া সে আদায় করিল। নঈমার সওগাত কানফুল, কয়েকটি রেশমী চুড়ি।
দরিয়াবিবির স্তব্ধতা ভাঙিয়াছে। স্বামী-স্ত্রীর মাঝখানের সেতু তেমনই যোগ-ছিন্ন। তিরিশটা টাকা আনিয়াছিল আজহার খাঁ। চার মাস সে বেকার বসিয়া থাকে নাই। তবে দোকান সে করিয়াছিল গত একমাস। দোকানদারী পোষাইল না।
দরিয়াবিবির হাতেও টাকা ছিল। ইয়াকুব দেদার খরচ করিয়া যায় এইখানে। গঞ্জের দিনে সে প্রায়ই আসে। আজহার ফিরিয়া না আসিলে, তার কোনো হাত-টান হইত না। আমজাদের স্কুলের বেতন পর্যন্ত ইয়াকুব মাস-মাস দিবে বলিয়া শুধু মৌখিক প্রতিশ্রুতি দেয় নাই, তিন মাসের টাকা অগ্রিম দিয়া গিয়াছে।
গ্রামের কথা শুনিয়া আজহার থ হইয়া গেল। আমজাদ সংক্ষিপ্ত ইতিহাস বর্ণনা করিতে লাগিল পিতার নিকট। সাকের চাচা নাকি বলিয়াছে, রোজগারের মরশুম এসেছে। সে দুই জমিদারের নিকট টাকা লুটিতেছে। রোহিণী চৌধুরীকে সে আশ্বাস দিয়াছে, দাঙ্গার দিন লাঠি ধরব না, কসম করছি– ব্যাস দেখব হাতেম বখশ কত লেঠেল আনে। হাতেম বখশকে সাকের প্রতিশ্রুতি দিয়াছিল, পাঠানের বাচ্চা শেষ লাঠিখেলা দেখিয়ে যাব।
