ইয়াকুব আবার খুকিকে দোলাইতে দোলাইতে রান্নাঘরে প্রবেশ করিল।
হাসিয়া সে বলিল, তা হবে না, মা কেমন?
লজ্জায় রাঙা হইয়া ওঠে দরিয়াবিবির মুখ। গোস্তের হাঁড়িতে মশলা দিতেছিল সে। ধনে-ভাজা নাই। একটি তাওয়া চড়াইয়া দিল দরিয়াবিবি। ইয়াকুবের উপস্থিতি একটু অসোয়াস্তিকর।
দরিয়াবিবি ডাকিল, ইয়াকুব ভাই।
জি।
বাইরে যাও না। তুমি কী রান্না শিখবে?
কে শেখায়, ভাবি।
থাক, আর শিখে কাজ নেই। দুই বাঁদির ঘর– তার রান্না শিখতে হয় না।
হয় বৈকি।
তুমি খুকিকে বাতাসে নিয়ে যাও। যা ধোঁয়া এখানে।
দরিয়াবিবি নিজমনে রান্না করিতে লাগিল।
ইয়াকুবের কথা শেষ হয় না। সে আবার আসিল খুকিকে কোলে করিয়া।
ভাবী, আজহার ভাই পনেরো দিন গেছে, খবর দেয়নি?
না।
তুমি বলে তার সংসার কর। এমন লোক খবর দেবে না তা বলে।
আমরা তো তার কেউ নই।
দরিয়াবিবি চুলায় ফুঁক দিতেছিল বাঁশের চোঙ্গার সাহায্যে। ধোঁয়ায় ভরিয়া উঠিতেছিল সারা রান্নাশালা।
আহা। এমন সুন্দর খুকি, তার মায়া তাকে বেঁধে রাখতে পারে না।
বড় বিরক্তি বোধ করিতেছিল দরিয়াবিবি।
টাকার মায়া সবচেয়ে বড়। আবার কোথাও কিছু ফেঁদে বসেছে, লাখ টাকা কামাবে। সেবার চন্দ্র কোটাল ওর খোঁজ পেয়ে তবে ফিরিয়ে আনে।
দেখা যাক, আমিও চেষ্টা করব।
অত দয়ার কাজ নেই। নেই আসুক সে।
ইয়াকুব দরিয়াবিবির চোখের দিকে চাহিল, জলে ভরিয়া উঠিয়াছে। হয়তো ধোঁয়ায়, হয়তো সাংসারিক তাড়নার আঘাতে। ইয়াকুব তা উপলব্ধির চেষ্টা করিল।
দরিয়াবিবি কোনো সহানুভূতি চায় না। ইয়াকুব উঠিয়া গেলে সে সন্তুষ্ট হয়। আড়চোখে তার দিকে দরিয়াবিবি ধূমায়িত চুলায় আরো ধোঁয়া করিতে লাগিল, তারপর বলিল : ওঠে যাও না, ভাই। খুকিদের বড় চোখের দোষ হয় ধোঁয়া লেগে।
ইয়াকুব অনিচ্ছাসত্ত্বে ওঠিয়া গেল।
গেরস্থালির কাজ, মেহমানের জন্য বিশেষ রান্না। বহু দেরি হইয়া গেল। দুটি মাত্র ঘর। ইয়াকুবের শোয়ার জায়গা আর এক সমস্যা। আজ আমজাদকে দাওয়ায় শুইতে হইল।
গঞ্জের কাজ সারিয়া আরো তিনদিন ইয়াকুব এইখানে রহিয়া গেল। আজহারের তল্লাশি করিতেছে সে। কৃতজ্ঞতায় গলিয়া দরিয়াবিবি, খাতিরদারির ত্রুটি না হয়, সেদিক বিশেষ লক্ষ্য রাখিয়াছিল। দুহাতে খরচ করিতেছিল ইয়াকুব। সন্দেশের স্বাদ এই বাড়ির ছেলেরা মৌলুদ শরিফ বা পাড়ার কোনো বিশেষ উপলক্ষে চাখিতে পায়। ইয়াকুব নানা রকমের মিষ্টি কিনিয়া আনিয়াছিল। ময়দা, ঘি, পরটা, আরো চৰ্য– চুষ্যের ব্যবস্থা সে রীতিমতো করিতেছিল।
বাড়িতে ধুম লাগিয়াছে উৎসবের। আসেকজানকে পর্যন্ত ইয়াকুব বাহির হইতে দেয় নাই। সেও অতিথি এই বাড়ির।
দরিয়াবিবি চক্ষুলজ্জার জন্য কোনো কথা ইয়াকুবকে বলে নাই। নচেৎ সে-ও এই মহসিনীপনা খুব ভালো চোখে দেখিতেছিল না।
আরো দুইদিন থাকিয়া বিদায় লইল ইয়াকুব। আমজাদ অনেকদূর তার সঙ্গে আসিল।
২১-২৫. হাসুবৌ
হাসুবৌ আমজাদকে দুপুরবেলা ডাকিয়া গেল। বাড়ি যায় নাই সে। পাড়ার এক টেরে গাছের ছায়ায় একটি গুঁড়ির উপর দুই জনে বসিল।
কেন ডেকে আনলে, আমজাদ জিজ্ঞাসা করিল।
লক্ষ্মী ছেলে, বস না– সন্দেশ কিনে দেব।
না, জলদি বল।
হাসুবৌ ইতস্তত করিতেছিল।
মুনি, আর আসবে না?
আমি কি জানি। মা কত কাঁদে। আব্বার সঙ্গে কথা বলে না।
হাসুবৌ বলিল, তোর আব্বা চলে গেল। মুনি ছেলেটা ভারি বদ। আমজাদ সায় দিল না। বয়সের সঙ্গে সঙ্গে মুখচোরা ভাব কাটিয়া যাইতেছে।
বদ! তুমি ভারি ভালো?
হাসুবৌ আমজাদকে আদর করিতে লাগিল। না, সে বেশ ভালো। আমজাদ একটু দূরে সরিয়া গিয়া ব্যঙ্গ করিল, আমাকে আদর করতে হবে না। মুনিভাই নেই, তাই।
হাসুবৌ অবাক হইয়া যায়। এইটুকে ছেলে, তারও মনে ঈর্ষার ছোঁয়াচ লাগিয়াছে।
হাসুবৌ তার নিকটে সরিয়া আসিল। আবার তার চুলের উপর হাত বুলাইয়া আদর করিতে লাগিল। না, তুমি বেশ ভালো ছেলে।
আমজাদ জবাব দিল, না।
হাসুবৌ পুনরায় বলিল, যদি তুমি একটা কাজ কর, তোমাকে বেশি আদর করব।
কি, শুনি।
একবার মুনিরকে খবর দিতে পার?
আমি কি করে দেব?
হাসুবৌ আনমনা, গাছপালার ফাঁক অতিক্রান্ত দূরের আকাশের দিকে চাহিয়াছিল।
খোঁয়াব কাটাইয়া সে আবার বলিল, তুমি তাদের গাঁয়ে যাও না।
আমজাদ অক্ষমতা জানাইল।
খুব বেশি দূর নয়। আমি গরুর গাড়ির পয়সা দেব।
মা যে বকবে।
না, স্কুলে যাওয়ার নাম করে চলে যাবে।
হাসুবৌ আঁচলের গিট খুলিয়া একটি আধুলি বাহির করিল।
এই নাও, তোমার কাছে রেখে দাও, কতক্ষণ আর লাগবে।
মা যদি শোনে! শঙ্কিত দৃষ্টি আমজাদের চোখে।
না, কেউ বলবে না।
মহেশডাঙায় গাছপালা এত ঘন। এই জায়গাটি আরো নীরব। বাতাসের মৃদু নিনাদ ঝোপেঝাড়ে একদল বুনো পাখি কোথায় অদৃশ্য থাকিয়া হঠাৎ ডাকিয়া উঠিল।
তুমি যাবে?
হ্যাঁ। মাথা দোলাইল আমজাদ।
বেশ, লক্ষ্মী ছেলে।
হাসুবৌ সুকুমার মতি বালকের চোখের দিকে চাহিয়া আনমনা আলিঙ্গনে জড়াইল আমজাদকে। বেশ লক্ষ্মী ছেলে তুমি। মৃদুভাবে বন-ক্রোড়ের নীরবতা হঠাৎ চমক খাইতে থাকে।
বেশ লক্ষ্মী ছেলে তুমি।
আমাকে ছেড়ে দাও।
না।
মুনিভাইয়ের মতো আমার গালে কামড়ে দিও না যে, হাসুচাচি।
হাসুবৌ স্তব্ধ হইয়া আলিঙ্গন শ্লথ করিয়া দিল, দূরে সরিয়া গেল সে।
আমজাদ হাসিতে থাকে। হাসু চাচি, মুনিভাই একটা খ্যাপা। প্রজাপতি ধরে বলে, ওর রঙ তুলে গায়ের জামা রাঙাব।
