বিঘে দুই জমির ভালো ফসল পাইয়াছিল। এই বছর সংসারে মাস তিন টানাটানি চলিতে পারে টাকা পয়সা। আজহার দরিয়াবিবির জন্য একটি তাঁতের শাদা শাড়ি কিনিয়া আনিল। কথাবার্তা নাই দম্পতির ভেতর। তক্তপোশে শাড়ি রাখিয়া দরিয়াবিবির উদ্দেশে সে কয়েকটি কথা বলিয়াছিল মাত্র।
কয়েকদিন পরে আরো ফসল আসিল ঘরে। আজহার দেখিল তার দেওয়া কাপড় পরিয়া রহিয়াছে আসেকজান। চাহিয়া রহিল সেইদিকে কিয়ৎক্ষণ। নিরীহ মানুষটির বুকেও শত প্রশ্নের কল্লোল উঠিয়াছে।
সেইদিন বৈকালে আজহার খাঁ সুতা-কনিক-সুর্মি হাতে ভিনগাঁয়ের পথ ধরিল।
পরদিন আমজাদ একবার পিতার প্রসঙ্গ তুলিয়াছিল। তাহাকে ধমকে স্তব্ধ করিয়া দিল দরিয়াবিবি।
.
২০.
আলু-পেঁয়াজের গস্ত করিতে ইয়াকুব গঞ্জে আসিয়াছিল। সেদিন ভালো বেপারী জোটে নাই। বেশি মাল কেনা হইল না। পাঁচ ক্রোশ বাড়ি ফিরিয়া আবার গঞ্জে আসা মহা হাঙ্গামা। আজহারের বাড়ি নিকটে, পুরাতন আত্মীয়তা ঝালাই করা হবে তবু। তাই ভাবিয়া সে বহু বছর পরে গরিব মামাতো ভাইয়ের অঙ্গনে পা বাড়াইয়াছিল।
দরিয়াবিবি ইয়াকুবকে সহজে চিনিতে পারে নাই। কয়েক বছরে তাহার চেহারা বেশ বদলাইয়া গিয়াছে।
আমাকে চিনতে পারলে না? আমি তোমার সেই দেবর– যে বড্ড বেশি বিরক্ত করত।
এসো, এসো।
দরিয়াবিবির সম্ভাষণে স্মৃতিশক্তি পুনরুজ্জীবন লাভ করে।
ভাবী, গঞ্জে এসে মুশকিলে পড়েছিলাম। মাল কেনা হয়নি।
তাই বুঝি গরিবের কুঁড়েঘরে হাতি
ইয়াকুব কথা লুফিয়া লইল : হাতি নয়, বরং চামচিকে বলুন, তা-ও সহ্য হবে।
বহুদিন আগে ইয়াকুব এই বাড়ি আসিয়াছিল। তবে বেশভূষার পরিবর্তন ঘটিয়াছে। সে লম্বা-কোঁচা ধুতি পরিয়াছিল। নাকের সোজাসুজি টেরি, চুলগুলি ঢেউ খেলানো, পায়ে কারো পাম-শ্য, গায়ে ঝুলা-পাঞ্জাবি। পানের দাগ দাঁতের গোড়ায়। হাসির ভিতর বাঁকা মনের পরিচয় ফুটিয়া উঠে।
ইয়াকুব সম্পর্কে আজহারের ফুপাতো ভাই। জোত-জমি আছে শ-বিঘা। তার ধান, তাছাড়া মওসুমে আলু, পটল, পেঁয়াজ, পাট ইত্যাদি লইয়া সে ব্যবসা করে। গত কয়েক বছরে সে বেশ পয়সা রোজগার করিয়াছে, এ সংবাদ দরিয়াবিবি জানিত। তার আরো প্রমাণ, বর্তমানে তার সংসারে দুই স্ত্রী বর্তমানে। কয়েক মাস আগে আর একটি বিবাহের যোগাড় করিয়াছিল। প্রতিবেশী ও দ্বিতীয় স্ত্রীর আত্মীয়দের জুলুমে। ইয়াকুব সে সদিচ্ছা পরিত্যাগে বাধ্য হইয়াছিল।
আজহার ভাই কোথা? একটি মাদুরের উপর বসিয়া ইয়াকুব জিজ্ঞাসা করিল।
দরিয়াবিবি আগে এক গ্লাস পানি দিয়াছিল। এখন ইয়াকুবের জন্য পান সাজিতেছিল। সে পান-ই সাজিতে লাগিল, কোনো জবাব দিল না।
ইয়াকুব আবার প্রশ্ন করিল, ভাই কোথা?
আমি কী জানি? আজ পনেরো দিন বেরিয়েছে। একটা খবর পর্যন্ত দেয়নি।
আচ্ছা মজার লোক। খালি দোকান-দোকান আর ব্যবসার ঝোঁক। ওসব ভালোমানুষ দিয়ে ব্যবসা হয় না।
ইয়াকুবের হাতে পানের খিলি দিয়া দরিয়াবিবি জবাব দিল, কে বোঝাবে বল। মাঝে মাঝে খেয়াল চাপে।
আজহার ভাই ওই রকম। কত জায়গায় কত রকমের ব্যবসা ফেঁদেছে। শেষ পর্যন্ত টিকে থাকতে পারে না। সেটা ওর মহাদোষ।
অবেলা। দিনের আলো ক্রমশ নিভিয়া আসিতেছিল। ইয়াকুব হাসির ঢেউ তুলিয়া পকেট হইতে একটি দশ টাকার নোট বাহির করিল।
ভাবী, কিছু মনে করবেন না। আমি রাত্রে খিচুড়ি খাব। ঘি আর ভালো চাল কিনে আনাও। মুরগি পাড়ায় পাওয়া যায়?
পাড়ায় পাওয়া যায় না, তবে আমার ঘরে আছে।
বহুত আচ্ছা।
দরিয়াবিবি নোট গ্রহণ করিতে রাজি হইল না। এমন মেহমান না আসাই ভালো। অপমানিত হওয়ার ক্লিষ্টতা তার বুকে গিয়া বিধিল। ইয়াকুব নাছোড়বান্দা। আমজাদ ও নঈমা পাশে দাঁড়াইয়া পিতার ফুপাতো ভাইয়ের কাণ্ড দেখিতেছিল।
ইয়াকুব দুইজনের হাতে দুটি পাঁচটাকার নোট খুঁজিয়া দিল।
খোকা-খুকি, তোমরা মিষ্টি কিনে খেয়ো।
দরিয়াবিবি আরো প্রতিবাদ জানায়, কিন্তু ইয়াকুব কর্ণপাত করিল না।
এমন ব্যাপার করলে আমার বাড়ি এসো না, ভাই। আমরা গরিব।
অভিমান-ক্ষুণ্ণ ইয়াকুব কহিল : আমার ভাইপো ভাইঝিরা আমার পর? বেশ, তুমি যা খুশি বল। আজহার ভাই আসুক না।
আবার প্রাণ খুলিয়া হাসিতে লাগিল ইয়াকুব, সে যেন কত রসিকতা করিয়া ফেলিয়াছে।
দরিয়াবিবিকে অগত্যা উঠিতে হইল। খাতিরদারির সরঞ্জাম অল্প নয়।
আমজাদ নিজের নোটটি সযত্নে ভাঁজ করিয়া মার হাতে দিল। তার ফুরসৎ নাই। ঘিয়ের জন্য কৈবর্তপাড়ায় যাইতে হইবে। এমন মজুরি পাইলে সে কাজে অবহেলা করিতে রাজি নয়। একটি বোতল হাতে সে চলিয়া গেল। মুরগি জবাই করা হইল তখনই। দরিয়াবিবির একটি বড় মোরগ ছিল, সেটি এখনও বাড়ি ফেরে নাই। কত দেরি হইবে কে জানে। বাড়ির মুরগি নষ্ট করিলে আয়ের পথ বন্ধ হইয়া যায়। ডিম আর বাচ্চা রোগীর জন্য অনেকে ক্রয় করে।
রান্নাঘরে দরিয়াবিবি খুব ব্যস্ত। ছোট খুকিটা ভয়ানক কান্না জুড়িয়াছিল।
ইয়াকুব অভয় দিল, ভাবী, রান্না কর। আমি খুকিকে কোলে নিই।
খুকির কান্না থামিয়া গেল। তাকে কোলে লইয়াই ইয়াকুব রান্নাঘরে প্রবেশ করিল। দরিয়াবিবি বসন সংযত করিতে সময় পায় না।
অপ্রস্তুত হইয়া ইয়াকুব বাহিরে ফিরিয়া বলিল : ভাবী, তোমার খুকিটা বেশ।
হ্যাঁ, ভাই। বেশ সুন্দর হয়েছে মেয়ে।
