নঈমা চিৎকার করিয়া কাঁদিতেছিল। তার পরিবেশে কী ঘটিতেছে সে না দেখিলেও নির্মমভাবে উপলব্ধি করিয়াছিল। তারই ফলে ক্রন্দন ও চিৎকার।
আজহার খাঁ ছুটিয়া আসিয়া তাকেও দু-ঘা চাবকাইল।
উঠানে হাঁকাহাঁকি পড়িয়া গিয়াছে। নিরীহ আজহার খাঁ সে হঠাৎ এমন পাষণ্ড হইতে পারে, কল্পনার বাহিরে।
দরিয়াবিবিও বিছানা ছাড়িয়া বাহিরে আসিল। সেও চিৎকার আরম্ভ করিয়াছে : দাঁড়াও তোর মরদের গুষ্টিতুষ্টি করেছে। এত বড় বুকের পাটা, আমার ছেলেদের গায়ে হাত।
ছুটিয়া আসিল দরিয়াবিবি উঠানের উপর। দাওয়ার উপর হইতে পীড়িত শরীরে কিরূপে অবতরণ করিল, সেই মুহূর্তটুকু তার জবাব দিতে পারে।
আজহার রণে ভঙ্গ দিয়া লাঙল কাঁধে দহলিজের দিকে চলিয়া গেল।
উঠানের উপর ধূলি-লুণ্ঠিত অবস্থায় মোনাদির ও আমজাদ। কয়েক জায়গা ফাটিয়া গিয়া রক্ত পড়িতেছে শরীর হইতে।
দরিয়াবিবি আগাইয়া আসিবার পূর্বে স-চিৎকার মূর্চিত হইয়া পড়িল মাটির উপর।
একটু পরে আসিল লণ্ঠন-হাতে সাকের, হাসুবৌ ও তার শাশুড়ি।
.
১৯.
আমিরন চাচির সেবার অপূর্ব দক্ষতায় এই যাত্রা সত্যই বাঁচিয়া গেল দরিয়াবিবি। গরিবের সংসারে বিনা চিকিৎসায়, বিনা পথ্যে শুধু মনের জোরেই নিজকে চাঙা করিয়া তুলিল খাঁ পত্নী। এই তিন সপ্তাহে সে আরো একটি দোসর পাইয়াছে জীবনে আমিরন ও আম্বিয়া। রোগশয্যায় শৈরমীর দীন-মৃত্যুচ্ছবি দরিয়াবিবির মানসপটে ফুটিয়া উঠিত। হয়তো তেমন মৃত্যু হইবে তার। আমিরন চাচি ধীরে ধীরে তার মানসিক স্বাস্থ্যও ফিরাইয়া আনিয়াছে। নূতন কচি মেয়েটির দিকে চাহিয়া দরিয়াবিবি ক্ষুব্ধ মনে মনে। এই রূপরাশি দরিদ্র্যের কুটিরে তামা হইয়া যাইবে। আমজাদ ও মোনাদিরকে লক্ষ্য করিয়া দরিয়াবিবি স্পষ্ট হৃদয়ঙ্গম করিয়াছে।
.
এই কয়েকদিনে পুরাতন স্বাস্থ্য ফিরিয়া আসিত দরিয়াবিবির। মোনাদির তাকে দাগা দিয়া গিয়াছে। তার কোনো খোঁজ নাই। মার খাইয়া সে বিছানায় মুখ খুঁজিয়া পড়িয়াছিল। পরদিন ভোরবেলা হইতে সে নিরুদ্দেশ। সাকের দরিয়াবিবির আগেকার বাড়িতে সন্ধান লইয়াছিল। মোনাদির সেখানে যায় নাই।
কান্নাকাটির কসুর করিল না দরিয়াবিবি। আজহারের সঙ্গে বাক্যালাপ বন্ধ হইয়া গিয়াছে। দৈনন্দিনতার চাকায় মিশিয়া গিয়াছিল দরিয়াবিবি। স্ত্রীর সমস্ত কর্তব্য সে সম্পন্ন করে। কিন্তু নির্বাক। তার নির্মম মুখের দিকে চাহিয়া আজহার কথা বলিতে সাহস করে না। সংসারে দুইজন জীব একসঙ্গে বসবাস করিতেছে মাত্র। পশুর মতো একে অপরের ভাষা বোঝে না, সেইজন্য বাক্যালাপেরও কোনো প্রয়োজন নাই।
চন্দ্র কোটাল ভাড়-নাচ লইয়া খুব মজিয়াছিল। কয়েকটি মঞ্চে ইতিমধ্যে সে আসর জমাইয়া আসিয়াছে। দরিয়াবিবির অসুখের সময় এলোকেশী চন্দ্রমণি কয়েকদিন আসিয়া দেখিয়া গিয়াছিল। মোনাদির আজহারের তিরস্কারে এই ঘর পরিত্যাগ করিয়াছে, তাও জানিত চন্দ্র কোটাল। কিন্তু তা লইয়া স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে নিঃশব্দের পাহাড় মাথা তুলিয়াছে, এই সংবাদ তার জানা ছিল না।
আজহার একদিন সমস্ত বৃত্তান্ত কোটালকে বলিয়া লজ্জায় মাথা হেঁট করিল।
তোমারও রাগ আছে তা হলে?
হাসিতে লাগিল চন্দ্র। মেনি বিড়ালেরা মাঝে মাঝে রুইমাছের মুড়া গিলিয়া ফেলে। আজহার রাগিতে পারে, আশ্চর্যের বিষয় নয়।
হঠাৎ, অমন মারা উচিত হয়নি।
ভাবীর পায়ে ধরেছ?
গোঁপে তা দিতে লাগিল চন্দ্র।
তৌবা। তুমি একবার গিয়ে বলল, এমন করে সংসার চলে?
চলুক। বেশ তো, দশবছর কথা বলেছ, এখন কথা না বললে চলবে না?
দূর পাগল।
এইবার ভালো ফসল হইয়াছিল। আজহার খুব সংসার-বিব্রত নয়। কল্পনায় ছবি আঁকিতে সে-ও ভালোবাসে।
চন্দ্র কোটাল সেইদিন দরিয়াবিবিকে হাস্য-কৌতুকে ব্যতিব্যস্ত করিয়া তুলিল।
ভাবী, আমার ভাঁড়-নাচ তোমাকে দেখাতে পারলাম না। যা ধর্মের কড়াকড়ি তোমাদের।
একদিন দেখে আসব তোমার বাড়ি গিয়ে।
টাঁটির আড়াল হইতে দরিয়াবিবি জবাব দিল।
আমার সঙ্গে কথা বলছ। আর খাঁয়ের সঙ্গে কেন কথা নাই?
চুপ করিয়া গেল দরিয়াবিবি। একটু পরে আসিল উত্তর, আমার ছেলেকে যদি কেউ তাড়িয়ে দেয়
সেটা নিশ্চয় অপরাধ। আমি যদি মুনি খুড়োকে এনে দিই।
আগে এনে দাও।
নিশ্চয় এনে দেব। নিশ্চয়।
আমজাদকে মারল, আমি রাগ করিনি। কিন্তু একটা হতভাগ্য এখানে ঠাই নিয়েছিল, তার উপর হাত চালালে। আমার দিকে একবার দেখলে না।
সেটা ভারি অন্যায় করেছে।
চন্দ্র কোটালের বাক্য সমাপ্ত হওয়ার আগে দরিয়াবিবি বলিতে লাগিল, বড় দুঃখী আমার মুনি, তার গায়ে হাত দিলে হঠাৎ কাঁদিয়া ফেলিল দরিয়াবিবি। চন্দ্র কোটাল তা উপলব্ধি করিতে পারে। সাহ্যপ্রিয় তার মতো মানুষটি আর কথা বলিতে সাহস করিল না।
দহলিজে ফিরিয়া আজহার খাঁকে সে খুব ধমক দিল।
সত্যি খাঁ ভাই, ভারি অন্যায় করেছ। বোঝ না ছেলের মায়া?
আজহার গুড়ুক ফুঁকিতেছিল। বলদের মতো নিস্তেজ দুই চক্ষু বুজিয়া সে জবাব দিল, হু।
চন্দ্র কোটাল আজ হারিয়া গিয়াছে। সে চুপ করিয়া রহিল।
খোঁজ করে দেখ না, চন্দর।
আমি লোক লাগাচ্ছি। আমার বায়না আছে শ্যামগজ্ঞে। দেখা যাক।
চন্দ্র কোটাল আজ বিশেষ ভণিতা না করিয়া উঠিয়া পড়িল।
আজহার গুড়ুক ফুঁকিয়া যায়। নিস্পৃহ হইয়া উঠিতেছে সে সব বিষয়ে।
