কাঁচা দুপুরে তারই অভিনয় চলিতেছিল। হাসুবৌর হাতে কয়েকটি সন্দেশ। তক্তপোশে আমজাদ, আম্বিয়া ও মোনাদির।
হাসুবৌ। লক্ষ্মী ছেলেদের মতো খেয়ে ফেলো। হা হা শব্দ করিল হাসুবৌ।
না, আমি খাব না। মা বকবে।
মা দেখতে আসছে নাকি?
এরা বলে দেবে।
ওরাও যে খাবে।
মোনাদিরের আর কোনো ভয় নাই। হাত পাতিয়া সে সন্দেশ গ্রহণ করিল। তারপর যৌথ হা-হামের পালা। হাসুবৌ হাসিয়া লুটোপুটি খাইতে লাগিল।
সাকেরের মা ঘরে ঢুকিয়া একচোট হাসিয়া লইল।
বৌমা রান্নাবানা দেখ। অভাগীর বেটি কপাল এনেছিস কী, ছেলেপুলে নিয়ে ঘর করবি।
হাসুবৌ পাথর হইয়া যায়। আমজাদ ইত্যাদিরা সন্দেশে কামড় দিয়া বসিয়া থাকে, আর মুখ নড়ে না।
আপন মনেই বকিতে লাগিল বুড়ি : যত-সব অভাগীর কপাল। একটা ছেলের হা পিত্যেশ মিটল না। সাকেরটা গেছে কোথা লাঠি নিয়ে কোনোদিন কী কপালে আছে আল্লা জানে।
বাহির হইয়া গেল বুড়ি। বুড়ি তো নয়, আপদ! ঘরে আবার হাসির হরা।
মোনাদির একটি গল্পের বই পড়া শুরু করিল। সকলে মন দিয়া শোনে। হাসুবৌ মোনাদিরের নিকটে। তার চালচলন, পঠনভঙ্গি বড় সুন্দর দেখায়।
অনেকক্ষণ কাটিয়া গেল। মোনাদির গল্প শেষ করিয়া বাহিরের দিকে চাহিল। দুপুর ঢলিয়া পড়িতেছে। না, আর বসা যায় না। ক্ষুধা লাগিয়াছে তার।
আম্বিয়াকে সে বলিল : চল্ না, বাড়ি যাবি না?
চল না, মুনিভাই।
হাসুবৌ বিরক্তিপূর্ণ দৃষ্টি নিক্ষেপ করিয়া বলিল : আম্বি, তুই যেতে চাস, যা। আবার ওকে কেন টানাটানি!
আমি ওর সঙ্গে যাব। কাঁচুমাচু খাইয়া আম্বিয়া জবাব দিল।
না, আমিও যাব।
মোনাদির তক্তপোশ হইতে নামিয়া দাঁড়াইল। হাসুবৌ আক্রোশ বিফল দেখিয়া অনুরুদ্ধ কণ্ঠে বলিল : মুনি, দরিয়াবুবুকে দেখে আসব।
তবে চল।
খুব উৎফুল নয় মোনাদির। স্বাভাবিক শালীনতা যেন সে এই বয়সে আয়ত্ত করিয়াছে। হাসুবৌ জবাব দিল : আমি তোমাকে হেঁটে যেতে দিচ্ছি নে, আমার কোলে চড় দেখি, সোনা।
বাধা দিল মোনাদির : আমি কি খোঁড়া, না আমার পায়ে মেহদি দিয়েছি?
কোনো বাধা হাসুবৌ স্বীকার করিল না। মোনাদিরকে সে কোলে তুলিয়া লইল।
আমজাদ ফুট কাটিল : ধেড়ে ছেলে কোলে উঠেছে।
শাসাইয়া জবাব দিল হাসুবৌ : তোর কী রে! দশ-এগারো বছর বয়সে যদি ধেড়ে, তুই কী?
মোনাদির কোলে চড়িয়াছিল, কিন্তু আরাম নাই তার বুকে। পাড়ার লোকে হাসিবে বৈকি!
গমন-উদ্দেশ্যে পা বাড়াইয়া হাসুবৌ মোনাদিরকে বলিল : লক্ষ্মী, আমার গলাটা জড়িয়ে ধর, না-হলে আছাড় খেয়ে পড়ে যাবে।
.
ঘরে আদৌ মন টেকে না মোনাদিরের। হাসুবৌ দরিয়াবিবির মাথা টিপিয়া দিতেছিল। মোনাদির কয়েক মিনিট মার সঙ্গে বাক্যালাপ করিয়া উঠিয়া গেল। আমিরন চাচি সকলের খাবার দিতেছিল। আজহারের ভাত রান্নাঘরে চাপা থাকে। মাঠের কাজ ছাড়া চন্দ্র কোটালের সঙ্গে সে কোথায় কী করিতেছে তার কেউ হদিশ জানে না।
খাওয়া শেষ হওয়ার পর মোনাদির একটিবার মার ঘরে উঁকি দিয়া পাড়ায় উধাও হইয়া গেল। আম্বিয়া দুপুরবেলা ঘরে গিয়াছে, সেদিকেই খেলা ভালো জমিবে।
হাসুবৌ ডাক দিয়া কোনো সাড়া পাইল না। দরিয়াবিবি বিষমুখে বলিল, আমি বিছানায় পড়া-অব্দি ওর যে কী হয়েছে।
হাসুবৌ জবাব দিল, এই কদিন আমার কাছে নাহয় থাকত। তুমি আবার রাজি হও না।
না বৌ, সে হয় না। একে অনেক কষ্টে ও ফিরে এসেছে। আমার চোখে চোখে থাক।
খুব তো তোমার চোখে চোখে আছে!
হাসুবৌ খানিক পরে চলিয়া গেল।
সেদিন সন্ধ্যায় কিন্তু এলোমেলো সাংসারিক জটাজাল কুণ্ডলী পাকাইয়া গেল।
ভর সন্ধ্যা। তবু একটি ছেলে ঘরে ফেরে নাই। আসেকজান আজকাল রাত্রি কাটাইবার সুযোগ অন্য কোথাও পাইলে এখানে থাকে না। কী বা সাহায্যে লাগে সে। নঈমা দাওয়ায় বসিয়া ঝিমাইতে জানে শুধু। সন্ধ্যার পর সে-ও ভালো দেখিতে পায় না। হাসপাতালের ডাক্তার চোখ দেখিয়া পথ্যের তালিকা প্রস্তুত করিয়া দিয়াছেন। অত পয়সা খাঁ-পরিবারে কারো নাই যে, আহার্য রোগের প্রতিষেধকরূপে ব্যবহৃত হইবে। আমিরন চাচি মুরগি-হাঁস তুলিতে কিছুক্ষণের জন্য বাড়ি গিয়াছে।
দরিয়াবিবি করুণ সুরে ডাকিতেছিল : একটি পানি দিয়ে যা– কণ্ঠস্বর তার রোগেশোকে ক্ষীণ। অনেকক্ষণ কারো জবাব না পাইয়া সে প্রাণপণে একবার চিৎকার করিয়া উঠিল, তোরা কি মরে গেছিস সব?
নঈমা জবাব দিয়াছিল। অক্ষমের আর কোনো চারা নাই। এই সময় আজহার খাঁ ফিরিয়া আসিল। তখনও তার কাঁধে লাঙল। দরিয়াবিবির আর্তনাদ শুনিয়া আজহার আর গোয়ালঘরে লাঙল রাখিতেও যায় নাই।
কী হল, দরিয়াবৌ?
একটু পানি।
উঠানেই লাঙল রাখিয়া কলস হইতে পানি গড়াইল আজহার। দরিয়াবিবি নিশ্চিন্তে পান সমাধা করিয়া গ্লাস স্বামীর হাতে দিয়াছে, দেখা গেল উঠানের উপর আমজাদ একটি কঞ্চি হাতে অগ্রসর হইতেছে, পশ্চাতে মোনাদির।
গ্লাস মাটিতে নামাইয়া আজহার খাঁ তীরবেগে ছুটিয়া আসিল, কোথায় ছিলি হারামজাদা? দাঁড়া– বলিয়া সে আমজাদের কান ধরিয়া চপেটাঘাত ও পরে আছাড় দিয়া উঠানে ফেলিয়া দিল। ইহার পর শুরু হইল মোনাদিরের উপর ঐ প্রচণ্ড শাস্তি। হাতের কঞ্চি লইয়া আজহার খাঁ দুইজনকে একই সঙ্গে প্রহার শুরু করিল : যত সব পর-খেগো হারামীর বাচ্চা। খেয়ে টইটই ঘুরে বেড়াবে। শুয়োরের বাচ্চা, মরো নি তোমরা–।
