দরিয়াবিবির জ্বর হইতেছিল অল্প অল্প। কবিরাজ আসিয়াছিল একদিন। ডিস্ট্রিক্ট বোর্ডের ডিস্পেন্সারি হইতে বর্তমানে ঔষধ আনা হয়। কবিরাজের ঔষধে কিছুই ফল হইল না। কিন্তু ডিস্পেন্সারি প্রায় তিন মাইল দূরে। আমজাদ ও মোনাদিরের মুখ রৌদ্রের তাপে শুকাইয়া যায়। আজহার খাঁর জমির কাজ ও টাকা ঋণের উপায় লইয়া ব্যস্ত সংসার লণ্ডভণ্ড। সময়মতো সকলের খাওয়া হয় না। নঈমার দুই চোখে এমন পিচুটি জমে যে, দুপুরের আগে সে চোখ খুলিতে পারে না। দাওয়ায় বসিয়া আসেকজানের নিকট সে নাকি কান্না কাঁদিতে থাকে। শুইয়া শুইয়া দরিয়াবিবি তিরস্কার করে। তখন মুহূর্তের জন্য সে থামে। আবার শুরু হয় ক্রন্দন।
আমিরন চাচিকে কোনো দোষ দেওয়া চলে না। গৃহিণীপনায় সে কম নয়। পরের সংসার অনভ্যাসের ফলেই গুছাইতে এত বিলম্ব।
মোনাদির স্তব্ধ হইয়া গিয়াছে। মার পাশে গিয়া আর বসিয়া থাকিতে ভালোবাসে না। দরিয়াবিবির আহ্বানে সাড়া দিলেও, কোনো উৎসাহ পায় না সে। এই আবহাওয়া সে যেন বরদাস্ত করিতে পারিতেছে না। কিন্তু বোনটির দিকে চাহিয়া সে একরকমের লজ্জা অনুভব করে। কোনো সচেতন কারণ অবশ্য তার উপলব্ধির বাহির। সৌন্দর্যের পুত্তলি। মোনাদিরের দুই চক্ষু কোনো আনন্দের উপকরণ খুঁজিয়া পায় না। এইজন্য মোনাদির পাড়ার গাছগাছালির তলায় বেশিক্ষণ থাকিতে ভালোবাসে। সঙ্গে আম্বিয়া বা আমজাদ। অথচ মার ফাঁই-ফরমাশের জন্য এই সময় তাদের ঘরে থাকা উচিত।
খোলা টাঁটির ফাঁক দিয়া বাহিরের জগৎ যা দরিয়াবিবির চোখে পড়ে। কর্মনিষ্ঠ, চঞ্চল তার মনও স্থিতি পায় না এই অন্ধকারে। শুইয়া শুইয়া খবরদারি গ্রহণে তার কার্পণ্য নাই। মুনি খেয়েছে কিনা, আমু কোথা, নঈমার চোখ কিরকম। হাজার সংক্ষিপ্ত প্রশ্ন। জেলা বোর্ডের ডিস্পেন্সারির ডাক্তার বিছানায় শুইয়া থাকিতে আদেশ দিয়াছিল। প্রসূতি কতটুকু বা তা পালন করিতে পারে? উঠিতে হয় বৈকি দরিয়াবিবিকে। আমিরন চাচি এই জন্য বড় বিব্রত। প্রস্রাব পায়খানা ফেলিবার ভারটুকু সে অতি কষ্টে দরিয়াবিবির নিকট হইতে গ্রহণ করিল।
তুমি ভালো হয়ে নাও তারপর শোধ নিও।
শোধ! বলিয়া মুখ কুঞ্চিত করিল দরিয়াবিবি। নবজাতক হাতপা নাড়িয়া কাঁদিয়া উঠিতে সে তাকে বুকের কাছে টানিয়া লইল। পুরাতন সূত্রের আবার খেই চলে : শোধ এ জন্মে নয়। আমার মোনাদিরটা বড় হোক।
চুপ করিয়া গেল দরিয়াবিবি। মাথার যন্ত্রণা হইতেছে।
আমিরন বিবি জিজ্ঞাসা করিল, একটু মাথা টিপে দিই?
না। তুমি রান্না সেরে ফেল।
হ্যাঁ, সেরে ফেলি। এক দৌড়ে বাড়ি যেতে হবে। ডাবায় পানি দিতে বলেছিলাম গরু দুটোকেও কি চোট বালতি করে পানি তুলেছে কিনা কে জানে। সারাদিন শুকিয়ে মরবে।
তা যেয়ো। তুমি যা দিলে বোন, শোধ-শোধ আর ইহজন্মে কেউ করতে পারে না।
এত কাঙালীপনা কেন? অথচ দরিয়াবিবির প্রশান্ত মনের সম্মুখে ঝড়ঝঞ্ঝা কত তুচ্ছ। কাতুরে কিশোরীর মতো দরিয়াবিবি।
কিছু ভেবো না। সব দুঃখ আল্লাই তরাবেন।
আল্লা-আল্লা।
বিদ্রুপের ভ্রুকুটি খুলিয়া গেল দরিয়াবিবির মুখের উপর।
আল্লাই যদি সব করেন, তবে আমাদের এত দুঃখ দিয়ে কী পান তিনি? আমার ঈমান নেই, নষ্ট হয়ে যাচ্ছে, বুবু।
ছি, ও কথা মুখে আনতে নেই।
থাক আল্লা। রোগ হলে ওষুধ খেলে ভালো হয়।
এই ভালো হওয়ার রাস্তাটা তো মানুষকে খুঁজে বের করতে হয়েছে। ওটা তো আন্না মগজে ঢুকিয়ে দেননি। তবে আর আল্লার কথা কেন মুখে। দুনিয়ার দুঃখকষ্ট রোগভালাই সবকিছুর পিতিকার আমাদেরই করতে হবে। আল্লা থাকে থাক্, না থাকে থাক্। দু-তিন বছরে আমার ঈমান গেছে।
স্তম্ভিত আমিরন চাচি!
কী বলছ রোগের ঝেকে! ওসব আমি বুঝিনে।
দরিয়াবিবি ক্লিষ্ট বেদনায় চোখ বন্ধ করিল। তার জগতের উপর কালো ছায়া নামিয়াছে।
আবার উন্মীলিত পক্ষ দৃষ্টি আমিরনের সর্বাঙ্গ কৃতজ্ঞতায় লেহন করিতে থাকে।
রাগ কর না, বুবু। তুমি নামাজ পড়। আমি পড়া ছেড়ে দিয়েছি। মন বসে না। খামাখা যাতে মন নেই, তা করে কোনো লাভ নেই।
আমিরন চাচি দরিয়াবিবির মাথায় হাত বুলাইতে বুলাইতে বলিল, এখন চুপ কর। তোমার মাথা ঠিক নেই।
হুঁ!
পায়ের গাঁটে অসহ্য যন্ত্রণা, সটান পা লম্বা করিতে লাগিল দরিয়াবিবি।
ঘুমাও তুমি। আমি কাজ সেরে আসবো।
খোকাদের একটু ডেকে দাও।
আচ্ছা, বলিয়া আমিরন বিবি রান্নাঘরের দিকে নিষ্ক্রান্ত হইল।
খোকারা কেউ এই তল্লাটে ছিল না। হাসুবৌ মাঝে মাঝে খোঁজখবর লইয়া যায়। দরিয়াবিবির শারীরিক পরিচর্যা সে ফুরসৎ মতো সম্পন্ন করে। বেশিক্ষণ বাহিরে থাকার জো নাই তার। শ্বাশুড়ি এই নির্বোধ রুগ্ন বধূটিকে চোখে চোখে রাখিতে চায়। জিন ভূতের পাল্লায় সর্বনাশ হইতে চলিয়াছে তার। সংসারে বংশধর না আসিলে পুত্র আর ঘরমুখো হইবে না। বধূর ওপর খর মেজাজ ফলাইলেও সাকেরের মা আসলে করুণা পরবশ। ছেলেগুলিকে কয়েকদিন নিজের কাছে রাখিতে চাহিয়াছিল হাসুবৌ। দরিয়াবিবি রাজি হয় নাই। তাহাদের সংসারও খুব সচ্ছল নয়। আত্মীয়তার দৌরাত্মে মনের সাধারণ মিলটুকু পাছে হারাইতে হয়, দরিয়াবিবি সে আশঙ্কা করিয়াছিল। কিন্তু তার পুত্রবধূ গাছগাছালির উৎসঙ্গে আদর না পাইলে হাসুবৌর কাছেই ছুটিয়া যায়, সেখানে আহারাদি করে না। মোনাদির মার কড়া হুকুম পালন করিত। হাজার সাধাসাধির পরও সে হাসুবৌর বাড়িতে কোনো খাবার হাতে লইত না।
