এইজন্য আজহার পরিচয় পাইয়া বড় বিগড়াইয়া গিয়াছিল মনে মনে। রাজেনকে চেনা দায়। রঙটি ফরসা। শহরের ছায়ায় আরো জৌলুশ খুলিয়াছে; সংলাপে কৃষকপল্লীর কোনো খুঁৎ পড়ে না। যেন কতদিন সে বিদ্যালয়ে অধ্যয়ন করিয়াছে।
এমন লোকের সঙ্গে চন্দ্র জঘন্য ব্যবসা ফাঁদিতে গেল! কোটাল নেশা করে, সুতরাং অচিরেই সে গোল্লায় যাইবে। মুখ ফুটিয়া আজহার কোনো কথা বলিতে সাহস করিল না।
চন্দ্র কোটালের উৎসাহের অন্ত নাই। সুদীর্ঘ গোঁফে সে ঘন ঘন তা দিতে লাগিল।
দেখো আজহার ভাই, এবার ফসল যদি ভালো হয়, আমাদের বায়নার অভাব হবে না।
ফসল আল্লার মেহেরবানি। নিস্তেজ কণ্ঠে জবাব দিল আজহার।
রাজেন্দ্র হারমোনিয়াম টানিয়া রীড টিপিতে লাগিল। পড়ন্ত দুপুর। চন্দ্র কোটাল মাদুরের উপর তাল দিতে ব্যস্ত। আজহারের মুখে কোনো কথা নাই।
আজহার ভাই চন্দ্র মুখ টিপিয়া টিপিয়া হাসিয়া উঠিল।
আজহার কিছু বুঝিতে পারে না। নূতন রোজগারের পন্থা জুটিয়াছে। মরীচিৎকার স্বপ্নে চন্দ্র কোটালের মুখে আনন্দের বন্যা আসিয়াছিল। নিষ্ক্রিয় আজহারকে সে ডাক দিল, কিন্তু তার মধ্যে বিদ্রুপের ভাব প্রচ্ছন্ন। আজহার ইহার বিন্দুবিসর্গ উপলব্ধি করিতে পারিল না।
তোমার সঙ্গে আমার আরো কথা আছে, চলো আজহার ভাই। রাজেন্দ্রের দিকে কোটাল দৃষ্টি বিনিময়ের সাহায্যে তাকে অপেক্ষা করিতে বলিল।
খাঁ সাহেব, তুমিও আমাদের দলে ঢুকে পড়ো।
আজহার চন্দ্রের দিকে বিষণ্ণ দৃষ্টি নিক্ষেপ করিল।
কোটালের দাওয়ায় বসিয়া আজহার আরো বিস্মিত হইল। শ্ৰী লাগিতেছে তার। ঘরে। বাঁশের নড়বড়ে খুঁটি বদলাইয়া একটি কাঠের খুঁটি লাগাইয়াছে সে। আলুচাষে নিশ্চয় কোটাল তাকে ফাঁকি দিয়াছে। চন্দ্রমণির অসুখ সারিয়া গিয়াছে। শাদা পরিষ্কার থানকাপড় পরনে। খানিক আগে পান খাইয়াছিল। রাঙাঠোঁটে তাকে বেশ মানায়, দুই সন্তানের জননী বলিলে ভুল করা হইবে। আজহার কোটাল সম্বন্ধে কোনো নীচতা মনে প্রশ্রয় দিতে পারে না। ফাঁকি দেওয়ার লোক সে নয়। নূতন দলের জন্য রাজেন্দ্র বোধহয় খরচ করিতেছে। তার সম্বন্ধে এত গুজব, তবে ভিত্তিহীন নয়।
আজহারের অভ্যর্থনার ত্রুটি হয় না কোথাও। কোটাল বলিল : আজহার ভাই, সত্যি, বুড়ো বয়সে কোমর নাচান আর ভালো লাগে না। রাজেন্দ্র ছোঁড়াটা ধরে বসল। দেখি কপাল ঠুকে যা আছে ভাগ্যে।
চন্দ্র কোটাল পূর্বে ভাড়-নাচের দলে কাজ করিত। দশ-বিশ মাইল দূরে গঞ্জে গঞ্জে তাহাদের ডাক পড়িত। এমন প্রবাস জীবনের সময় এলোকেশীকে সে এক মাহিষ্য বাড়িতে সঙ্গিনীরূপে পাইয়াছিল। এলোকেশী তার বিবাহিতা স্ত্রী নয়। রাজেন্দ্রের। কীর্তিকলাপের খোটা দিয়া চন্দ্রের নিকট আজহার কোনো অভিযোগ করিতে সাহস করিল না।
স্তিমিত স্বর আজহারের : চেষ্টা করে দেখ। আমার সঙ্গে আর একটা চাষবাস কর।
নিশ্চয় নিশ্চয়। জাত ব্যবসা আমি ছাড়ব না। ওটা তো বাড়তি কাজ। বায়না পাব, কি না পাব কে জানে।
সংসারে আর ভালো লাগে না।
আমারও ওই দশা।
চন্দ্রমণি বেশ ফুটফুটে প্রজাপতির মতো। স্বাস্থ্যের জৌলুশের সঙ্গে তাকে আরো সুন্দরী মনে হয়। ছেলে দুইটি উঠানে লাফালাফি করিতেছে। আজহার কল্পনায় এমনই সাংসারিক চিত্র আঁকিতে লাগিল। তার সংসারে কি স্বাচ্ছন্দ্যের এমন হাওয়া লাগিবে না?
তামাক নিঃশেষ করিয়া আজহার উঠিয়া পড়িল। বলিল : ভেবে দেখ, চন্দ্রর। যদি পুঁজি পাও।
আচ্ছা, আচ্ছা।
কোটালের কণ্ঠস্বরে আনন্দের উচ্ছ্বাস। হিংসা হয় আজহারের মুহূর্তের জন্য।
মাঠের নিঃসঙ্গ পথে ঔদাসীন্যের বোঝা আজহারের বুকে জগদ্দলের মতো চাপিয়া বসিতেছে যেন। হারমোনিয়ামের আওয়াজ ভাসিয়া আসিতেছিল। জুড়ি গান ধরিয়াছে রাজেন্দ্র ও চন্দ্র কোটাল।
.
১৮.
আঁতুরঘরে আর কোনোদিন এত দীর্ঘকালব্যাপী দরিয়াবিবিকে পড়িয়া থাকিতে হয় নাই। সুঠাম স্বাস্থ্য তার। পাঁচদিন পার হইলেই সে আবার সংসার গুছাইয়া লইত। আসেকজান এই কয়দিন তাকে সাহায্য করিত। বর্তমানে তার দৃষ্টিশক্তি অন্তর্হিত। অকেজো বুড়ি সংসারের কোনো কাজে লাগিল না। আমিরন চাচির শরণাপন্ন হইল আজহার খাঁ। সেও বিধবা মানুষ। সংসারের আগল পাগল হইয়া ব্যস্ত। কিন্তু আমিরন-চাচি সহজে রাজি হইয়া গেল। তার সিদ্ধান্ত সত্ত্বর সংসার-শৃংখলার ছবি আঁকিয়া লইল। গরু দুটি এই কয়েকদিন আর মাঠে ছাড়া হইবে না। গোয়ালে শুইয়া শুইয়া খড় খাক। মুরগি হাঁস আম্বিয়ার তদারকে। নিশ্চিন্ত আমিরন চাচি।
দরিয়াবিবি কৃতজ্ঞতায় ডুবিয়া গেল।
আসেকজানের ঘরটি বর্তমানে আঁতুরঘর। অন্ধকার। দিনের আলো সেঁধোয় না। কোণে কোণে পুরাতন ঝুল জমিয়া রহিয়াছে। অস্বাস্থ্যকর গন্ধে দম বন্ধ হইয়া আসে। ইহার ভিতর দরিয়াবিবি শুইয়াছিল। পাশে সদ্যোজাত শিশু মেয়েটি। অর্ধ পরিষ্কৃত ন্যাকড়ায় প্রস্তুত কাথার উপর যেন পদ্মফুল ফুটিয়া রহিয়াছে। মার আদল নবজাতকের চোখেমুখে।
দরিয়াবিবি শিশুর দিকে চাহিয়া বলিল : আমি বুবু তোমার দয়ায় এ যাত্রা হয়তো বেঁচে যাব।
ছি ছি, বুবু। তোমাকে শক্ত মেয়ে মনে করতাম। তুমি এত কাতর হয়ে পড়ছ?
আর কোনোদিন এমন হয়নি। শরীল খুব ভালো ঠেকছে না।
দাওয়ায় আস্তানা পাতিয়াছিল আসেকজান। তার কানে কথাটা সহজে প্রবেশ করে। সে খেদোক্তি আরম্ভ করিল : আমারও নসিব, বৌ। চোখের মাথা খেয়ে বসে আছি। আগে তবু ফাঁই-ফরমাশ এই অকালে শুনতে পারতাম।
