তুমি এসো আর একদিন, অন্য বই আনব।
আমজাদ মোনাদিরের কাছে নিষ্প্রভ হইয়া যায়। আগন্তুক বালকের উপর তার হিংসা হয়, কিন্তু তা নিবৃত্তির একটা সহজ উপায়ও সে এই কয়েক মাসে আয়ত্ত করিয়াছে। মার উপর তার দরদ ক্রমশ হ্রাস পাইতেছে। দর্শকের মতো আমজাদ ছড়াপাঠের সভায় যোগ দিয়াছিল।
আমিরন চাচি হাঁক দিল : এই হতচ্ছাড়ি, এই বই নিয়ে হল্লা কেন এত? কদ্দিন বা তোকে মতবে পাঠাতে পারব।
দরিয়াবিবি ধমক দিল : খামাখা তুমি মেয়েকে ধমকাও। বেশ লক্ষ্মী মেয়ে। চালাক, পড়াশুনায় ঝোঁক আছে।
চালাক। পাঁচ বছর বাদ বুকে পাথর হয়ে বসবে ঐ মেয়ে। বেওয়া মায়ের আবার স্নেহ যত্ন শান্তি।
খোদার দিন খোদা চালায়। ভেবে ভেবে আমারও পাঁজরা ঝাঁঝরা হয়ে গেল। ভাবি, দূর ছাই আর চিন্তা করব না, তবু সব গোল পাকিয়ে আসে।
মোনাদির তখন একটি ছড়া আবৃত্তি করিতেছিল। শেষ হইলে আম্বিয়া উচ্ছ্বসিত হইয়া বলিল, আর একটা পড়ো না মানু ভাই। তোমার মুখে বেশ মানায়।
প্রশংসায় মোনাদিরের বুক ভরিয়া উঠিতেছিল। তবু ধমক দিয়া বলিল : হ্যাঁ, আর ফাজলেমি করতে হবে না। বদমাইশ।
মোনাদির আর একটি ছড়া আবৃত্তি করিল। জননীদের মধ্যে তখন দুঃখ-দারিদ্র্যের কথোপকথন চলিতেছিল। আমিরন চাচির পাড়ার আত্মীয়রা মোটেই সদয় নয়। ভিটেমাটি ছাড়া হইলে, এই কয়েকটি গাছপালা ও পুকুর পুঙ্কুরিণীর উপর দৌরাত্ম করিতে পারিলে তারা সন্তুষ্ট হইবে।
দরিয়াবিবি অতীত আত্মীয়দের ব্যবহারের স্মৃতি বয়ান করিতে লাগিল।
বহুদিন এইদিকে দরিয়াবিবি আসে নাই। বড় পরিচ্ছন্ন আমিরনবিবি। দীনতার ভিতর এমন সৌন্দর্যের তৃষ্ণা বাঁচিয়া রহিয়াছে। উঠান, ঘাটের পথ, দাওয়া ঝকঝকে; গৃহলক্ষ্মীর স্বর্গ রহিয়াছে মাচাঙ, সবজি ও গাছপালার উপর।
সন্ধ্যা নামিতেছে। আর দেরি চলে না, ছড়ার আসরও ভাঙিতে হইল। মোনাদির। এখানে পরিচিত মনের সন্ধান পাইয়াছে। কয়েকদিন আগেকার অসোয়াস্তি ভুলিয়া গেল। আম্বিয়া ও আমিরন সড়ক পর্যন্ত আগাইয়া আসিল।
সড়কে আবার ভারী হইতে থাকে দরিয়াবিবির মন। এতক্ষণ বেশ ছিল সে। শৈরমী শাকের বোঝা মাথায় অবসন্ন সন্ধ্যায় সড়কে হাঁটিতেছে যেন, তারই সম্মুখে।
.
১৭.
শকরগঞ্জ আলুর চাষে অনেক লোকসান গিয়াছিল। চন্দ্র কোটাল হাসিমুখেই বলিল : খ সাহেব, আমাদের কপালটা পাথর চাপা।
আজহার নিরুত্তর ছিল। সংসারে পোষ্য সংখ্যা বাড়িতেছে। আয়ের অঙ্ক যদি নড়চড় হয়, বাঁচার আর কোনো আস্বাদ থাকে না।
চিন্তায় আজহারের ঘুম হয় না ঠিকমতো। তার মস্তিষ্কের কলকজা এমনিই চালু নয়। মনের অন্ধকারে হামাগুড়ি দেওয়ার মধ্যেই সে শান্তি পায়।
চন্দ্র কোটাল অলস নয়। রোজগারের পন্থা সে সহজে আবিষ্কার করে। আজহার অবাক হইয়া গেল। চন্দ্র কোটাল বাস্তুর ঢিবির পাশেই আর এক চালাঘর তুলিয়াছে। তার ভিতর একটি ভাঙা হারমোনিয়াম, পুরাতন বেহালা, পরচুলা আর বাইজি সাজার পোশাক। চন্দ্র ভিতরে বসিয়া একজন যুবকের সঙ্গে কথাবার্তা বলিতেছিল।
এ কী, চন্দ্র? আজহার জিজ্ঞাসা করিল।
এসো, মাদুরের উপরে বসো। সব বলছি। একটা ভাঁড়-নাচের দল করলাম আবার।
আজহার মাদুরের উপর বসিয়া তামাক ফুঁকিতে লাগিল।
ছ্যা ছ্যা। শেষে আবার বুড়ো বয়সে এইসব কাজে হাত দিলে!
জঠরের উপর হাত বুলাইয়া চন্দ্র হাসিয়া উঠিল।
বুড়ো বয়স। কিন্তু এই জায়গাটা বুড়ো হতে জানে না।
আজহার বলিল, তোমাদের মহড়া চলছে?
চন্দ্র। খুব জোরেশোরে চলছে। এবার বস্ত্রহরণ পালা করব।
আজহার। ওটা তুমি ভালোই করতে। এত সাজগোজ। টাকা পেলে কোথা?
চন্দ্র পার্শ্বে উপবিষ্ট যুবকের পিঠে হাত থাপড়াইয়া জবাব দিল : এই যে আমার রাজেন্দ্র ভায়া আছে। ও বহুত দিন শহরে ছিল। শহরের ছাঁটকাট এনেছে কিন্তু পয়সা আনতে পারেনি।
রাজেন্দ্র এই গ্রামের কৃষকপল্লীর সন্তান। সত্যই তার ছাঁটকাট শহুরে। পরনে ধুতি, গায়ে হাফশার্ট। চুল দশ-আনা ছ-আনা।
রাজেন্দ্র লজ্জিত হইয়া বলিল, আর কেন ওসব চন্দ্রদা। এতেও যে পয়সা আসবে, মনে হয় না। তবে ফুর্তি করে দিনটা কাটানো যায়।
চন্দ্র। দাও না ভাই একটা গান শুনিয়ে।
তৌবা বলিয়া আজহার খুব কাঁচুমাচু করিল। রাজেন্দ্রের গান-গাওয়ার তেমন উৎসাহ ছিল না, গুনগুন করিতে লাগিল। চন্দ্র একটু অপ্রস্তুত হইল বৈকি।
চন্দ্র। দেখো খাঁ ভাই, এবার যখন রাজেন্দ্রকে পেয়েছি, দল ঠিক চলবে। ওর হাত গলা দুই সমান চলে। বেহালার ছড়ি ধরতে ওর জুড়ি নেই। যাত্রার দল সব ফেল মারবে দেখো।
আজহারের এই আবহাওয়া ভালো লাগে না। কয়েকটি পুরাতন শাড়ি ঝুলিতেছিল আলনায়। জিজ্ঞাসা করিল, ওগুলো কি নাচের সাজ?
জবাব দিল চন্দ্র : হ্যাঁ। রাজেন্দ্র এনেছে সঙ্গে করে।
আজহার সহজেই সবকিছু গ্রহণ করিতে পারিল না। রাজেন্দ্রের বদনাম অনেক। বাউরীপাড়ার একটি বিবাহিতা মেয়ে লইয়া সে উধাও হইয়াছিল দেশ হইতে সাতবছর পূর্বে। বাউরী মেয়েটির স্বামী ও দেবর গত বৎসর মারা গিয়েছে। নচেৎ রাজেন্দ্র দেশে ফিরিতে সাহস করিত না। তার প্রবাস জীবনের কত কাহিনী গুজবের আকারে পল্লীগ্রামে আসিয়া পৌঁছিয়াছে। বাউরী মেয়েটি এখন নিষিদ্ধপল্লীতে আশ্রিতা। রাজেন্দ্র তার উপার্জনে আশ্রিত। থিয়েটারের এক বাইজি রাজেন্দ্রের প্রেমে পড়িয়াছিল। তার পশ্চাতে সে খোয়র হইয়া বর্তমানে ভিক্ষাবৃত্তি অবলম্বন করিয়াছে। বহু টাকার মালিক রাজেন্দ্র দাস, অধর দাসের পুত্র। হাতেম বস খাঁর সন্তানেরা শহরে তার কল্যাণে ময়ূর উড়াইয়া বেড়াইতেছে কার্তিকের মতো। গুজবের শেষ নাই।
