আবার হাঁপাইতে লাগিল শৈরমী। বিধবা মেয়েটি আদিখ্যেতা শুরু করিল : কপাল দেখো, মা। গরিব আমরা, দেহটা যদি ভালো থাকে। শোকের ওপর আবার এই রোগ। ভগবানের কি ফুটো চোখও একটা আছে?
দরিয়াবিবির দিকে অদ্ভুত ক্লান্ত স্তিমিত দৃষ্টি মেলিয়া শৈরমী চাহিয়াছিল, চোখের পাতা আর পড়ে না। দরিয়াবিবিরও চক্ষু ফিরাইবার সামর্থ্য ছিল না যেন।
শৈরমী এবার গলা পরিষ্কার করিল কয়েকবার খকখক কাশিয়া।
সই, ভালো হই, যাব।
দরিয়াবিবি তার রেখাঙ্কিত ময়লা হাতটি স্পর্শ করিয়া দেখিল। জ্বর নাই বোধ হয়। শীতল, ঠাণ্ডা হাত।
হ্যাঁ, এসো আবার।
মাথা দোলাইল শৈরমী।
সই।
সই।
তোমার ঘড়াটা, জয়া দাও তো। কথা বলিতে রীতিমতো কষ্ট হইতেছিল শৈরমীর, ঘরের হাঁড়িকুঁড়ির জঙ্গলের দিকে সে হাত বাড়াইল।
আবার মৃদু ঠোঁট সঞ্চারিত হইল : আমি– আমি ছাড়িয়ে এনে রেখেছিলাম, টাকাটা আমার হাতে দিও।
শৈরমীর চোখের কোণ হইতে অশ্রু গড়াইয়া পড়িল। জয়া একটি পিতলের ঘড়া দরিয়াবিবির সম্মুখে রাখিল। সে-ও দীর্ঘ নিশ্বাস ফেলিয়া ব্যজনরত হইল।
শৈরমীর চোখমুখ দেখিয়া মনে হয়, বহু-কথন প্রয়াসী সে। কিন্তু চুপ করিয়া রহিয়াছে। শ্বাসনালীর শব্দ আরো দ্রুত হইতেছে। বসিয়া রহিল দরিয়াবিবি নির্মম পাথরের মতো। দারিদ্রের হিংস্র রূপ তার কাছে অপরিচিত নয়। কিন্তু এত বিভীষিকাময় তার অট্টহাস্য, দরিয়াবিবি আর কোনোদিন শোনে নাই, শিহরিয়া উঠিতেছিল সে বারবার।
চৌকিদার প্রহর হাঁকিয়া গেল। ছেলে দুটি নির্বোধ দর্শকের মতো বসিয়াছিল। তাহাদের চোখের পাতায় ঘুম। দরিয়াবিবি আর বিলম্ব করিল না। জয়ার হাতে দুয়ানিটি খুঁজিয়া দিয়া বিদায় লইল। তবু একজন সমব্যথী পাইয়াছে শৈরমী। মেয়েটি ভিটার নিচে আগাইয়া আসিল।
কপাল মা। তবু ভিন পাড়া থেকে এসে দেখে গেলে। কেউ চোখও দেয় না। রাতটা কাটবে না। আর দেরি করব না। কফটা আবার এলো কিনা।
দ্রুত চলিয়া গেল জয়া।
ঘড়াটি মোনাদিরের বগলদাবা। আকাশে মেঘ জমিয়াছিল। চাঁদ আরো ঘনীভূত অন্ধকারে হারাইয়া গিয়াছে। জঠরের সন্তানের প্রতি মমতাবশতই বোধহয় দরিয়াবিবি সন্তর্পণে পা ফেলিতেছিল, নচেৎ চলৎশক্তি তার রহিত হইয়াছে।
ঘন বাঁশবনে বাতাসের আর্তনাদ মাথা কুটিতেছিল। হঠাৎ শৈরমীর ভিটা হইতে আকস্মিক রোদন নিনাদ শোনা গেল।
একবার থাম্, আমু।
দরিয়াবিবি ক্রমশ নিরস্ত হইয়া উৎকর্ণ হইল। জয়ার বুকফাটা চিৎকার।
হ্যাঁ, চিৎকার।
আমু বলিল, মরে গেল গো পিসি।
দরিয়াবিবি দাঁড়াইয়া রহিল জড়পদার্থের মতো। রক্তমাংসের নিচে মানুষে মানুষে সঙ্গীভূত হওয়ার যে পরিপ্লাবী উৎসধারা যুগ-যুগান্তের শিকড় উৎপাটন করিয়া নব নব সভ্যতার বীজ ছড়াইয়া যায় তারই সর্বস্বীকারহীন চঞ্চল আর্তনাদ তরঙ্গের মতো দরিয়াবিবির বুকে আছড়াইয়া পড়িতেছিল। তারই আহ্বান তো এত নিশীথ রাত্রে ঘরছাড়া করিয়া আনিয়াছে তার মতো গর্ভবতী জননীকে।
দরিয়াবিবি শৈরমীর ভিটার দিকে মুখ ফিরাইল।
আমজাদ বলিল : কোথা যাও, মা। হিন্দুদের মড়া, হিন্দুদের ঘর, সেখানে গিয়ে তুমি কী করবে?
উচ্ছ্বসিত কান্নায় বুক চাপিয়া পথের উপর বসিয়া পড়িল দরিয়াবিবি।
সকালে শৈরমীর মৃত্যুসংবাদ ছড়াইয়া পড়িল। দরিয়াবিবির কেমন মায়া বসিয়াছিল বাগদী এই রমণীর উপর। সাংসারিকতার ভিতরেও সেদিন মন হাল্কা করিতে পারিল না আজহার-পত্নী।
.
মোনাদিরের জিদেই বিকালে আমিরনের বাড়ি গেল দরিয়াবিবি।
অবেলায় মুরগী হাঁস লইয়া ব্যস্ত ছিল আমিরন। বহুদিন পরে দরিয়াবিবির আগমনে সে উৎফুল্ল হইয়া উঠিল। আম্বিয়া মোনাদিরকে দেখিয়া মুখ টিপিয়া হাসিতে লাগিল।
দুই পল্লীরমণী সংসারের খেদোক্তি জুড়িয়া দিল। মোনাদির-আমজাদ চুপ করিয়া বসিয়া থাকার পাত্র নয়। আম্বিয়ার সঙ্গে প্রাঙ্গণ ছাড়িয়া তাহারা সড়কের ধারে আসিয়া দাঁড়াইল।
পল্লীর এই অংশে গাছপালা থাকিলেও ঘন জঙ্গল মনে হয় না। আমজাদের এইজন্য এলাকাটা খুব পছন্দ। মার্বেল খেলিবার এমন সুপ্রশস্ত চত্বর অন্যদিকে নাই।
দুই ভাই খেলা করিতে লাগিল। আম্বিয়া দর্শক মাত্র।
গাব্বুর ভেতর মার্বেল পিল করিতে করিতে মোনাদির বলিল : আম্বিয়া, তুই মতবে যাস?
মখতবে যাব না কেন? বুড়ো হতে বসেছি, লেখাপড়া শিখব না?
বড় পাকা কথা। কথার চেয়ে ঝাঁঝ আরো বেশি।–আরে আমার দাদিসাহেবা। কৈ চল, কী পড়িস দেখব।
মোনাদির মার্বেল খেলা ছাড়িয়া দিল।
চলো। আম্বিয়া হাত ধরিয়া সেদিনের মতোই তাহাকে টানিতে টানিতে অঙ্গনে প্রবেশ করিল। সে পড়ার বই বাহির না করিয়া একটি ছড়ার বই বাহির করিল মোনাদিরের সম্মুখে। শিশু-পাঠ্য, সুন্দর প্রচ্ছদপট, একটি পুস্তক। ছড়া ও ছবি-পূর্ণ। মোনাদির এমন পুস্তক পূর্বে দেখে নাই। বেশ মজা পাইতেছিল সে।
তুই, এই বই পড়তে পারিস?
ঠোঁট উল্টাইয়া আম্বিয়া জবাব দিল, পারব না কেন?
একটি ছড়া মিহিকণ্ঠে সে আবৃত্তি করিতে লাগিল।
বেশ তো। এই বই পেলি কোথায়?
মখতবে রহিম বকশ চৌধুরীর মেয়ে পড়ে। তারই কোনো আত্মীয় পুস্তকটা উপহার পাঠাইয়াছে।
মন্তব্যে মোনাদিরও পশ্চাৎপদ নয়।
তুই বেশ কাজের বুড়ি। পাকা বুড়ি।
মুখ ভেংচাইয়া উঠিল আম্বিয়া : বুড়ি বলবার কে তুমি? মোটে সাত বছর বয়েস।
আমজাদ সশব্দে হাসিয়া উঠিল। অনেকক্ষণ চলিল ছড়া পাঠ। অবেলার বাতাসে শিশুকণ্ঠের গুঞ্জন।
