দরিয়াবিবি আবার জিজ্ঞাসা করিল, বাঁচবে না?
আমজাদ মাথা দোলাইল : না গো, মা।
মোনাদির তার সঙ্গে গিয়াছিল, সেও মন্তব্য সমর্থন করিল।
ঘড়া চুলোয় যাক, একবার শৈরমীর সঙ্গে কি দেখাও হইবে না! এই চিন্তা দরিয়াবিবিকে বেশি পীড়িত করিতেছিল। বাগ্দীপাড়া দূর নয়। পনেরো মিনিটের পথ। গা ঢাকা অন্ধকারে আব্রু ও পর্দা বাঁচাইয়া সে সহজেই শৈরমীকে দেখিয়া আসিতে পারে। কিন্তু আজহার রাজি হইবে কি? এই একটি বিষয়ে দরিয়াবিবি আজহারকে ভয় করে। চাষীবাসীর সংসারে পর্দার অত ঝামেলা নাই। পাড়াপড়শীদের সঙ্গে দরিয়াবিবি স্বচ্ছন্দে দেখা করিতে যায়। কিন্তু ভিন পাড়ার, বিশেষ করিয়া বাগ্দীপাড়ার ব্যাপারটা প্রকাশ হইয়া পড়িলে মুসলমান পাড়ায় আর তাদের কোনো ইজ্জত থাকিবে না।
হৃদয়ের ঐশ্বর্য জাতিধর্মের বালাই লুকাইয়া রাখে। শৈরমীর সরল প্রাণের পরিচয়পত্র যতই দরিয়াবিবির নিকট গাঁথা স্মৃতির সড়ক বাহিয়া উড়িয়া আসিতে লাগিল, সে ততই অস্থির হইয়া উঠিল। আমজাদের ছোটবেলায় একবার খুব ম্যালেরিয়া হয়। জীবনের কোনো আশা ছিল না। শৈরমী প্রতিদিন তাকে দেখিতে আসিত। একদিন সে কয়েকটি বাতাসা আনিয়া দরিয়াবিবির হাতে দিয়াছিল।
কী হবে, শরীদি?
খোকাকে খাইয়ে দাও একটা।
কিসের বাতাসা?
শৈরমী মিথ্যা কথা বলে নাই। গ্রামের বারোয়ারতিলায় শিবালয়ে সে হরির লুট দিয়া আসিয়াছে আমজাদের নামে। তারই বাতাসা। ধর্মে বাধেই তো। দরিয়াবিবির মনেও খটকা লাগিয়াছিল। মরণাপন্ন পুত্রের শিয়রে দরিয়াবিবি কারো প্রাণে আঘাত দিতে রাজি ছিল না। যদি বাছার গায়ে বদদোয়া লাগে। শৈরমীর সম্মুখেই সে আমজাদকে বাতাসা খাইতে দিয়াছিল। আল্লা কি মানুষের মন দেখেন না, যিনি সব দেখেন? অখ্যাত পল্লীর জননী-হৃদয়েও সেদিন এই প্রশ্নই বারবার জাগিয়াছিল।
প্রত্যহ শৈরমীর জীবনের বহু অধ্যায় কল্পনায় পাঠ করিতে লাগিল দরিয়াবিবি। দুঃখের দিনে প্রতিবেশীদের কাছে যে লজ্জা বিরাট দীনতার প্রকাশ, দোসর পাইলে তার চিহ্নমাত্র অবশিষ্ট থাকে না। শৈরমীর মতো দোসর দরিয়াবিবির দৈনন্দিতায় আকস্মিক আসিয়া জুটিয়াছিল।
তোর পিসি কথা বলতে পারে, আমজাদ?
বড় ক্ষীণ গলার আওয়াজ।
একবার তাকে দেখতে যেতে ইচ্ছে করে।
আমজাদও মুরুব্বি চালে বলিল, তুমি বাগ্দীপাড়া যাবে?
যেতে দোষ কী? তারা মানুষ নয়?
মোনাদির বলিল : মা, তুমি অতদূর যেতে পারবে না, তোমার এই শরীর?
দরিয়াবিবি নিজের শরীরের দিকে চাহিয়া লজ্জিত হইল। তার স্ফীত জঠর পুত্রের চোখেও ধরা পড়িয়াছে। আর এক সমস্যা। পূর্ণ গর্ভবতী একটি মেয়ে নিশাচর সাজিয়া বাগ্দীপাড়া গিয়াছে শুনিলে আজহার তাকে খুন করিয়া ফেলিবে। এই ব্যাপারে স্বামী কেউটে সাপের চেয়েও বিপজ্জনক। অথচ কত নিরীহ আজহার। এই নিরীহ লোকটি ধর্মের আচার-অনুষ্ঠানের ত্রুটি দেখিলে কেন এইরূপ রক্তোন্মত্ত হইয়া যায়, দরিয়াবিবি ভাবিতে লাগিল।
পরামর্শ ঠিক হইয়া গেল তিনজনের মধ্যে। আজহার ঘুমাইয়া পড়িলে আমজাদ, মোনাদির ও দরিয়াবিবি শৈরমীকে দেখিতে যাইবে। শুধু-হাতে রুগ্ন সখীর নিকট যাওয়া অশোভন। অন্তত দুআনা পয়সা দরকার। যা হাতটান। সে ভার গ্রহণ করিল আমজাদ। আশেজ্জানের নিকট হইতে সে দুআনা পয়সা আদায় করিয়া আনিবে।
সুযোগ আসিল সহজে। সারাদিনের খাটুনির পর আজহার ঘুমাইয়া পড়িয়াছিল সেদিন। তিনজনে গ্রামের অন্ধকার পথে পাড়ি দিল।
ফিসফিস কণ্ঠে পথ চলার সময় দরিয়াবিবি জিজ্ঞাসা করিল : আমজাদ, পথ চিনিস?
খুব। রোজ এই রাস্তা চষে ফেললাম।
মোনাদির পথটির সহিত বিশেষভাবে পরিচিত নয়, সে চুপ করিয়া রহিল।
সরু সড়কের পাশে ঘন ঝোঁপজঙ্গল। বাতাস বহিতেছিল। পিঞ্জরাবদ্ধ পাখির আকাশ বিহারের মতো নেশা লাগে দরিয়াবিবির গায়ে। ঘরের আনাচ, কানাচ, বড়জোর প্রতিবেশীদের সীমানা ছাড়াইয়া পৃথিবীকে দেখিবার খুব বেশি সুযোগ ঘটে নাই তার।
প্রহর দুই রাত্রি অতীত। চাষীদের সদরে পিদিম জ্বলিতেছে এখনও। তাসের আড্ডা চলিয়াছে বোধহয়। পথে লোকজন নাই। দরিয়াবিবি নিঃসঙ্কোচেই হাঁটিতেছিল। অন্ধকারেও সরুপথের শুভ্র দাগ চকচক করিতেছে।
শৈরমীর ঘরে ঢুকিয়া দরিয়াবিবি শিহরিয়া উঠিল। ঝুপড়ি ঘর। পুরাতন হাঁড়িকুঁড়িপূর্ণ। ময়লা মাদুরের উপর আরো ময়লা একটি বালিশ মাথায় শৈরমী শুইয়াছিল। ঘরের চারিদিকে কোনো জানালা নাই। ঝড়ের উপদ্রব জীর্ণ কুটিরের পাঁজরে সহ্য হইবে না, তাই এই ব্যবস্থা সহজে মানিয়া লয় গরিব কৃষকেরা। দম আটকাইয়া যাইতেছিল দরিয়াবিবির। তবু মমতার বিজয়ী আহ্বান সব অসোয়াস্তির চিহ্ন মুছিয়া ফেলে। শৈরমী চোখ খুলিয়া বিস্ময়ে অনেকক্ষণ চাহিয়া রহিল।
দরিয়াবিবি ডাক দিল, সই।
শৈরমী জবাব দিল না। হাত-ইশারায় উপবেশন করিতে অনুরোধ করিল। দরিয়াবিবি দ্বিরুক্তি করিল না। শৈরমীর আত্মীয়া শিয়রে বসিয়া পাখা দোলাইতেছিল।
দরিয়াবিবি জিজ্ঞাসা করিল, এখন কেমন আছে?
কোথায় ভালো, মা।
আত্মীয়া মেয়েটি ম্রিয়মাণ কণ্ঠে জবাব দিল।
আবার ডাক দিল দরিয়াবিবি : সই। কেমন আছ?
গলায় কফ জমিয়াছিল শৈরমীর। ঘড়ঘড় শব্দ হয় শ্বাসনালীর ভিতর। সে জবাব দেওয়ার চেষ্টা করিল।
নারীকণ্ঠের ক্ষীণ শব্দ শোনা গেল : ভালো-ভালো।
