অভ্যর্থনার হাসি উচ্ছলিত হইয়া পড়ে।
দরিয়াবুবুর ছেলে, দরিয়াবুবুর ছেলে, বলিতে বলিতে আমিরন আগাইয়া আসিল।
আম্বিয়া তখনও হাসিতেছিল।
কৃত্রিম ক্রোধে তার দিকে ফিরিয়া আমিরন বলিল : হতচ্ছাড়ি, হিড়হিড় করে কাকে ধরে আনলি। মাফ চা।
আত্মীয়তার যোগসূত্র আছে এই কিশোরের সঙ্গে, আম্বিয়া তা কল্পনা করে নাই।
তুমি এসেছ শুনেছি, বাবা। গরিব মানুষ, কাজকর্মে সারাদিন যায়। খেটে খেটে আর পারি না। আজ কদিন যে খাঁ-পাড়ার দিকে যাইনি।
আম্বিয়া কৌতূহল-দৃষ্টি দিয়া মা ও আগন্তুক কিশোরের গতিবিধি লক্ষ্য করিতেছিল। হঠাৎ নখে মাটি খুঁটিতে লাগিল সে।
আমিরন হাঁক দিল : এই হতচ্ছাড়ি– একদম ভিজে বেড়ালছানা বনে গেলি যে, দাওয়ায় একটা বসবার জ্যাগা দে। চলো, বাবা।
আম্বিয়া মার আদেশ নীরবে পালন করিল। মোড়ার উপর যন্ত্রচালিতের মতো বসিয়া পড়িল মোনাদির। তার পাশে বসিয়া আমিরন সংসারের কাহিনী-জাল বুনিতে থাকে।
মোনাদির এতক্ষণ মুখ খোলে নাই। আমিরন বিবি বলিল, বাবা, একদম বোবার ব্যাটা। কথা বলো। আজকে আসি, চাচি।
না, একটু বসো। কিছু খাও।
আমি ভাত খেয়ে এসেছি।
কোনো প্রতিবাদ শুনিল না আমিরন। ডোলে করিয়া সামান্য মুড়ি তাহার সম্মুখে পরিবেশন করিল।
গরিব চাচি। কিছু কি ঘরে আছে, চাঁদ। তোমার চাচা আজ দুবছর হল ইন্তেকাল করেছে। ঐ হতভাগীকে নিয়ে জ্বলেপুড়ে মরছি। কথা শুনবে না, খালি গাছতলায় ঘুরে ঘুরে বেড়াবে।
জননী-কন্যার দৃষ্টি বিনিময় হইল। ভারি গম্ভীর হইয়া গিয়াছে আম্বিয়া।
তুমি কদ্দিন এসেছো?
অনেকদিন হোয়ে গেল। মুড়ি চিবাইতে চিবাইতে জবাব দিল মোনাদির।
ফুরসৎ নেই, বাবা। সকাল থেকে কত কাজ, গাই-গরু আছে একটা। মুরগি-হাঁস, ছাগল-পাগল আর ঐ (আম্বিয়ার দিকে আঙ্গুলি নির্দেশ) পাগলী আমার সংসারে একফোঁটা দম ফেলার উপায় নেই। খাঁ-পাড়ার মুখ দেখিনি কমাস।
মোনাদির অনুভব করিল, তার নূতন চাচি অনর্গল বকিতে অপটু নন। মাথা দোলাইয়া আমিরন নিজের কথায় সায় দেয় : বেশ সুন্দোর ছেলে। আমার দরিয়াবুবু কেমন? তার ছেলে রাজপুতুরের মতো দেখতে হবে না?
লজ্জায় রাঙা হইতে থাকে মোনাদিরের কিশোর দুই কপোল।
কোনো রকমে বেঁচে আছি, খোকা। কপালে মেহনত ছাড়া আর কিছু লেখন দিয়ে আসি নি। তোমার চাচা ভালো লোক ছিলেন। তোমার এই বাপের মতো দশ চড়ে মুখ খুলত না। তার ফল আজ ভোগ করছি। দু-তিন বিঘে জমি ছিল, সব পরের গবে।
তারপর ফিসফিস শব্দে কথা বলতে বলতে আঙুল বাড়াইয়া আমিরন আঙিনার ওপারে কয়েকটি খড়ো চাল দেখাইল।
ওই যে আম্বিয়ার মেজ চাচা। একদম খান্নাস। বেওয়া মানুষ, তার দু-বিঘা মেরে নিল। ফসল দিত না, শেষে লুকিয়ে রেজেস্টারি করে নিজের জমির সাথে ঢুকিয়ে দিলে। নিক হতভাগারা, আল্লা তার ইসাফ করবে। কত কত জিনিস আনে বাবা। এতিম মেয়েটার হাতে যদি একটু ছোঁয়ায়। স্বত্যে আছে কী?
মোনাদির ম্রিয়মাণ শিশুর মতোই কাহিনী কান পাতিয়া শুনিতেছিল। আম্বিয়াও তার মত এতিম। মনের কোণায় কোণায় মৃদু নিঃশ্বাস রুদ্ধ আবেগের ঝটিকা ফুকার রচনা করে। তবুও বিদায়ের জন্য উশখুশ করিতেছিল মোনাদির।
গেল বছর বর্ষায় ঘরে একমুঠো চাল নেই। ধার করতে গেলাম। এক কুনকে চাল দিল না বেটি। একদিন উপোস করে মরি। আমার জমি নিলে, আমার পেটে দানা নেই।
আমিরনের চোখের কোণায় পানি জমিয়া উঠিতেছিল, আঁচলের খুট দিয়া মুছিতে লাগিল।
মোনাদির আসি চাচি বলিয়া উঠিয়া পড়িল। আর কেউ তোক করুণ কাহিনীর শ্রোতা। কিছুই ভালো লাগে না তার।
আনমনা সড়কের সম্মুখে আসিয়া সে পিছনে তাকাইল একবার। কখন অজানিতে পিছু পিছু আসিয়াছিল আম্বিয়া, সে লক্ষ্য করে নাই। একবার উৎকর্ণ হইল মোনাদির। হ্যাঁ, কান্নারই আওয়াজ। আমিরন চাচি মৃত স্বামীর উদ্দেশে অশ্রু বিসর্জন দিতেছিল।
১৬-২০. আমজাদ একদিন খবর আনিল
আমজাদ একদিন খবর আনিল, শৈরমীর পুত্র মারা গিয়াছে। তার পঙ্গু জীবনের অবসানে জননী অন্তত সোয়াস্তি পাইবে। দরিয়াবিবি পুত্রের সঙ্গে সেইসূত্রে নিজেদের বহু কাহিনী টানিয়া আনিল। বেচারা শৈরমী।
দরিয়াবিবি বলিয়াছিল, শৈরমীকে একবার ডেকে আনবি। মোনাদির ও আমজাদ বাগ্দীপাড়া হইতে পরদিন ফিরিয়া আসিল। শৈরমীও শরমী ও শয্যাশায়ী। প্রতিবেশীরা এতদিনে তার প্রতি কৃপাপরবশ। শৈরমীর দূরাত্মীয়া এক বিধবা ননদ তার সেবা শুশ্রূষার ভার লইয়াছে।
আরো দুইদিন কাটিয়া গেল। আমজাদ রোজই তার খবর লইয়া আসে।
আজ অপরাহ্নে আসিয়া সে বলিল : মা, শৈরমী পিসি আর বাঁচবে না।
বাঁচবে না! দরিয়াবিবি ম্রিয়মাণ মুখে পুত্রের দিকে চাহিয়া রহিল।
না গো, মা। একে পাতলা চেহারা, রোগে-শোকে বুড়িকে চেনা যায় না।
দরিয়াবিবি এই বাগদী রমণীর সখিত্বের বহু স্মৃতি স্মরণপথে টানিয়া আনিল। বন্ধক ঘড়াটি আর ছাড়ানো হয় নাই। মাসে সংসারের খরচ বাড়িতেছে। আয়ের সংস্থান কোথায়? চন্দ্র কোটাল নূতন কোনো ব্যবসা দিবার আয়োজন করিতেছে। মূলধনহীন কোনো ব্যবসা আরম্ভ করা যায় কিনা। কয়েক মাসে শুধু যুক্তি-পরামর্শই সার হইয়াছে। দরিয়াবিবি ভাবিল, সন্ধ্যায় একবার দেখা যাক, ঘড়া ছাড়ানোর টাকাটা যদি কোথাও থেকে যোগাড় করে আনতে পারি। প্রাচীন সামগ্রী ঘরছাড়া হইবে। কিন্তু শৈরমী কার কাছে বন্ধক রাখিয়া আসিয়াছে, সে জানে না।
