এই খোকা
কোনো না বর্ষিয়সী নয়, একটি কচিমুখ কলাপাতার আড়াল ফাঁক করিয়া মৃদু ঠোঁট সঞ্চালন করিতেছে।
বালিকার মুখের একাংশ মাত্র দেখা যায়। মরা কাঁঠালগাছের গুঁড়ির উপর বসিয়া সে আড়াল হইতে কেবল মুখটি বাহির করিয়া দিয়াছিল। আকাশের আলোয় মুখাবয়বের ডান দিক শুধু আলোকিত।
কোনো জবাব যোগাইতেছিল না মোনাদিরের মুখে। এমন অবস্থায় বালিকা তাকে যথেষ্ট সাহায্য করিল।
কোন্ পাড়ার ছেলে?
আমতা আমতা করিয়া জবাব দিল মোনাদির : ঐ পাড়ার। অঙ্গুলি নির্দেশ করিতে সে বিস্মৃতি হইল না।
ঐ পাড়ার।
ফিকফিক করিয়া মেয়েটি হাসিয়া উঠিল। –ঐ পাড়ার নাম নেই?
তোমার নাম আছে?
বড় মুখরা তো মেয়েটা। মোনাদির রাগিয়া উঠিয়াছিল মনে মনে।
আমার নাম নেই, তোর নাম আছে? তোর শব্দটাতে বেশ জোর দিয়াছিল সে।
আমার নাম আছে, তোমার নামও আছে।
মোনাদির জিভ ভাসাইয়া শব্দ করিল : আমার ..না..ম আছেই– তারপর জিভ যদূর সম্ভব বাহিরে প্রসারিত করিয়া বলিল : তোর নাম আছে?
ভারি বজ্জাত ছেলে তো। কাদের ছেলে রে?
মোনাদির আবার ব্যঙ্গ করিল। বেড়ায় আড়াল ফাঁক করিয়া গুঁড়ির উপর সে সশরীরে বাহিরে আসিল। মোনাদির দেখিল ফালি পরা একটি সুডোল তনু, বছর নয় কী দশের বালিকা। চুলগুলি এলোমেলো পিঠের উপর দোল খাইতেছে। মুখটি গোলাকার, গৌর রঙের উজ্জ্বলতা-উচ্ছল। টানা চক্ষুতারকা চড়ুই পাখির মতো জ্বর নিচে চঞ্চলতায় অস্থির।
কাদের ছেলে রে? মেয়েটি ভেংচি দিতে বিলম্ব করিল না। মোনাদির এবার রীতিমতো রাগিয়াছিল। পথের উপর ঢেলা ইত্যাদি কিছু না পাইয়া আক্রোশে সে ফুলিতেছিল।
দেবো পা ধরে নিচে ফেলে চিৎপটাং।
মেয়েটি তাড়াতাড়ি পা গুটাইয়া ভেংচি কাটিয়া বলিল, আমার পায়ে সালাম করবি নাকি?
মোনাদির হাতের তালুর ভিতর অন্য হাতের মুঠি কচলাইতে লাগিল।
দেবো পা ধরে ফেলে।
দাঁড়া তো রে বজ্জাত, বলিয়া মেয়েটি গাছের গুঁড়ি হইতে বেড়ার আড়ালে অদৃশ্য হইয়া গেল। তার পদধ্বনি শোনা যায়। ভয় পাইল মোনাদির। সে ছুট দিল এইবার সড়কের সোজাসুজি।
পশ্চাতে বালিকাকণ্ঠের ডাক শ্রুত হয় : এই খোকা, শুনে যাও কিছু বলব না তোমাকে
মোনাদির আবেদনে কোনো সাড়া দিল না। ভীত-ত্রস্ত সে। কিছুদূর গিয়া গাছের কোলজোড়া অন্ধকারে থামিয়া একবার পশ্চাতে চাহিল। অস্পষ্ট ছায়ামূর্তি আলুলায়িত কুন্তলা চকিত-দেখা কিশোরী দাঁড়াইয়া রহিল। হ্যাঁ, সে-ই তো। ভুল হয়নি কিছু।
কেমন যেন মনমরা হইয়া বাড়ি ফিরিল মোনাদির।
.
১৫.
পরদিন দুপুরে আহার সমাপ্তির পর মোনাদির কৌতূহলবশত পাড়ার পথে বাহির হইল। গত সন্ধ্যায় আবছা-দেখা সড়কের জগৎ। আজ দুপুরে চারিদিকে আমনা দৃষ্টি ছড়াইতে তার কাছে নূতন ঠেকিল সবকিছু। হারানো পথরেখা নূতন করিয়া সন্ধান করিতে লাগিল সে।
দুপাশে তালপাতার বেড়া। মাঝখানে শুষ্ক কাঁঠাল গাছের গুঁড়ি। জায়গাটা চিনিতে বেশি বিলম্ব হইল না। অবাক হইয়া মোনাদির অবলোকন করিতে লাগিল চারিদিক। কীট পতঙ্গের ক্ষুদ্র জীবনলীলা। শুষ্ক কাঠের সেতু বাহিয়া একদল পিপীলিকা আহার মুখে অগ্রসর হইতেছে। ক্ষুদে লাল পিঁপড়ের সারি ছোঁড়া ঘুড়ির সূতার মতো যেন বাতাসে কাঁপিতেছে। আঁকাবাঁকা গতি একটি তালপাতার আড়ালে অদৃশ্য হইয়া গিয়াছে।
মোনাদির একবার দৃষ্টি অন্যদিকে ফিরাইল। জোড়া সুপারিগাছের ওধারে গেরস্থ বাড়ি। ডিডিগ শব্দে একটি খুদে পাখি তেঁতুলবনে পতঙ্গ সন্ধান করিতেছিল।
এই, কাদের বোকা ছেলে রে। বালিকা কণ্ঠের ডাক। হঠাৎ ভয় পাইয়া মোনাদির পেছনে ফিরিবে কী, আর একটি কোমল হস্তে সে বন্দী। গত সন্ধ্যায় দেখা সেই বালিকাই। তার হাত চাপিয়া ধরিয়াছে। মোনাদির প্রস্তুত ছিল না। মেয়েটি হাত ধরিয়া তাকে টানিতে টানিতে গেরস্থবাড়ির দিকে অগ্রসর হইতেছিল। মাকড়শার জালে যেন প্রতিবাদ করিবার অবসর নাই, দুমিনিটের ভিতর ভোজভাজির মতো কী যেন ঘটিয়া গেল। আর একটি গেরস্থর আঙিনায় সে এতক্ষণে অপরাধীর মতো দাঁড়াইয়া আছে।
ও মা, শিগ্গির বেরোও, দেখো কাদের ছেলে।
খিলখিল শব্দে হাসিতেছিল মেয়েটি।
কিরে আম্বিয়া।
আঙিনার সম্মুখে একটা খোড়ো চালের ঘর, তার দাওয়া হইতে একজন মেয়ে জবাব দিল। সে ঘরের দেওয়ালের মাটির ছোপ দিতেছিল।
আম্বিয়া আর একবার সমস্ত হাসি নিঃশেষ করিয়া দিল।
কী চুরি করবে বলে আজ বেলাবেলি বেরিয়েছে, মা।
মেয়েটি কর্মব্যস্ত। সে একবার এইদিকে চাহিয়া কাজ বন্ধ করিল।
আম্বিয়া, কাদের এমন সুন্দর ছেলে?
হাসির স্রোতে ভাটা নাই।
সুপুরিগাছের কাছে দাঁড়িয়েছিল, ধরে এনেছি।
লালমাটি মাখা ন্যাকড়া হাতে মেয়েটি দাওয়া হইতে নামিয়া আসিল। আম্বিয়ার মার নাম আমিরন।
খোকা, কোথায় থাকো?
এমন ভ্যাবাচ্যাকা খাইয়া যাইবে মোনাদিরের মতো চটপটে ছেলে, বিশ্বাস করা যায় না। আজ তার কণ্ঠে বাক্য হোঁচট খাইতেছিল।
আ-মি- খাঁ-পাড়ায় থাকি।
আমিরন বদনার পানি লইয়া হাত ধুইয়া ফেলিল। খা-পাড়ার কার ছেলে?
মোনাদির সঙ্কোচে মিশিয়া যাইতেছিল মাটির সঙ্গে। আর যা-ই হোক, আজহার খাঁ তার পিতা নয়।
আমার মা দরিয়াবিবি।
আমিরন দরিয়াবিবির চেয়ে বয়সে বড়। প্রৌঢ়ত্বের ছাপ মুখাবয়বে স্পষ্ট। রোগা শরীর। গাল দুটি সুষমায় উজ্জ্বল হইলেও, বয়সের দাগ পড়িয়াছে। একরকমের কৃত্রিম গাম্ভীর্যে তার মুখোনি ছাওয়া।
