দরিয়াবিবি কোনো প্রতিবাদ কানে তুলল না।
দ্যাখ দিকি বাবা, গায়ে কালো কালো দাগ পড়ে গেছে। অত ঘন জঙ্গলে আর যেয়ো না। বড় বড় সাপ আছে।
কী সাপ আছে, মা? আমজাদ জিজ্ঞাসা করিল।
খুব বিষ সাপের, জাতসাপ আছে।
মোনাদির হাসিয়া উঠিল–হ্যাঁ, সাপ আছে হাতি। কই, আমরা একটা সাপের লেজও দেখিনি।
আমজাদ হাসিতে যোগ দিল।–মা, বড়ভাই সাপের লেজ দেখেনি। সাপ কাটলে লেজ খসে যায়। না,মা?
হ্যাঁ।
মোনাদির বিশ্বাস করে না এই প্রসঙ্গ।
হ্যাঁ, কাটলে লেজ খসে না ঘোড়ার ডিম। আমার চাচার একটা বেড়ে কুকুর ছিল, সে এত লোককে কেটেছে, তার লেজ একদম থাকত না তা হলে।
দরিয়াবিবি এতক্ষণ গম্ভীর হইয়াছিল, সেও উচ্চহাস্যে পুত্রদের আসরে যোগদান করিল।
আরে আমার বোবা ময়না, কুকুরের আবার লেজ খসে!
মোনাদির গা চুলকাইতে চুকাইতে বলিল, তবে যে আমু বলে।
তোর গা কুটোচ্ছে? জিজ্ঞাসা করিল দরিয়াবিবি।
না, মা।
তবু আমার কাছে লুকোবে?
মোনাদির সস্নেহে হঠাৎ মার কোমর জড়াইয়া আমজাদের দিকে আঙুল বাড়াইল।
ঐ তো আমাকে নিয়ে গেল।
কৃত্রিম কোপনদৃষ্টি প্রতিভাত হয় দরিয়াবিবির।
আমজাদ অভিমান করিয়া বলিল, তোমার সঙ্গে আর যদি কোথাও যাই, মুনিভাই–
পরদিন আমজাদ তার প্রতিজ্ঞা ভঙ্গ করিল। স্কুলের ছুটির পর দুইজনেই গ্রামপথে ঘুরিয়া বেড়াইল। অন্যান্য ছেলেরা স্কুলের গ্রাউন্ডে ফুটবল খেলে, মোনাদির সেখানে থাকতে চায় না। ভয়ানক ছোট হইয়া যায় সে অন্যান্য পড়য়াদের নিকট। তাহাদের বেশভূষা স্বতন্ত্র, পরিচ্ছেদে চিক্যতা থাকে। মোনাদির আমজাদের সঙ্গ-মাধুর্যে তাই পরিতৃপ্তির আস্বাদ পাইয়াছিল।
আজও স্কুলের ছুটির পর দুইজনে মাঠের দিকে চলিয়া গেল। চন্দ্র কোটাল বাড়ি নাই, ফসল লইয়া গঞ্জে গিয়াছে– সেখানে ভালো জমিল না। আমজাদ মজা খালের একটি ধারে কতকগুলি চিলের পালক কুড়াইয়া মোনাদিরকে উপহার দিল। ভালো কলমের কাজ চলিবে।
সন্ধ্যার পূর্বে লুকোচুরি খেলার সময় মোনাদির আমজাদের সঙ্গচ্যুত হইল। দুইজনে খেলার মাতামাতিতে পথ হারাইয়া ফেলিয়াছিল। আমজাদের সঙ্গে দেখা না হইলেও মোনাদির বেশি বেগ পায় নাই। একটি বাঁক ফিরিতেই পরিচিত পথ দেখিয়া সে পুলকিত হইয়া উঠিল। ওই শীর্ণ রাস্তাটি শাদা ফিতের দাগৈর মতো আঁকাক সমন্বয়ে পাড়ার ওদিকে মিশিয়া গিয়াছে। দুইপাশে শুধু নানা রকমের গাছ। সন্ধ্যা আসন্ন। ভয়াতুর মসৃণ অন্ধকার জমিয়া। উঠিতেছে খানাখোন্দলে, পত্রপুঞ্জের অনাবৃত বুকে। শাদা ঘাস ধূসরিমায় শিহরিয়া উঠিতেছে। পথের কিনারায় কেঁচো-মাটির দাগ, পায়ের আঙুলে অস্তিত্বের প্রমাণ জানায়! কত ক্ষুদ্র টিলা! মোনাদিরের দৃষ্টি মিশিয়া যায় চারিদিকে। বোবার মতো বিস্ময়ে সে চাহিয়া থাকে।
একটু আগাইতেই পাতে মাদারের ঘন বেড়া চোখে পড়িল। নিচে কেবল লতার উলঙ্গ মূল, উপরে পাতার নীল আভরণ। পাশে একটি পানাছাওয়া ডোবা, জলের আলোড়ন-ধ্বনি শোনা গেল। কৌতূহলে মোনাদির উবু হইয়া দেখিতে লাগিল সূর্যের লালিমা ডোবার উপর। রঙিন ঘাটের পৈঠায় একটি পিতলের কলস, গ্রাম্য কোনো বধূ স্নান করিতেছে। তার গৌর মুখ দেখা যায়।
অন্ধকার হইয়া আসিতেছে, এই ভয়ে মোনাদির পদক্ষেপ দ্রুত করিল। পুরাতন বড় আমের গাছ পড়িয়াছিল, গুঁড়িসহ একটি মোটা ডাল পথের সহিত মিশিয়া রহিয়াছে। মালিকেরা সামান্য ডালপালা কাটিয়া লইয়া গিয়াছে, ধড়টি এখনও বর্তমান। ফাঁকড়া ডালের উপর বসিয়া মোনাদিরের দুলিতে ইচ্ছা করে। সময় নাই। আরো অন্ধকার হইয়া গেলে ঘরে ফেরা দায় হইবে। কয়েক পা আগে একটি শূন্য ভিটে, পথ এখানে সামান্য উত্রায়ের রূপ গ্রহণ করিয়াছে। ভিটার তিনদিকে আমগাছের পাহারা; ফাঁক দিয়া দূরে সন্ধ্যাকাশের স্নান অঙ্গনে হলুদ রঙের মতো মেঘ! মোনাদির দেখিয়া অবাক হইয়া গেল। তার চোখে শূন্যতার এই আকার জ্ঞানরাজ্যের কোনো বাতা বহিয়া আনে না; তবু অসোয়াস্তি অনুভব করে সে। আবার ঢালু-পথ সমান্তরাল কয়েক বিঘা মাত্র। এইটুকু শেষ হইয়া গেলে সে পাড়ার অন্দরে ঢুকিয়া পড়িবে। এইখানে সে হাঁটিয়াছে আরো কয়েক দিন, কৌতূহলের নেশা আর এমন কোনদিন চাপিয়া বসে নাই। অন্ধকার প্রলেপ টানিতেছে ধরিত্রীর উপর মেঘের আলোয় সাদা পথের রেখা মুছিয়া যায় না। পানা-ভরা একটি ক্ষুদ্র পুষ্করিণীর পাড়ে বাঁশবনে নীড়-প্রত্যাগত বকের দল গুলতান করিতেছে। শাবকগুলির কক কক শব্দে উত্যু হয় মোনাদির। পুকুরের পাড়ের কোণে জীর্ণ কয়েকটি সুপারি গাছ, পাশে গোয়ালঘর। একটি বাছুর হাম্বার ছাড়িতেছে। সড়কের পাশে, ইহার পর তালপাতার বেড়ার রেখা। ওদিকে গেরস্থদের সায়ং-জীবন শুরু হইয়াছে। জমাট ধোঁয়া উঠিতেছে গাছপালার ভিতর দিয়া।
দ্রুত হাঁটিতেছিল মোনাদির। বেড়ার উপর শুষ্ক কলাপাতার দোদুল রেখামূর্তি, বাতাসে দুলিতেছে। হঠাৎ পথের পাশে খরখর শব্দ হইল। ভয় পাইয়াছিল প্রথমে,পরে সে কৌতূহলবশত থমকিয়া দাঁড়াইল। সাপ-খোপ নয় তো! এইখানে একটি শুষ্ক কাঁঠালগাছ বেড়ার খুঁটিরূপে ব্যবহৃত হইয়াছে। আবার শব্দ হইল। মোনাদির দৌড় মারিবার জন্য পা তুলিয়াছে!
এমন সময় বালিকার কণ্ঠের সাবধানবাণী শোনা গেল : এই খোকা–
মোনাদির ভাবিল কোনো বর্ষীয়সী বোধহয় তার গতিবিধি লক্ষ্য করিতেছে। দৌড় বন্ধ করিয়া সে বেড়ার দিকে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিপাত করিল।
