সাকেরের মা ঘরে ঢুকিতে গল্পস্রোত মন্দীভূত হইয়া গেল।
মোনাদিরকে লক্ষ্য করিয়া সে বলিল, বেশ ছেলে বৌমা। থাকো ভাই-মার কাছে। পর কী কখন আপন হয়?
মোনাদির এই কাহিনী শুনিতে প্রস্তুত ছিল না।
সাকেরের মা বকিয়া যায় : জানো বৌমা, একেই বলে খুনের টান। চাচা সোনাদানা দিয়ে মানুষ করত, শেষে একটা শ্লেট ভেঙে ফেলেছিল তা সইল না। তোমার চাচা কী করে, ভাই?
মোনাদির স্তব্ধ হইয়া যায়।
থাকো, মায়ের কাছে থাকো। পাঁচ-সাত বছর মায়ের কাছ-ছাড়া বলে কি আর মা পর হয়ে যায়?
ভয়ানক বিরক্ত হয় মোনাদির মনে মনে। হাসুবৌ শাশুড়িকে দজ্জাল আখ্যা মনে মনেই দিতে থাকে। কাঠকুড়োনী বুড়ি বলিলে তবে আমজাদের গায়ের রাগ যায়।
সাকেরের মা কোন সাড়া না পাইয়া বকর বকর করিতে করিতে চলিয়া গেল। আবার ভাঙা আসর নূতন করিয়া জমিয়া উঠিল।
সাকেরের ঘরে আসবাবপত্র বিশেষ নাই। তৈজসপত্রই বেশি। এককোণে একটা বড় তক্তপোশ পাতা। তারই উপর একদিকে দেওয়ালে ঠেস দিয়ে হাসুবৌ উপবিষ্ট। বই হাতে মোনাদির। বালিশের আড় হইয়া শ্রোতারূপে আমজাদ।
আলীবাবা ও চল্লিশ দস্যুর কাহিনী পাঠ করিতেছিল মোনাদির। কাসেম রত্নগুহার মধ্যে আবদ্ধ। বাহিরে আসিবার মন্ত্র সে ভুলিয়া গিয়াছে। সিসেম খো এইটুকু শব্দ মোনাদিরের মুখে–আবার তাকে পাঠ থামাইতে হইল। সাকের চাচা ঘরে ঢুকিয়াছে।
কিগো চাচারা, গল্প পড়া হচ্ছে?
জি।
হাসুবৌ মাথায় ঘোমটা টানিয়া দিল। গৃহে প্রবেশকতার দিকে তার চোখ সজাগ।
মোনাদির জিজ্ঞাসা করিল, কোথায় যাবে চাচা?
দাঙ্গার খবর আছে, লাঠি নিতে এসেছি। কোণে তার তৈল-চিক্কণ লাঠির উপর সকলের নজর গেল।
হাসুবৌ মেঝের উপর দাঁড়াইয়া অনুরোধ করিল : না, কোথাও যেতে হবে না।
না, আগাম টাকা নিয়েছি। গম্ভীর কণ্ঠ সাকেরের।
মোনাদিরও চাচির পক্ষ গ্রহণ করিল।
না চাচা, সন্ধ্যায় আমাদের খেলা শেখাবে। আজ কোথাও যেও না।
আমজাদ ওকালতির প্রথম দীক্ষা গ্রহণ করিল। লাঠি-হাতে সাকের কিছুক্ষণ দাঁড়াইয়া রহিল। হাসুবৌর শান্ত-গম্ভীর মুখ তার চোখে পড়িয়াছিল বৈকি। কিশোর বালকগুলির জিদ বোধহয় জীবনে তাকে প্রথম জিদ-ছাড়া করিল।
বেশ, তোমরা গল্প করো। বলিয়া সাকের চলিয়া গেল।
গল্প আর পড়া হইল না। হাসুবৌ নিজেই গল্প করিতে লাগিল। মোনাদিরকে কত স্নেহ-মমতায় ডুবাইয়া রাখিতে চায় সে।
বেশ খোকা, বলিয়া হঠাৎ বিছানার উপর শায়িত মোনাদিরকে বুকে জড়াইয়া বারবার চুম্বন করিতে লাগিল। মাতৃস্নেহ যেন নূতন আধার পাইয়াছে।
মোনাদির নিশ্বাস ফেলিতে পারে না। তার ডাগর চোখ, সুন্দর গৌর কচি-ঠোঁটে যুবতীর ওষ্ঠ বিস্বাদ আনে একরকমের।
বাড়ি ফিরিবার পথে মোনাদির আমজাদকে জিজ্ঞাসা করিল : এই, হাসুবৌ চুমু খায়, না কামড়ায় রে?
কেন? অবোধ বালকের মতোই প্রশ্ন করিল আমজাদ।
এই দ্যাখ না, আমার গালে কত দাঁতের দাগ।
.
১৪.
এই গ্রাম মোনাদিরের খুব ভালো লাগে। শূন্য ভিটা, ছোটখাটো তরুলতার জঙ্গল, বনানীর নিচে কোথাও কোথাও সরু পথ–তার মন আকর্ষণ করে। লুকোচুরি খেলার এমন জায়গা তাদের গ্রামে ছিল না। এই পার্থক্যটুকু তার মনোহরণ করে।
আমজাদও আজকাল ঘর-পলাতক। দুইজনে বাউণ্ডেলের মতো গ্রাম তন্নতন্ন করিয়া বেড়াইতে লাগিল। আমজাদও ধীরে ধীরে দুঃসাহসী হইয়া উঠিয়াছে। বাড়ির ফাঁই ফরমাশ পূর্বের মতো সম্পন্ন হয় না। দরিয়াবিবি মাঝে মাঝে খুব চটিয়া যায়। কিন্তু মোনাদির সম্বন্ধে সে খুব সচেতন। পাছে এতটুকু অনাদর-অবহেলার জন্য তাকে হারাইতে হয়। মোনাদিরের স্বভাব এমনিই বেপরোয়া, মাথার উপর তন্বি করিবার লোক নাই, এই সুযোগে সে আরো বেপরোয়া হইয়া উঠিল।
গোরস্থানের জঙ্গলের পশ্চিমদিকে খেজুরগাছের সংখ্যা অনেক। নীল থোকা-থোকা কাঁচা খেজুর পাক ধরিতে এখনও দুইমাস। অত ধৈর্য বালকদের নাই। আমজাদের সহিত যুক্তি করিয়া মোনাদির একদিন এক কাঁদি কাঁচা খেজুর কাটিয়া আনিল। তার জন্য অসীম দুঃসাহসের দরকার। বেতবনের ঘন ঝোপে বিষাক্ত সাপ থাকা বিচিত্র নয়। তা ছাড়া বুনোলতায় গা-হাত এমন কুটোয় যে অনেকেই খেজুর পাকিলেও এদিকে পা বাড়াইতে সাহস করে না।
মোনাদির পথপ্রদর্শক। লতাগুল্ম ফাঁক করিয়া সে অগ্রসর হইয়াছিল। বুনোলতার স্পর্শ সে প্রথমে সহ্য করিয়াছে। কিন্তু আমজাদের গা কুটাইতেছিল ভয়ানক। জঙ্গল হইতে বাহির হইয়া সে কাঁদিয়া ফেলিল। মোনাদির অগ্রজের মতোই তাকে শান্ত করিল। কিন্তু ঘরে দরিয়াবিবি ক্ষোভে আশঙ্কায় স্তব্ধ হইয়া গেল।
দুজনে আমার মাথা খেয়ে ছাড়বি কোনোদিন। পয়পয় করে মানা করেছি, কবরস্থানের দিকে যাসনে বাবা–বাবারা কান কুলো করে বসে থাকবে।
দুই ভাই কোনো জবাব দিল না। দরিয়াবিবি গরম পানিতে গামছা ভিজাইয়া পুত্রদের গা মুছাইয়া দিল।
মুনিভাই বললে, কাঁচা খেজুর খেতে খুব মজা।
আমজাদ মাকে বলিতেছিল।
মোনাদির প্রতিবাদ করিল : আমি বুঝি বলেছি মজা। খুব কষা।
আড়চোখে মোনাদিরের দিকে অপ্রসন্ন দৃষ্টিপাত করিয়া আমজাদের গা মুছাইতে লাগিল পুনরায় দরিয়াবিবি। মোনাদির তখন মৌন। দরিয়াবিবি ইহা লক্ষ্য করিয়া আবার মোনাদিরের দিকে দৃষ্টি ফিরাইল।
আয় মুনি, তোর গা-টা আবার মুছে দিই।
অভিমান-ক্ষুদ্ব কণ্ঠ মোনাদিরের : না থাক, আমার গা আর কুটোয় না।
