চন্দ্রমণি ডাকিল : ও দাদা, পায়ে পড়ি, নামিয়ে দাও। পরের ছেলে পড়ে গেলে জোরে হাঁকিল চন্দ্র, পড়ে গেলে পণ্ডিত হয়ে যাবে।
মোনাদির এইবার খিল খিল করিয়া কাঁধের উপর হাসিতে লাগিল।
ও বাবা–থানার কাছে এসে চোরেদের আবার হাসি দ্যাখো, চলো, চাচির থানায়, খাওয়াবে লাল আলু।
আমজাদও হাসিতে থাকে।
চন্দ্রমণি বলিল, দাদা, ভিটের উপর কাঁধে নিয়ে চড়ো না, তোমার ঘাড়টা ভাঙবে
খামাখা ভাঙবে। অবিশ্বাসের হাসি হাসিয়া দুই-তিন লাফে চন্দ্র একদম ঢিবির শীর্ষে পৌঁছিল।
কোটালের কাঁধ হইতে নামিয়া মোনাদির বড় লজ্জিত হয়। এই মাঠে সে আর কোনোদিন আসে নাই। অপরিচিত জায়গা বলিয়া সে বিব্রত, নচেৎ অন্য কোনো খটকা। তার মনে নাই।
চোখ নামাইয়া গান করিতে লাগিল কোটাল। এলোকেশী চন্দ্রমণির উপর কৃত্রিম ক্রোধ প্রকাশ করিয়া বলিল : ঠাকুরঝি, তোমার মাথায় রাজ্যের উকুন।
দাদার মগজে আর বোনের মাথায়।
গান থামাইল চন্দ্র।
আমার মগজে? কই, বেছে দাও না।
তখন এলোকেশীর হাসি থামে না।
মাথায় ঝাঁকড়া চুল, মগজ দেখা যাবে কেন?
একটি মুগুর পড়িয়াছিল উঠানে। সেটি নির্দেশ করিয়া চন্দ্র কপট-কোপন জবাব দিল।
ঐটা দিয়ে দাও এক ঘা। মগজ বেরিয়ে যাক।
চন্দ্রমণি ভারি রাগিয়া যায়।
দাদা, তোমার মুখে যা আসে তাই বলো, ভারি অনাছিষ্টি।
নে, আবার নাকিকান্না। লাল আলু থাকে তো ছেলেগুলিকে খাওয়া।
আমজাদ যোগীন-গোপালকে চেনে, সে দৌড়াদৌড়ি শুরু করিয়া দিল বাস্তুর উপর।
হুঁকা-কল্কের সদ্ব্যবহার করিতে লাগিল চন্দ্র।
লাল আলু আনিয়াছিল কোটাল গঞ্জ হইতে। এলোকেশী বাঁশের ডোলে মুড়ি ও সেদ্ধ আলু মোনাদির-আমজাদকে খাইতে অনুরোধ করিল।
বড় লাজুক মোনাদির এইসব ব্যাপারে। তবু ধীরে ধীরে ঠোঁট সঞ্চালন বন্ধ থাকে না।
কোটালের চোখের তারা বারবার নাচে।
মিষ্টি আলু খাও যত পারো, আর গাছের কাছে যেও না। এবার ঠিক খোঁয়াড়ে দিয়ে আসব।
গোপাল মামার কথার প্রতিবাদ করিল, লোককে আবার খোঁয়াড়ে দেয়, মামা!
দেয় বাবা, দেয়। আমজাদের দিকে ফিরিয়া কোটাল বলিল, তোমার বাবাকে খোঁয়াড়ে রেখে আসব। ভারি ঘর ছেড়ে পালায়।
ধেৎ।
আমজাদ মুড়ি চিবাইতে চিবাইতে ঠোঁট বাঁকাইল। মোনাদির মুচকি হাসিল শুধু। বেলা-শেষ ধরিত্রীর বুকে সন্ধ্যার পূর্বরাগ শব্দে-বর্ণে-কুহর-কূজনে। ভিটার উপর হইতে দূরান্তের আবছা গ্রামগুলি এমন দেখা যায়, মোনাদির কোনোদিন কল্পনা করে নাই। লাল আলু মুখে দিতে দিতে সে আনুমনা হইয়া যায়। তার সুন্দর ডাগর চোখের চাহনি নিকটস্থ কোনো বস্তুর উপর ক্ষণেকের জন্য আলোকতরঙ্গ ছড়ায় না। ছবির মতো স্তব্ধ তালগাছের সারি, নিচে শাদা গেঁয়ো পথ, হয়তো দুএকটি পথিক, পথশ্রান্ত শাদা বাছুর, মেঘ আর পাখির ঝাঁক, তার বালকমনের পর্দায় বিচিত্রার ইশারা রাখিয়া যায়।
চন্দ্র সকলের সঙ্গে তুড়ি দিয়া জমাইতেছিল। আনমনা কেবল মোনাদির।
মুনিভাই, সাঁঝ হয়ে এল, চলো বাড়ি যাই। আমজাদ তার চমক ভাঙাইল।
আর একটু বস্ না। চাঁদনী রাত আছে, না-হলে চন্দর চাচা পৌঁছে দিয়ে আসবে।
অসম্মতি জানাইল চন্দ্র। না চাচা, আমার অনেক কাজ। গরু-বাছুর, তোলা হয়নি। এই শীতে মুগরী-পাংগুলো রাখতে হবে। জোয়ার আসতে বেশি দেরী নেই।
আমজাদ কহিল, মরা গাঙে মাছ পড়ে?
চন্দ্র : না চাচা, রান্নাটা চলে যায়।
মোনাদিরের গায়ে শার্ট ছিল। বাতাসে শীতের আমেজ তাকে তেমন কাবু করে না।
আমজাদের জন্যই অগত্যা উঠিতে হইল। অন্ধকার হইয়া গিয়াছে দূর গ্রাম-সীমানা। গৃহবাসীর স্নেহের প্রতীক্ষায় গোঠে বাঁধা গাই হাম্বা-স্বরে আবেদন জানাইতেছিল।
দুই কিশোর হৃষ্টমনে গাঁয়ের পথ ধরিল। মোনাদির যেন বোবা হইয়া গিয়াছে। মাঠের এই বিস্তীর্ণ এলাকায় তো সে কোনোদিন আসে নাই।
হঠাৎ সে মুখ খুলল : চন্দর চাচা একটা পাগল।
আব্বাও ওই কথা বলে।
কিশোর-মনের সিদ্ধান্ত এত সুনিশ্চিত যে, প্রৌঢ়জনও হার স্বীকার করিবে–এই সাফল্যের গৌরবে যেন দুই ভাই খিলখিল শব্দে হাসিতে লাগিল।
আমজাদ বলিল : মুনিভাই, তুমি গান জানো না?
গান আমি গাইতে পারি, লজ্জা করে।
একটা গান গাও, মুনিভাই।
মোনাদির চাচার আশ্রয়েও কারো তোয়াক্কা রাখিত না। রাত্রে সকলে ঘুমাইয়া গেলে, সে গঞ্জের যাত্রাশালে সারারাত্রি কাটাইয়া দিত। তবি চলিত পরদিন।
মোনাদির রামপ্রসাদী বাউল ঢঙের গান আরম্ভ করিয়াছিল। তার অর্থ সে আদৌ বোঝে না। কণ্ঠের মিষ্টতায় কেবল মূৰ্ছনা অপূর্ব পুলকাবেশ সৃষ্টি করে কিষাণ-পল্লীর প্রেয়সীদের বুকে। আমজাদ জানিত না মোনাদিরের কণ্ঠ এত মিষ্টি।
মুনিভাইয়ের প্রতি তার শ্রদ্ধা আরো বাড়িয়া যায়।
গান শেষ হইলে সে বলিল : মুনিভাই, তুমি চন্দ্র চাচার কাছে গান শেখো না কেন?
গান জানে চন্দ্র চাচা?
ভাঁড়-নাচের দল ছিল, আর গান জানে না? শুনলে না, কেমন গায়?
বেশ, ভালো লাগে। আমি বলব আর একদিন।
আব্বা কিন্তু গান পছন্দ করে না। বলে, ওসব শিখলে মানুষ খারাপ হয়ে যায়।
দূর-র-র! আমি কিন্তু গান শিখব।
আমজাদ মাথা দোলাইয়া অন্ধকারে সায় দিল।
.
পরদিন পড়ন্ত দুপুরে হাসুবৌর ঘরে আড্ডা জমিয়াছিল।
মোনাদিরের মতে, চন্দ্র কোটাল নামে এই গ্রামে একটি পাগল আছে। তার কাহিনী ফলাও করিয়া সে বর্ণনা করিতেছিল। আমজাদও এই বিষয়ে একমত। হাসুবৌ তো অন্য কোনো মতই দিতে পারে না।
