তবু মোনাদির এই সংসারে এক ব্যাপারে অনাত্মীয়। দারিদ্রের কোনে ছায়া তার। চোখে পড়ক, দরিয়াবিবি তা পছন্দ করে না। স্বামী-স্ত্রী ফিফিস্ করিয়া দেনা-পাওনার কথা বলে। ঘরে চাল বাড়ন্ত হইলে দরিয়াবিবি পূর্বের মত আর হৈ-চৈ করে না স্বামীর সঙ্গে। পাছে কথাটা মোনাদিরের কানে পড়ে। হয়তো তার ফলে একদিন আবার চলিয়া যাইবে সে। পরাশ্রিত, তবু নিশ্চয় এমন গরীব হালে সেখানে মোনাদির দিন কাটায় নাই। আজহার খাঁর লুঙি ছিঁড়িয়া গিয়াছিল। নামাজ শুদ্ধ (সহীহ) হয় কি না সন্দেহ। সিজদার সময় হাঁটু বাহির হইয়া পড়ে। সে নিজে লুঙি না কিনিয়া মোনাদিরের হাফপ্যান্ট ও শার্ট কিনিয়া দিল। বালক হইলেও মোনাদির সংসারের শ্রী সম্পর্কে সচেতন। মার অনাত্মীয়ভাব সে কোনোদিন তলাইয়া দেখে নাই। মার সঙ্গীই তো আশীবাদের সমান। অন্য কিছু নিষ্প্রয়োজন।
মোনাদিরের সবচেয়ে ভাব হাসুবৌর সঙ্গে। মাত্র কয়েকদিনে এমন আপন করিয়া লইয়াছে সে দরিয়াবিবির এই সন্তানটিকে। যেদিন স্কুল থাকে না, সারাদুপুর কাটে সাকেরের বাড়িতে। আমজাদ আর মোনাদির বইয়ের গল্প পড়িয়া শোনায়। অসহায় এই বধূটি নূতন করিয়া প্রাণপ্রাচুর্যের সন্ধান পায়। সাকেরের সঙ্গে মোনাদিরের মাখামাখি। আরো বেশি। আমজাদ পূর্বে সাকেরকে এড়াইয়া চলিত। সে-ও আজকাল মোনাদিরের দেখাদেখি সাকের চাচার সঙ্গে সখ্য পাতাইয়াছে। মোনাদিরকে সে লাঠিখেলা শেখায়। দরিয়াবিবি তা পছন্দ করে নাই। তার সুন্দর কিশোর পুত্র চোয়াড় না হইয়া যায়।
জলা-জাঙাল, গোঠ-মাঠ নূতন ভাষা খুঁজিয়া পাইয়াছে। আমজাদও ফাঁইফরমাশ শুনিতে চায় না, কেবল মোনাদিরের সঙ্গে ঘুরিয়া বেড়াইতে ভালোবাসে। আজহার বর্তমানে পরিশ্রমের মাত্রা বাড়াইয়া দিয়াছে সংসারে একজন প্রাণী বাড়িয়াছে বলিয়া। আমজাদকে এই সময় তার বেশি দরকার। সে কিন্তু ধরাছোঁয়া দেয় না।
চন্দ্র কোটালের সঙ্গে আজহার খাঁ শকরগঞ্জে আলুর চাষ করিয়াছিল। কচি লতায় নদীর চর পূর্ণ হইয়া উঠিতেছে। গোড়ায় আলু ধরে নাই তখনও। মোনাদির আমজাদের সঙ্গে এই কচি গাছ তুলিয়া মূলের মিষ্টতা আস্বাদ করিতে খুব ভালোবাসে।
একদিন চন্দ্র কোটাল দুইজনকে হাতেনাতে ধরিয়া ফেলিল।
সব আলুমূল খাওয়া হচ্ছে।
এক বাবলা বনের আড়ালে তাড়ি গিলিয়া শুইয়াছিল কোটাল। কিশোর কণ্ঠের আওয়াজে ঘুম ভাঙিয়া গেলে তার চোখে পড়িল এই অপচয়-দৃশ্য। চোখ আরো বড় করিয়া গোঁফ ফুলাইয়া সে গম্ভীরকণ্ঠে বলিল : আলুমূল খাওয়া হচ্ছে, চৌকিদার চৌকিদার
এমন চিৎকার করিতে লাগিল, যেন গ্রাম জুড়িয়া ডাকাত পড়িয়াছে।
আমজাদ ভয় পাইয়াছিল। মোনাদির পূর্বে এই লোকটিকে দেখিলেও এমন মূর্তি আর দেখে নাই।
না কোটাল চাচা, তুলে দেখছিলাম। আলু হয়েছে নাকি।
আলু হয়েছে নাকি আসুক চৌকিদার। পালিয়ো না, খবরদার।
আমজাদ ওকালতি করিতে আসিল, ও আমার বড়ভাই।
তুমিও চোর। চৌকিদার দুজনকেই ধরবে।
মোনাদির ভয়ে এতটুকু হইয়া গেল, তার চোখে প্রায় পানি আসিয়া পড়িয়াছে।
চারিদিকে মাঠের প্রসারণ নীল-সবুজ রঙের মোহনা রচনা করিয়া চলিয়াছে। অবেলার মেঘে বর্ণ-কেলির সমারোহ নূতনতর মনে হয়।
কোটাল চারিদিকে চাহিয়া একবার হাই তুলিল।
চৌকিদার আসছে না, তাহলে আমাকেই নিয়ে যেতে হবে। দুই চোর। চলো আমার সঙ্গে
আমজাদ থ বনিয়া গেল। তার পা আর নড়ে না।
আমি নাছোড়বান্দা। গোঁফে তা দিতে লাগিল কোটাল।
তোমরা পায়ে হেঁটে যাবে না। ও, বুঝেছি। তারপর চন্দ্র উবু হইয়া বসিয়া পড়িল ও বলিল : আচ্ছা, দুই চোর আমার কাঁধে ওঠো।
মোনাদির অগত্যা কী বা করিতে পারে। সুশীল-সুবোধ ছেলের মত দুইজনে চন্দ্র কোটালের কাঁধে চড়িল। ভয় হয় তাহাদের, পাছে পড়িয়া যায়। দুইজনে কোটালের বাবরি চুল কষিয়া ধরিল।
ওরে বাবা, সব পাঠানের বাচ্চা, একদম ঘোড়া-চড়া করেছে–বলিয়া চন্দ্র হাঁটিতে লাগিল। আরোহীদের ভয়ের অন্ত নাই। আমজাদের চোখে পানি গড়াইতেছে। মোনাদির চুপচাপ।
কোটালের বপুর দোলনে আরোহীরা আনন্দ পায় না।
হঠাৎ হি হি শব্দে হাসিয়া উঠিল চন্দ্র কোটাল।
–এই চোর চাচারা, চল্ সব চাচীর থানায়। এলোকেশী ঘরে আছে নাকি কে জানে?
মোনাদির ও আমজাদ মাথার উপর চোখ চাওয়াচাওয়ি করে। দুইজনের মুখে হাসির রেখা ফুটিয়া উঠিতে লাগিল।
চন্দ্র কোটাল গান ধরিল, দুজনের ঠোঁটে হাসি আর ধরে না।
প্রাণ যদি দিলে তুমি
প্রাণ-চোর শেষে।
কোকিল কেন রেখে গেলে
এমন পোড়া দেশে।
মেঠো বাউলের সুরে প্রান্তরের বুক ভরিয়া উঠিতে থাকে। আমজাদ ও মোনাদির দূরে দূরে দৃষ্টি ছড়াইয়া অবেলা উপভোগ করিতে লাগিল।
মোনাদির বলিল : চন্দ্র চাচা, আমাদের নামিয়ে দাও।
না, সেটি হবে না। তোমার চাচির থানায় চলো, লাল আলু আছে, সারারাত আলু খাওয়াবে।
আমজাদ সব চিনিতে পারে। খালের সেঁতো পার হইয়া তালগাছের সারি, শেষে চন্দ্র চাচার ঢিবি। সেইদিকেই কোটাল অগ্রসর হইতেছে। ধীর-সমীরে খড়ি বনে শ্যুশন শব্দ উত্থিত হয়। কোটালের কোনো দিকে ভ্রুক্ষেপ নাই। বিরহিণী কোকিলের ডাকে জর্জরিত হৃদয়, তারই বিলাপোক্তি কণ্ঠে বাজিতে থাকে শুধু।
ঢিবির উপর এলোকেশী চন্দ্রমণির উকুন বাছিতেছিল। উঠানে খেলাব্যস্ত যোগীন ও গোপাল। তারা এই দৃশ্য দেখিয়া হাসিয়া খুন।
