ডুকরাইয়া কাঁদিতে লাগিল মোনাদির মার কোলে মাথা খুঁজিয়া। বাইরের প্রভাত স্নিগ্ধ আলো আর বায়ুতে আজ আর এতটুকু মমতাও ছড়ানো নাই।
একটু বসো, বাপ আমার।
সিদ্ধধান একটু আঁচ ধরিয়াছিল, পোড়া গন্ধ উঠিতেছে। দরিয়াবিবি মোনাদিরকে বসাইয়া রাখিয়া তাড়াতাড়ি হাঁড়ি নামাইল।
ধান ঢালা হইল যথাশীঘ্র। মোনাদির মাঝে মাঝে ফোঁপাইয়া কাঁদিতেছে। অপরিচিত পরিবেশে তার চোখ কৌতূহলের কোনো নেশায় ডুবিয়া যায় না। সে মার মুখের দিকে বারবার চাহিয়া থাকে।
কাজ শেষ হইয়া গেল, সে মোনাদিরের কচি মুখ তুলিয়া তার ডাগর চোখের দিকে চাহিয়া রহিল।
গরিব দাসীমাকে এতদিনে মনে পড়ল? ধরা-গলায় কথা শেষ করিয়া দরিয়াবিবি কচি ঠোঁটে-মুখে বারবার চুম্বন করিতে লাগিল। মাঝে মাঝে সে-ও ঊর্ধ্ব-নিবদ্ধ নয়নে নীলিমার প্রশান্তি চয়ন করিবার উদ্দেশ্যে বোধহয় আকাশের দিকে মুখ ফিরাইয়াছিল।
বেশ ভালো ছিলে, মুনি?
মুনি সলজ্জ কণ্ঠে জবাব দিল : হ্যাঁ, মা।
দরিয়াবিবি তাহাকে কোলে তুলিয়া খুঁটিনাটি প্রশ্ন জিজ্ঞাসা করিতে লাগিল।
একটু পরে আসিল আজহার। ফজরের নামাজ শেষ করিয়া সে দহলিজ হইতে ফিরিতেছিল। দরিয়াবিবির কোলে একটি অপরিচিত বালক দেখিয়া সে বিস্মিত।
কার ছেলে কোলে?
মাথায় তাড়াতাড়ি ঘোমটা টানিয়া দিয়া দরিয়াবিবি নম্রকণ্ঠে জবাব দিল, আমার ছেলে এসেছে।
বাঃ, বেশ সুন্দর ছেলে তো। কী সুন্দর চোখদুটো।
দরিয়াবিবির মুখ রাঙা হইয়া উঠিতেছিল।
বাপ মুনি, তোমার আব্বাকে সালাম করো।
যন্ত্রচালিতের মতো মোনাদির আজহারের পায়ে কদমবুসি শেষে আবার মার কোলে ফিরিয়া আসিবার উপক্রম করিল।
তোমাকে যেতে দেব না।
আজহার চিবুক ধরিয়া তার মুখ নিরীক্ষণ করতে লাগিল।
তুমি আমার বাবাজি আজ থেকে। আমি তোমার ছেলে।
নিজের রসিকতায় আজহার হাসিতে থাকে। তার স্বভাবের রীতিমতো ব্যতিক্রম।
তোমার নাম বলল।
মোনাদির লজ্জায় মাথা নিচু করিল। জবাব দিল দরিয়াবিবি, মোনাদির হোসেন খাঁ। আমি মুন ডাকতাম।
বেশ, বেশ। আমার মুনি বাবাজি।
হঠাৎ আজহার চিৎকার করিয়া ডাকিতে লাগিল, আমু-নঈমা-আমু
তারা বিছানা ছাড়িয়া সকলে ছুটিয়া আসিল কয়েক মুহূর্তে। ভোরের বেলা বিছানায় জাগিয়া কল্পনা করিতে আমজাদের খুব ভালো লাগে।
দেখে যা আমু-নঈমা, তোদের বড়ভাইকে দেখে যা।
তারা বিস্মিত নয়নে শিশুসুলভ বিহ্বলতায় মুখ চাওয়াচাওয়ি করে।
আজহারের উচ্ছ্বাস দেখিয়া দরিয়াবিবি মনে মনে আনন্দিত হয়। তার কোলে মোনাদির উপবিষ্ট বলিয়া নঈমা আমজাদ দূরে দাঁড়াইয়াছিল।
আয়, কাছে আয়, তোদের বড়ভাই।
মোনাদির কোনো কথা বলিল না। আমজাদের হাত নাড়াচাড়া করিতে লাগিল। তার সস্নেহ দৃষ্টি নঈমার উপর পড়িলেও পিচুটি-ভরা চোখের জন্য কেমন যেন লাগিতেছিল তাকে।
দরিয়াবিবি নৈরাশ্য-ক্লান্তি নিমেষে কখন ভুলিয়া গিয়াছে। ফল্গুধারার মতো আনন্দের অন্তঃস্রোত তার পাঁজরে নূতন মেঘের মতো খেলিয়া যায়।
তুমি ছেলেদের সঙ্গে ভাব করিয়ে দাও। একটা কলার কাঁদিতে রঙ ধরেছে দেখে। এসেছিলাম কাল, আজ পেকে গেছে নিশ্চয়। সকালবেলাটা ছেলেদের ভালো নাস্তা হবে।
দরিয়াবিবি দ্রুতগতি চলিয়া গেল। মোনাদির মার গমনপথের দিকে চাহিয়া থাকে।
আজহার বলিল : তোমরা খেলা করো, আমি হুঁকোটা ধরিয়ে আনি। আমজাদ, তোর আজ মক্তবে গিয়ে কাজ নেই।
আনন্দে সে উঠানময় ছুটাছুটি করিতে লাগিল।
.
১৩.
হঠাৎ নূতন কর্মোদ্যম ফিরিয়া আসিয়াছে দরিয়াবিবির। আজহার অবাক হইয়া যায়। স্বামী-স্ত্রীর ভেতর সংসার-যাপনের যুগ্ম-বন্ধন থাকিলেও, এতদিন বড় ফাঁকা ঠেকিত সবকিছু। দরিয়াবিবি পাষাণই তো বটে। আজকাল হৃদ্যতার নব মুকুল প্রস্ফুটিত হইতেছে কিষাণ-দম্পতিকে ঘিরিয়া। স্নেহযত্নের আতিশয্যের কোনো কূল-কিনারা করিতে পারে আজহার।
মোনাদির কয়েক দিনেই অপরিচয়ের বেড়াগুলি ভাঙিয়া ফেলিয়াছে। আজহার আমজাদ অপেক্ষা মোনাদিরকেই যেন বেশি স্নেহ করে। কোনো ফাঁই-ফরমাশ তাকে। খাঁটিতে হয় না। গাঁ হইতে এক মাইল দূরে মাইনর স্কুলে আজহার তাকে ভর্তি করিয়া দিয়াছে। মাইনাপত্র যোগাইবার সাহস আছে তার। দরিয়াবিবির উৎসাহ কম নয়। পুরাতন দিনগুলির স্মৃতি কিছুটা উত্তাপ অবশ্য হ্রাস করিয়া ফেলে। আমজাদের মতবের পড়া আর দুমাস পরে শেষ হইয়া গেলে দু-ভাইয়ে একসঙ্গে স্কুল যাইবে। এখনও দুমাস। একা একা মোনাদির স্কুলে যায়, দরিয়াবিবি তার জন্য খুব উতলা হইয়া পড়ে। নদীর ধারে ছেলেদের সঙ্গে খেলা করিতে করিতে একদিন তার বাড়ি ফিরিতে প্রায় সন্ধ্যা হইয়া গিয়াছিল, সেদিন সকলের খাওয়াদাওয়া সারিতে রাত্রি বারোটা বাজিয়া গেল। বিকালে দরিয়াবিবি রান্না চড়ায় নাই।
মোনাদির আসেকজানকে দুচোখে দেখিতে পারে না। তার নোংরামির নানা কীর্তন করে সে মায়ের কাছে। আমজাদ অবশ্য কোনো বিপত্তি তোলে নাই। ঘর মাত্র দুখানা। মোনাদির আসেকজানের কাছে ঘুমাইতে নারাজ।
বুড়ির মাথায় যা উকুন। অগত্যা দরিয়াবিবি নিজের ঘরেই তাকে স্থান দেয়। এখানেও উশখুশ করে মোনাদির। তার সহজে ঘুম হয় না, সে উপলব্ধি করিয়াছিল। এইজন্য আর একটি চালা তৈরির বায়না ধরিয়াছিল দরিয়াবিবি। ঘরে চালের সঙ্গে চাল বাড়াইয়া একটি ছোট ছোট বেড়ার কামড়া প্রস্তুত করিয়া ফেলিল আজহার। চন্দ্র কোটাল শুধু তার গতরের মেহনত নয়, খড়ও দিয়াছিল দশগণ্ডা। এই ঘরে মোনাদির আর আমজাদ। লেখাপড়া করে, বইপত্র রাখে। পাশে উদ্বাস্তু এলাকা, গাছপালায় ভরা। জোছনা রাত্রে আমজাদ মোনাদির দুইজনে প্রাণ খুলিয়া গল্প করিতে করিতে ঘুমাইয়া পড়ে। আসেকজান এইজন্য আফসোস করে নাই। আমজাদ তার কাছ হইতে সরিয়া গিয়াছে। কোনো কোনো রাত্রে বুড়ি হামাগুড়ি দিয়া তাদের কামরায় প্রবেশ করে। হয়তো এতক্ষণ গল্প চলিতেছিল, বুড়ির আগমনে চুপ হইয়া যায় দুই ভাই। মোনাদিরকে বুড়িও খুব ভালো। চোখে দেখে না। বুড়ো পাখি কী পোষ মানে বৌমা, চাল-ছোলা খাওয়ানোই সার। দরিয়াবিবির ধমকে আসেকজান আর এমন কথা কোনোদিন মুখে তোলে নাই। সে মনে মনে তুষের আগুন ধোঁয়াইয়া রাখিয়াছিল। আমজাদকে একা পাইলে বুড়ি নানা মন্ত্রণা দিয়া মনের ঝাল মেটায়। আমজাদও সহজে আসেকজানের ছায়া মাড়ায় না। তোমার ব্যাটা, দরিয়াবৌ, মদ্দ হয়ে গেছে, আর আমার কাছে শোবে কেন? ক্ষোভ মিশিয়া থাকে কথাটায়।
