অকস্মাৎ সটান হইয়া ধানের স্তূপ আলিঙ্গন করিয়া শুইয়া পড়িল দরিয়াবিবি। অসহ্য বেদনায় তার পা কাঁপিতে থাকে। একবার শব্দ করিয়া দাঁতে দাঁতে চাপিয়া নিশ্চল পড়িয়া রহিল উলঙ্গ ইভের প্রতীক বহনকারিণী ভূলুণ্ঠিতা জননী।
সিদ্ধধানের উত্তাপে বেদনার কিঞ্চিৎ উপশম হইলে আবার চুলার মুখে আসিয়া বসিল দরিয়াবিবি। ধান টিপিয়া দেখিল, এইবার নামাইবার সময় হইয়াছে। দ্রুত হাত চালাইতে লাগিল সে।
এমন কর্মোন্মত্ত কেন দরিয়াবিবি? সংসারে শুধুমাত্র তারই স্কন্ধের জন্য! তার স্বামী নাই, আজহার নাই?
এক হাঁড়ি নামাইবার পর চুলায় জ্বাল দিতে দিতে দরিয়াবিবি পুনরায় চিন্তাস্রোতে মগ্ন হইয়া যায়। জগদ্দল প্রস্তর-শিলার বুকে প্রস্রবণের বুদ্বুদ উপল-রেখায় মৃদু তরঙ্গে সমাহিতি চায়।
চোখ বুজিয়া আসিতেছে ঘুমে, তবু কর্তব্যের বেড়ির নাগপাশ শিথিল করিবার কোনো উপায় নাই। ধীরে ধীরে চুলায় জ্বাল দিতে লাগিল দরিয়াবিবি। উবু হইয়া বসার ফলে শিরদাঁড়া টনটন করিতেছে। একটি পিড়া সে টানিয়া আনিল ঘরের দাওয়া হইতে।
দিগ্বলয়ে প্রভাতের আলোর জোয়ার আরম্ভ হইয়াছে মাত্র। বনানীর নিঃসঙ্গে রাত্রি চরা পাখি বিশ্রামের জন্য ঠাই খুঁজিতেছে। প্রত্যুষের মনোহরণ ঝঙ্কারে জাগিয়া উঠিতেছে পশু-পাখি তরু-লতা কিষাণ-জনপদের অধিবাসীরা। গ্রামান্তর হইতে মুয়াজ্জিনের আল্লাহু আকবর ধ্বনি-মূর্ঘনার রেশ রাখিয়া গেল মহেশডাঙার জলা-জাঙালে।
খাঁ-পাড়ার আশেপাশে স্নানার্থী যুবতী-বধূ ছাড়া আর বোধহয় কেহ জাগে নাই। আরো কত না রাত্রি দরিয়াবিবি একাকী জাগিয়া এমন সাংসারিকতায় নিজের সামান্য বিশ্রামটুকু বিসর্জন দিয়াছে। কোনো ক্ষোভ নাই মনে। নিপ্রাণ লৌহকঠিন পাথরের মূর্তির মন ঝাক্ষুব্ধ প্রহরে বর্ষণের আঘাত নীরবে সহিয়া যাওয়া শুধু, প্রান্তরের দিকে ভাস্করের দূরপ্রসারী দৃষ্টির ছায়া মেলিয়া দিয়া। আজও তেমনই নীরবতায় নিজেকে আবৃত করিয়াছিল দরিয়াবিবি। অলক্ষিতে কখন চোখের কোণে অশ্রু জমিয়াছে, তারও খোঁজ রাখে নাই সে। পেশি, স্নায়ু আর মনের মিতালি অজানিতেই আসিয়াছে।
গণ্ডদেশে তপ্ত একফোঁটা অশ্রু-পতনে দরিয়াবিবি সজাগ হইয়া উঠিল। চোখ মুছিয়া চারিদিকে করুণা-বিহ্বল দৃষ্টির সাহায্যে অবলোকন করিতে লাগিল।
দাওয়ার পাশে রান্নাঘর, তার পাশে টাটির বেড়া। গোয়ালঘরে যাওয়ার পথ। ভিটের ধারে গাছপালা আছে বলিয়া এইদিকে এখনও অন্ধকারের ভিড়। চুলার আলোর ঝলকানি তার ঠোঁটের উপর পড়িয়াছিল। হঠাৎ মানুষের ছায়া দেখিয়া দরিয়াবিবি দৃষ্টি আরো সজাগ করিল। মানুষের শিরোদেশের ভাঙা-ভাঙা ছায়াই তো বটে!
সকালে চোর আসে না, দরিয়াবিবিও ভয় পাওয়ার পাত্রী নয়; সে উঠিয়া দাঁড়াইল। কিন্তু অগ্রসর হওয়ামাত্র ছায়া সরিয়া গিয়াছে। টাটি খুলিয়া দরিয়াবিবি চারিদিকে চাহিয়া দেখিল। না, কোনো জনপ্রাণীর চিহ্ন নাই। মনে একটু খটকা লাগিল। আনমনা দরিয়াবিবি আবার চুলাশালে ফিরিয়া আসিল।
এইবার চোখকে অবিশ্বাসের কিছু নাই। সেই ছায়া তেমনই অবিকল টাটির উপর। কিন্তু অগ্রসর হওয়ামাত্র মিলাইয়া গেল।
ভয়ানক ধাঁধায় পড়িয়াছিল দরিয়াবিবি। জিন-ভূতের ব্যাপার নয় তো। একটু ভীত হইল আজহার-পত্নী। কিন্তু তৃতীয়বার টাটি খুলিয়া দেখিল, একটি দশ-বারো বছর বয়সের বালক কাঁঠালগাছের ছায়ায় দাঁড়াইয়া আছে। ভোরের আলো তখনও এখানে অপরিচিত, ছেলেটির মুখে উজ্জ্বলতা পড়ে নাই।
এই খোকা। দরিয়াবিবি ডাক দিল। ছেলেটি ভোরের আলোকের ছায়ায় পা-পা করিয়া কিছুদূর আগাইয়া গেল।
দাঁড়াও। আপ্ত রমণীর কণ্ঠ ধ্বনিত হয়। ছেলেটির গমন নিরস্ত, হঠাৎ মুখ ঢাকিয়া সে ফোঁপাইতে লাগিল।
দরিয়াবিবি ছেলেটিকে কোলে টানিয়া বলিল : কাদের ছেলে, খোকা? বাপ মরেছে বুঝি? পালিয়ে এসেছ?
সে কোনো জবাব দিল না। ফোঁপাইতেছিল, এখন স্তব্ধ হইয়া গেল। মাঝে মাঝে তবু ফোপানির শব্দ ভোরের বাতাসে আলোড়ন তোলে।
কাদের খোকা তুমি? দরিয়াবিবি তাকে তপ্ত বক্ষের পাশে গভীরে টানিতে লাগিল অচেতন স্নেহে।
দরিয়াবিবির ঠোঁটে হাসি খেলিয়া যায়। বেশ ছেলে তো। জবাব দেবে না?
এখনও এখানে অন্ধকারের ঘোর কাটে নাই। গাছের পাতায় অলস সমীরণের কানাকানি ধ্বনিত হয়।
আবার ফোঁপাইতে শুরু করিয়াছে ছেলেটি। কোনো জবাব নাই তার মুখে।
অগত্যা দরিয়াবিবি বলিল : তোমাকে ছেড়ে দিচ্ছি নে, চলো আমাদের ঘরে।
মন্ত্র-মোহিতের মতো বালকটি দরিয়াবিবির বাহুবেষ্টনে থাকিয়া হাঁটিতে লাগিল।
উঠানে ভোরের আকাশ থামিয়া পড়িয়াছে। মানুষের পরিচয় স্বচ্ছ দৃষ্টির কাছে অগোচর থাকে না।
খোকা, তোমার নাম কী।
বালকটি দরিয়াবিবির ডাগর চোখের দিকে নিজের আকৰ্ণবিস্তৃত দুই নয়ন মেলিয়া দিল। গভীর মমতাময়ী আঁখিপল্লবের অন্ধকার দূর হইতে-না-হইতে দরিয়াবিবির চোখে পড়িল বালকের জ্বর উপরে কালো দাগ।
বিস্মৃতির তিমির কে যেন এক নিমেষে মুছিয়া দিল।
মোনাদির, আমার মুনি! অশ্রুসিক্ত কণ্ঠে কয়েকটি কথা আধস্পষ্ট গুঞ্জরিত শুধু হয় নাই। সেইখানে বালকটিকে গভীরে বুকে বাঁধিয়া অকস্মাৎ বসিয়া পড়িল দরিয়াবিবি। তারপর শুরু হইল অঝোর আঁখির উৎসমুখের প্রস্তর-বিদারণ।
