খলিল বোবা অবোধ শিশুর মতো আগন্তুক খ্যাপা লোকটির গতিবিধি আড়চোখে লক্ষ্য করিতেছিল।
ঢের উপায় হয়েছে বিদেশে। চলো মহেশডাঙা। শাকপাতা খেয়ে চোখের উপর তবু সংসারটা দেখতে পাবে।
শিকড়-বশীভূত সাপের মতো আজহার আর মাথা তুলিল না।
চন্দ্র সত্যই নাছোড়বান্দা। আজহার মৃদুভাবে নানা আপত্তি জানাইল, কিন্তু কিছুই টিকিল না। এক ঘণ্টার মধ্যে চাঁদরে মনিহারী পণ্যগুলি বাঁধা পড়িল। চন্দ্র নিজে সড়কের ওপাড়ে এক পানওয়ালার নিকট কাঠের শেফ কটা বিক্রয় করিয়া দিল। ক্ষতি হইল এক পয়সা। সে তো আজহার খাঁ নয়।
কেমন বর্বর মনে হয় চন্দ্র কোটালকে খলিলের নিকট। দৈর্ঘ্য-প্রস্থে সুগোল, গুম্ফবিশিষ্ট কোনো দৈত্য নয়, হঠাৎ শাহানপুরে আসিয়া সব লণ্ডভণ্ড করিয়া দিয়া গেল।
আজহার প্রদত্ত একমুঠো মুড়ি-লজেঞ্চুস যা একমাত্র সান্ত্বনা।
বাসায় তখনও মিস্ত্রিরা ফিরিয়া আসে নাই। কারো সঙ্গে বিশেষ প্রয়োজনও ছিল না আজহার খাঁর। নিজের সূমি কন্নিকা-পাটা গুছাইয়া লইবার জন্য সে একবার বাসায় গিয়াছিল। খলিলের মনমরা ভাব দেখিয়া সে সত্যই ব্যথিত হইল।
একবার সময় এলে আমাদের গায়ে এসো। মহেশডাঙা, গ্র্যান্ড ট্রাঙ্ক রোডের ধারে।
আচ্ছা, চাচা।
অনেক দূর আগাইয়া আসিল খলিল। জল্লাদখানার গহ্বরে সে একজন সমব্যথী হারাইল।
চন্দ্র কোটাল দোকানের মালপত্র পিঠে ঝুলাইয়া লইয়াছিল।
হাঁটিতে হাঁটিতে সে বলিল : ঘাবড়ে যেও না, খা ভাই। সামনে পুন্য মতে পীরের মেলায় সব বিক্রি হয়ে যাবে।
আজহার ছোট একটি পুঁটলি লইয়া হাঁটিতেছিল, কোনো জবাব দিল না।
পড়ন্ত দিনের শেষভাগ। রৌদ্র মরিয়া গিয়াছে। গাছপালা ছায়া দীর্ঘতর হইয়া সড়কের উজ্জ্বলতা মুছিয়া দিতেছে।
জনপদ ছাড়াইয়া চন্দ্র গান ধরিল :
মথুরা ছেড়ে কোটাল যমালয়ে চলে,
মাঠে মাঠে গোপিনীরা ভাসে চোখের জলে,
ও-ও-ও-ও-ও।
আজহার হাসিয়া উঠিল। বলিল : চন্দর, আবার ভাড়-নাচের দলটা জমাও। গান বাঁধতে এখনও বেশ পারো।
চন্দ্র মাথা দোলায়, সঙ্গে সঙ্গে পণ্যের বোঝা দুলিতে থাকে।
দেশে মানুষের দশা ভালো থাকলে চন্দরকে কি আর এত বোঝা বইতে হয়!
ঘাড়ের বাম দিকে বোঝা ঝুলিতেছিল, কোটাল ডাহিনে লইয়া একবার ঝাঁকুনি দিল।
শুয়ো ওয়ো-ওয়ো_শ্যাম, এত দুক্ষু দাও রে
ধিকিধিকি তুষের আগুন মাঠের উদাস বাও রে
সড়কের সর্পিলতা দূরে নিয়ামতপুরে গিয়া মিশিয়াছে। আরো দশমাইল দূরে মহেশডাঙা। দ্বাদশীর চাঁদ আকাশে বহুক্ষণ আগেই আসর জুড়িয়াছিল। প্রান্তরের হাহাশ্বাস বাতাসের মূচ্ছনায় বিলীন কোনো দিনের ইতিহাস যোজনা করিতেছিল। শব্দায়িত বিষণ্ণতা জলা-জাঙালে।
চন্দ্র শিস দিতে লাগিল, শ–ওয়ো–ওয়ো–ওয়ো—
.
১২.
অঘ্রান মাসের ভোরবেলা। দরিয়াবিবির ঘুম ভাঙিয়াছিল অনেকক্ষণ। ধান সিদ্ধ করিবার জন্য রাত্রির বিশ্রামটুকু বহু আগেই তাকে বিসর্জন দিতে হইয়াছে।
সামান্য শীত পড়িয়াছিল। তরল কুয়াশায় আচ্ছন্ন গাছপালার উপরে নিষ্প্রভ তারকার দ্যুতি তখনও মিটিমিটি জ্বলিতেছিল।
মোটা শাড়ির আঁচলে পুরু করিয়া বুক ঢাকিয়া দরিয়াবিবি সিদ্ধ ধান আঙিনার একদিকে ঢালিয়া রাখিতেছিল। ডাবা হইতে ভিজে ধান হাঁড়ি-ভর্তি করার সময় ভয়ানক শীত ধরে। চুলার নিকটে অবশ্য উত্তাপ পাওয়া যায় কিছুক্ষণের জন্য।
রাত্রে ভালো ঘুম হয় নাই। বারবার হাই উঠিতেছিল দরিয়াবিবির। আজহার-নঈমা ঘুমাইয়া রহিয়াছে। আসেকজানের কাছে আমজাদ এখনও নিদ্রায় অচেতন। দরমায়। মাঝে মাঝে মোরগ ডাকিতেছিল। বড় কর্কশ মনে হয় তার শব্দ।
চুলায় জ্বাল দিতে দিতে ক্লান্ত হইয়া পড়িয়াছিল দরিয়াবিবি। মাস চার পরে নূতন সন্তানের জননীর শিরোপা মিলিবে, এই চিন্তা বারবার পীড়া দিতেছিল তাকে। স্ফীত জঠর লইয়া পরিশ্রমের কামাই নাই। দরিদ্রের গৃহে ইহারা কেন ভিড় করিতে আসে? নঈমার চোখের পিচুটি ভালো হইতেছে না। যদি অন্ধ হইয়া যায় সে। গরিব মেয়ের হয়তো বিবাহই হইবে না। সদরের দাঁতব্য হাসপাতাল পাঁচ মাইলের পথ। অতদূর কচিমেয়ে হাঁটিয়া যাইতে পারিবে? আমজাদের মতবে পড়া শেষ হইয়া যাইবে এই বৎসর। তার আগামী শিক্ষার কোনো বন্দোবস্ত নাই। চন্দ্র কোটাল জমিগুলি নিজের নামে বিলি করিয়া লইয়াছিল বলিয়া তবু চাষাবাদের জীবিকার সম্বল রহিয়াছে–নচেৎ তা-ও ধূলিসাৎ হইত।
হঠাৎ ফিক ব্যথা ধরিয়াছিল দরিয়াবিবির জঠরে। চুলার আগুনে তার ফ্যাকাশে পাষাণ-স্তব্ধ মুখটি আরো কালো হইয়া গেল। পেটের কাপড় খুলিয়া চুলার উত্তাপ লাগাইতে রত হইল দরিয়াবিবি। আরো আঁকিয়া আসে ব্যথা। এখনও দু-হাঁড়ি ধান সিদ্ধ করিতে হইবে। দরিয়াবিবির মুখে কোনো আর্তনাদের শব্দ উত্থিত হইল না। উঠানে সিদ্ধ ধানের স্থূপ, তখনও উত্তপ্ত ধোঁয়াটে বাষ্প উখিত হইতেছে। দরিয়াবিবি তাড়াতাড়ি তারই উপর ঈষৎ জঠর চাপিয়া শুইয়া পড়িল। বারবার আশঙ্কিত হইতে লাগিল, এখনই সে অজ্ঞান হইয়া পড়িবে।
একটু আগে শীতে কাঁপিতেছিল। এখন সর্বাঙ্গ ঘামিয়া উঠিয়াছে। কপালে স্বেদবিন্দু চকচক করিতেছিল।
দরিয়াবিবি চারিদিকে চোখ ফিরাইল। বাস্তুর নিচে গাছপালা স্তব্ধতায় ভোরের আলোক পান করিতেছে। নীল কলাবনের উপরটার শুকতারা অন্য দিনের চেয়ে আজ উজ্জ্বলতর মনে হয়। তবু ধূসর আকাশের চত্বরভূমি।
