না চাচা, কাজ না শিখে আর ঘরে যাব না।
আচ্ছা তাই হবে, আর ডাল হবে, বলিয়া ওদু দুই ঠোঁট চাপিয়া তরকারির হাঁড়ির ঢাকনি খুলিল। শোঁ শোঁ শব্দ উঠিতেছিল, খলিল ক্লান্ত দৃষ্টি সেইদিকে মেলিয়া দিল। গহর ফিরিয়া আসিয়া পুনরায় পাখা হাতে লইল। সন্ধ্যার আড্ডা তার মেজাজ খারাপ করিয়া দিয়াছে, সহজে না কোনো বাঁকা কথা, না বাঁকা হাসি তার মুখে নিঃসৃত হইতেছিল।
রান্নার পর খলিলের বাসনে ডাল তরকারি মাখিয়া দিয়াছিল গহর। আজহার নিঃশব্দে এক লুমা তার মুখে তুলিয়া দিতে লাগিল। দগদগে হইয়া উঠিয়াছিল এতক্ষণে খলিলের আঙ্গুলের ফোসকা।
.
জুম্মার দিন। আজহার দুপুরের আগেই ভিনগায়ে নামাজ পড়িতে গিয়াছিল। দোকান বন্ধ রাখিতে হয় নাই, খলিল বিপত্তির জন্য কাজে বাহির হইতে অক্ষম। তাই সে-ই দোকান তদারক করিতেছিল। বসিয়া বসিয়া খোরাকি খাওয়া চাচা পছন্দ করে না, তাই আজহারের নিকট সে দুআনা মজুরি চাহিয়াছিল। অবশ্য নানা অনুনয়ের ত্রুটি করে নাই খলিল। গরীব বলিয়া সে এমন নির্লজ্জ প্রস্তাব উত্থাপন করিয়াছে। এ-কথা সে বারবার বলিয়াছিল। মজুরি লইয়া খলিল বাসায় খাইতে গিয়াছে, আসরের নামাজের সময় সে দোকানে আসিবে। আজহার চুপচাপ বসিয়াছিল। আজ খরিদ্দার বিশেষ নাই। সকাল ঝোঁক যা সামান্য বিক্রয় হইয়াছে। জোরে বাতাস বহিতেছিল। রাস্তার ধুলোয় জিনিসপত্র সাফ রাখা মুশকিল। আসবাবপত্র আজহার পরিষ্কার করিয়া আবার বিশ্রামে রত হইল।
দোকানের পশ্চাতে ঝাঁকড়া শিরীষের ডালে শশন্ শব্দ উঠিয়াছিল। মেঘের রং ঈষৎ কাজল, হয়তো ঝড় উঠিতে পারে। নিরুদ্দিষ্ট আকাশের যাত্রীদের সঙ্গী হইয়াছিল একঝক শীতের পাখি। আজহার তার কোনো সংবাদ জানিল না।
আনমনা বসিয়া থাকিলে নানা রাজ্যের চিন্তা আসিয়া ভিড় করে, সোয়াস্তি পায় না আজহার।
বাতাসের স্রোত হঠাৎমন্দীভূত হইয়া গেল। একটি কোকিলা কর্কশ শব্দ করিয়া সম্মুখের বাঁশবনের ঝোপে আসিয়া বসিল। একটু পরে পথের মোড়ে শিসের শব্দ শোনা গেল।
আরো নূতন পাখি আসিল নাকি? শিসের শব্দ ক্রমশ নিকটবর্তী হইতে লাগিল।
সড়কের দিকে মুখ ফিরাইয়া আজহার অবাক হইয়া গেল।
চন্দ্রের সর্বাঙ্গে দৃষ্টি বুলাইবার পূর্বে সে সুইৎ শব্দে শিসধ্বনির সমাপ্তি-রেখা টানিয়া আজহারের দোকানের সম্মুখস্থ বাঁশের উঁটির উপর বসিয়া পড়িল।
কোটাল, তুমি?
কৌতূহলে চন্দ্র কোটালের চক্ষুতারকা নাচিতে থাকে। আবার শিস দিয়া সে গুনগুন করিতে লাগিল :
মথুরায় ফিরে এসে
ভুলে গেছ বিন্দাবনের কথা।
আমি তোমায় চিনেছি শ্যাম,
খাইনি চোখের মাথা।
আজহার জিজ্ঞাসাবাদের জন্য উন্মুখ। কোটালের গান আর থামে না।
চন্দর, একটু থামো ভাই। জোর গলায় ডাকিল আজহার।
আগে বিড়ি দাও।
পা নাচাইতে থাকে চন্দ্র।
বিড়ি পান তামাক সব দিচ্ছি। বাড়ির ছেলেপুলেরা কেমন আছে?
গোঁফে তা দিয়া কোটাল জবাব দিল না, মুখ নিচু করিয়া বিড়ালের হাসি হাসিতে লাগিল।
অধৈর্য হইয়া উঠিয়াছিল আজহার, সব ভালো আছে?
আবার গোঁফে লম্বা তা। মাথা দোলাইয়া চন্দ্র জবাব দিল, আমি তার কী জানি?
হাতের তালু প্রসারিত করিয়া চন্দ্র মিটিমিটি হাসিতে লাগিল।
ছেলেরা ভালো আছে?
আসরের নামাজের সময় নিকটবর্তী। খলিল দোকানের সম্মুখে আসিয়া নীরবে দাঁড়াইল। এই লোকটিকে দেখিয়া সেও হতবাক। মনে মনে ভয়ানক হাসি পাইতেছিল তার।
খলিলের দিকে নজর পড়িল চন্দ্র কোটালের।
কার ছেলে, আজহার ভাই? ও বাবা, এখানে তাহলে সংসার পেতেছ? নিকে করলে নাকি ছেলেসুদ্ধ?
খলিল লজ্জায় মরিয়া যাইতেছিল। আজহার অসোয়াস্তি প্রকাশ করিয়া বলিল : চন্দর, থাম্ একটু। ও দোকান দেখেশোনে মাঝে মাঝে। আমাদের এক মিস্তিরির ভাইপো।
তাই ভালো। ঘরেও সব ভালো। আগে একটা বিড়ি দাও, তবে সব খুলে বলব।
আজহার জবাব দিল : কোটাল, একটু মিষ্টি আনিয়ে দিই, তারপর বিড়ি খাও।
না, ওসব দরকার নেই।
অগত্যা আজহার বিড়ি-দেশলাই বাহির করিয়া দিল।
চন্দ্র কোটাল নিশ্চিন্তে ধোঁয়া ছাড়িতে ছাড়িতে বলিল : সব ভালো আছে, ভগবানের দিন তো আটকে থাকে না কারো জন্য। তবে কখনো কখনো দুপায়ে চলে আর কখনো হামাগুড়ি দিয়ে, কখনো চার হাতপায়ে চালাতে হয়।
প্যাঁচ কষা কথা আজহারের সহজে বোধগম্য হয় না, আজ অবশ্য পরোক্ষ অনুভূতির সাহায্যে নির্দয়ভাবে সবকিছু উপলব্ধি করিল।
খাঁ এইদিকে চতুর। মনের হঠাৎ-জাগা কোনো বেদনা সে অন্য কথায় ঢাকিতে চায়।
অনেক দূর থেকে এসেছ। চলো, একটু ঠাণ্ডা হয়ে মিষ্টি খাও। আর কোনো কাজ আছে?
কাজ! চন্দ্র কোটাল ভ্রুকুটি করিল। অনেক কাজ। দোকানটার মালপত্র গুটিয়ে এখনই মহেশডাঙা রওনা হতে হবে।
আজহার যেন সব ঘুলাইয়া ফেলিতেছে।
শিগগির কেন? দোকানটা কিছুদিন দেখব।
চন্দ্র এবার সত্যই গম্ভীর হইয়া উঠিল। ভয়ানক তিক্তকণ্ঠেই সে জবাব দিল : ওসব রাখো। আর লাখ টাকা কমাতে হবে না। কমাসে ঘরের কী দুর্দশা হল দেখে আসবে চলো। জমি কবিঘে পর্যন্ত রহিম বখশ নিয়ে নিল। কদ্দিন ফেলে রাখবে সে। দরিয়াভাবী বলে সংসার চলছে, আর কেউ হলে ঢি ঢি করে ছাড়ত।
আজহার লজ্জায় মাথা নিচু করিল, চোখের কোণ তার সজল হইয়া উঠিয়াছে।
হাঁড়ির খবর আর হাটে ভেঙে লাভ নেই। তোমার চাদর দিয়ে এইতো কটা জিনিসপত্তর–বেঁধে নিয়ে, চলো সরে পড়ি।
