ওদু তুড়ি মাড়িয়া বলিল, শেষে টাকা আদায় করলে বলো তা হলে।
আদায়! অবিশ্বাসের হাসি গহরের কণ্ঠে।
ভয়ে পালিয়ে এলাম। আমার ময়লা চিরকুট কাপড় আর এই চেহারা, সেখানে থু দিতে পারি?
আজহার তসবি টিপিলেও গহরের দিকে তার মোল আনা খেয়াল ছিল।
লোকটা ঠিক চিনেছিলে?
আলবৎ। কাবলীদের মতো চোখ। অত ভুল হয় না খায়ের পো। ঐরকম জুচ্চোরী ফন্দি এঁটে শেঠ হয়ে বসেছে এখন। ঈমানের কাল আছে আর?
তাহলে বেঈমান না হলে দুনিয়ায় বেঁচে থাকা যায় না। আর কোনো উপায় নেই?
আর্তনাদের মতো শোনায় আজহারের প্রশ্ন। গহরের মুখের দিকে এমন বিষণ্ণ দৃষ্টি ফেলিয়া সে চাহিয়া রহিল যে, গহর চোখ ফিরাইতে বাধ্য হইল। সেও এবার গম্ভীর হইয়া যায়, কণ্ঠে তার আভাস ফুটিয়া উঠিতেছিল।
উপায় যদি জানতুম, তাহলে এই দশা! আমার বিদ্যেতে কুলোয় না।
হতাশার তীব্র ব্যঞ্জনা মানুষের কণ্ঠস্বরে এমন করিয়া সহজে বাজে না। রূপকথা শুনিতে শুনিতে তার বাস্তব পদক্ষেপ যেন কাহিনীকার ও শ্রোতার সম্মুখে হঠাৎ উপস্থিত হইয়াছে, রূপকথা তাই আর জমিতেছে না; সভায় বোবার মতো সকলে দুই চোখ খুলিয়া কেবল চাহিয়া রহিয়াছে–যার কাজল গহনে শুধু বিস্ময়, ভয়, আর ভঙ্গুর মানস বুদ্বুদের জনতা।
সকলেই চুপচাপ। ঘরের কোণে জ্বলন্ত চুলার উপর হাঁড়ির ভেতর ছুঁই ছুঁই শব্দ উঠিতেছিল কেবল।
আজহার যন্ত্রচালিতের মতো তসৃবির দানা এক এক করিয়া টিপিয়া যাইতেছিল। দ্রুত চলে তার আঙুল। গহর পর্যন্ত কেন নির্বাক হইয়া গিয়াছে? সেও জবাব দিতে পারে না।
খলিল বাহিরে গিয়াছিল ভাতের ফ্যান গড়াইতে। তার অদ্ভুত চিৎকার শোনা গেল। আজহার ঈষৎ তড়িৎস্পৃষ্টের মতো হঠাৎ বলিয়া ওঠে : গহর, বাইরে কী হল?
স্ব স্ব পৃথিবীতে সবাই যেন আবার ফিরিয়া আসিয়াছে। ওদু, গহর, আজহার তাড়াতাড়ি বাহিরে ছুটিয়া আসিল।
খলিল তখন ফোপাইয়া কাঁদিতেছে। একপাশে ভাতের হাঁড়ি বসানো।
কী হয়েছে? সকলের মুখে ওই এক কথা।
আমার হাত পুড়ে গেছে। ও, মা গো
বয়সে ছোট বলিয়া সকলেই খলিলের মেহনতে নিজেদের বিশ্রামের আরাম খোঁজে। গহর এইদিকে বারোআনা গড়িমসি করে। নিজের ভাইপো বলিয়া ওদু একদম নবাব বনিয়া গিয়াছে।
আজহার অতি ব্যস্ততার সহিত বলিল, ঘরের ভেতর চলো। আলোয় দেখা যাক। একটু সাবধান হতে হয়, বাবা।
ওদু ধমক দিতে আরম্ভ করিল, এতবড় ছেলে, একটু উঁশগুশ নেই। পরের ছেলে নিয়ে এসে মুশকিল!
গহর অন্যান্য দিন নাবালকের উপর ওদুর তবি উপভোগ করে। আজ সে পর্যন্ত চটিয়া গেল।
ওদু, যা মুখে আসে তাই বলছিস! ওইটুকু ছেলে, দেড় সের চালের ভাত পসানো চাট্টিখানি কথা নাকি? নিজে তো ছমাসে একবারও হাঁড়ি ছুঁসনে।
ওদু গজর গজর করিতে লাগিল। গহরের কুঁড় ভয়ানক ধারালো, ওদু আর কথা বলিতে সাহস করিল না।
হুকুমজারি কণ্ঠেই গহর বলিল : আমরা দেখছি ওকে, হাঁড়িটা নিয়ে যাও ঘরে। না, কুকুরের মেহমানদারি হবে আজ।
ওদু নীরবে আদেশ পালন করিল। কিন্তু সে এমন চটিয়াছিল যে, খলিলের দিকে আর চাইয়াও দেখিল না।
খলিলের ডানহাতের আঙুলের আগাগুলো ফোস্কায় ভরিয়া উঠিয়াছে। গহর বারবার আপসোস করিতে লাগিল।
চুলায় জ্বাল দাও, দিয়ো। এসব কাজে আর হাত দিয়ো না, বাবা।
গহরের মুখে এমন সুমিষ্ট বাণী। খলিলের দগ্ধ আঙুলের যন্ত্রণা সামান্য উপশম হয় যেন। তাড়ি গিলে এসেছে নাকি গহর, হঠাৎ এমন কথাবাতা?
আজহার বলিল, আমি আলু বেটে দিচ্ছি। ফোঁসকার উপর জ্বালা বন্ধ হয়ে যাবে।
চটপট আলু বাটিতে বসিল আজহার। ততক্ষণে গহর ফোস্কার উপর তালের পাখার বাতাস করিতে লাগিল। তরকারি এখনও রান্না হয় নাই। হাঁড়ি লইয়া পড়িয়াছিল ওদু। এদিকে সে নির্বিকার।
ছেঁড়া ন্যাকড়া দিয়া আলুর পুলটিশ বাঁধিয়া দিল আজহার। হাতের যন্ত্রণা কমিয়া আসিতেছে ধীরে ধীরে।
আজও কৃতজ্ঞতার সহিত খলিল আজহারের মুখ অবলোকন করিতে লাগিল।
নিজের মনেই সে প্রশ্ন করিল : চাচা, তোমার দোকানটা বড় হলে আমাকে দোকানদার করবে?
আজহার তার মুখের দিকে চাহিয়া ঈষৎ হাস্য করিল, কোনো জবাব দিল না।
সম্মতির এই আর এক নূতন পদ্ধতি মনে করিয়া আরো উৎফুল্ল হইয়া উঠিল খলিল।
আমার এই কাজ ভালো লাগে না।
ওদু খলিলের দিকে একবার চাহিয়া আবার রান্নায় মন দিল। দৃষ্টির ভেতর তার কী ছিল দেখা গেল না।
গহর এখনও হাত হইতে পাখা ফেলে নাই। মাঝে মাঝে খলিলের মুখ হইতে আহ্ উহ্ শব্দ উচ্চারিত হইতেছিল। জ্বালা থামিলেও কব্জি পর্যন্ত টনটন করিতেছিল তার।
আজহার চাচা, আল্লা আপনার দোকানটার বাড় দিত!
আজহার জবাব দিল : তোমার মুখে সুবন (সুবর্ণ) বষুক, চাচা।
গহর কোনো মন্তব্যের দিকে গেল না। পাখা রাখিয়া উঠিয়া পড়িল সে। তার হাত মুখ ধয়া দরকার। আজহার আবার বাতাস করিতে লাগিল।
ওদুকে যমের মতো ভয় করে খলিল। চাচা ভাইপোয় কদাচিৎ প্রাণ খুলিয়া বাক্যালাপ হয়।
দ্বিধা দ্বন্দ্বে দুলিয়া তবু বলে : ওদু চাচা, আমার মাকে খবর দিও না, সে বড় কাঁদবে। ওদু প্রথমে জবাব দিল না। কিছুক্ষণ থামিয়া বলিল, না, কাল-পরশু বাড়ি রেখে আসব তোকে। এখানে খামাখা বসে বসে খোরাকি খাওয়া।
প্রথমে উজ্জ্বল হইয়া উঠিয়াছিল খলিলের মুখ, চাচার শেষ কথাগুলো তার সারা শরীরে কালি লেপিয়া দিল।
