ঈমানদার হলে সংসার করা দায়।
শুধু দায়, চৌদ্দপুরুষ জড়িয়ে পড়ে সুদ্ধ। বলিয়া গহর একটি বিড়ি ধরাইল।
বাসায় আরো মিস্ত্রি কাজ হইতে ফিরিয়া আসিয়াছিল। আজহার আজ দোকান খুলিতে যায় নাই। বাসার আড্ডা তার ভালো লাগিতেছিল।
গহর ডাকিল : ওদু। আছিস
ওদু-মিস্ত্রি বাসার এককোণে শায়িত অবস্থায় গল্পের দিকে কান খাড়া রাখিয়াছিল।
কি রে! সে জবাব দিল।
তোর মনে আছে, সে-বার, বেলেঘাটার আড়ৎদারের কাজ করি। এক ব্যাটা চামার আমাদের কী ঠকান না ঠকালে।
ওদুর শরীর ক্লান্ত, তাই সে ঘুমাইবার চেষ্টা করিতেছিল। এইবার উঠিয়া বসিল।
গহর, সেই আড়ৎদারের নাম-ডাক কত জানিস, দুটো মসজিদ তৈরি করে দিয়েছে এবার। অথচ আমাদের খাটনির দামটা দিলে না। কত টাকা বাকি ছিল, গহর?
চৌদ্দ টাকা ছ আনা।
গহর বিড়ির ছাই টোকা দিয়া ফেলিয়া পুনরায় কহিল, ব্যাটা চৌদ্দ বছর দোজকে জ্বলবে।
আজহার জবাব দিল : তা কি আর হয় ভাই। কেরামিন-কাতেবিন আমাদের গোনা আর নেকির কথা লিখছে। হাশরের ময়দানে যেদিন বিচার হবে, দাঁড়িপাল্লায় ওজন করে দেখবে নেকি আর বদীর কোন্ পাল্লা ভারি। চৌদ্দ টাকা মেরে মসজিদ দিলে কোনো গোনা থাকে না, নেকির পাল্লা ভারি হয়ে যায়।
গহর ব্যঙ্গ করিয়া উঠিল : আজহার ভাই, তোমার ওয়াজের থলিমুখ বন্ধ করো। চৌদ্দ টাকায় মসজিদ হয়? কত চৌদ্দজনের কত টাকা মেরেছে তার খবর রাখো?
আজহার সায় দিল : ঠিক বলেছ, ভাই! আমি অন্য কথা ভাবছিলাম কিনা।
ঐরকম ভাবলে আর দোকান চলে না। মজিদওয়ালা আড়ৎদারের মতো ভাবো, জাল-জোচ্চোরি শেখো, কপাল খুলবে।
তৌবা!
গহর মিস্ত্রি খিলখিল শব্দে হাসিয়া উঠিল। মুখ তার বন্ধ থাকে না।
তবেই তুমি কারবার চালিয়েছ। জুম্মার দিনে দেখি তোমার দোকান সারাদুপুর বন্ধ পড়ে থাকে। খদ্দের যা আসে তা ওই সময় আসে। তখন দোকান বন্ধ রাখলে চলে?
আজহার সহসা উত্তেজিত হয় না। আজ ঝোঁকের মাথায় সে প্রতিবাদ করিয়া বসিল : এ কী কথা তোমার মুখে, গহর ভাই! এবাদতের চেয়ে পেট এত বড়!
অত ঈমানদার হলে ফকিরি নিতে হবে।
আবার ব্যঙ্গের হাসি গহরের কণ্ঠে। একটু দম লইয়া সে ডাক দিল : খলিল চাচা, একটু তামাক সেজে আনো।
বাসার এক কোণায় রান্না চলিতেছিল। খলিল তরকারির হাঁড়িতে জ্বাল দিতেছিল। বয়সে ছোট বলিয়া বাসার সকলের ফাঁইফরমাশ তাকে শুনিতে হয়।
দিচ্চি, চাচা।
গহর অবশ্য খলিলের চাচা নয়, ওদুর সঙ্গে একত্র কাজ করে বলিয়া সে আত্মীয়তা গুছাইয়া লইয়াছে।
ধোঁয়া দে বাবা, ধোঁয়া দে। আর এসব ভালো লাগে না।
খলিল তামাক সাজিয়া আনিল।
গহর কল্কে আজহারের হাতে দিয়া বলিল : খায়ের পো, তুমিই প্রথমে আরম্ভ করো।
থাক, তুমি শুরু কর। নরম সুরে জবাব দিল আজহার।
গহর অত্যন্ত বিনয়ী এখন, কল্কে গ্রহণ করিল না।
আজহার কয়েক টান দিয়া ধোঁয়া ছাড়িতেছে আরামে চোখ বুজিয়া। তখন গহর সহাস্যে আবার বলিতে থাকে : বুদ্ধির গোড়ায় একটু ধোঁ দাও, খায়ের পো। বড় কঠিন ঠাই দুনিয়াটা।
নিস্তেজ হইয়া পড়িয়াছিল আজহার। সে চোখ বুজিয়া ধূমপান করিতে লাগিল।
ওদুও কল্কের প্রত্যাশী, আজহারের মুখের দিকে সে চাহিয়াছিল। খলিল কর্তব্যস্থলে ফিরিয়া গিয়াছে। চুলায় চেলাকাঠ জ্বলিতেছিল, আগুনের আভায় দেখা যায় তার মুখ ঘামিয়া উঠিয়াছে।
গহর কল্কে হাতে লইয়া কথাবার্তা শুরু করে। জীবনের অভিজ্ঞতা তার অফুরন্ত। ব্যবসাজগতের বহু মানুষ, মিস্ত্রীরূপে সে দেখিয়া আসিয়াছে। উপনীত মন্তব্য তার সব জায়গায় এক; ঈমানদারের জায়গা নাই সংসারে।
আজহারের পকেটে তবি থাকে। ঠোঁটের এত তোড়ের মধ্যে সে এক-একটি দানা টিপিয়া লইতেছিল। অবাক হইয়া যায় আজহার, এই বয়সে এত অভিজ্ঞতা সঞ্চয়। করিয়াছে গহর!
ওদু!
ওদু আবার আড় হইয়া শুইয়াছিল বিছানার উপর। সে নিদ্রিত কিনা তারই পরীক্ষা লইল গহর!
কে রে।
ওদু, শোনো একটা মজার গল্প। সেবার আমি হাওড়ায় থাকি। এক ব্যাটা এসে বলে, মিস্ত্রি, আমার কাছে তোমার পাঁচ-সাত দিনের কাজ হবে, ফুরোনে ঠিক করে নাও। পাঁচ টাকা রফা হল। আমি টাকা চাইতে বলে এই তো, কাছেই আমার বাড়ি। দশটাকার নোট আছে, খুচরো নেই। তুমি পাঁচটা টাকা দাও, আমি দশটাকা বাড়ি থেকে দিয়ে দেব। আমার সঙ্গে এসো। যো হুকুম। পাঁচটা টাকা তার হাতে দিলুম। মিনিট দশেক দুজনে হাঁটার পর সে বললে, ঐ আমার বাড়ি। তুমি দাঁড়াও বাইরে, আমি টাকা আনি। মুসলমানদের বাইরে চটের পর্দা ঝুলছে। আমি দাঁড়িয়ে আছি, দাঁড়িয়েই রইলাম। এক ঘণ্টা গেল, সে আর আসে না। শেষে চেঁচামেচি জুড়ে দিলাম। একটা আধবয়সী মেয়ে বেরিয়ে এল ডিপা হাতে। কাকে চাও? বাড়িওয়ালাকে, জবাব দিলাম। মেয়েটা হেসে বলে, এখানে বাড়িওলী থাকে, বাড়িওয়ালা থাকে না। ভেতরে আসবে নাকি? আমি তো অবাক! একদম বেউশ্যে পাড়া। গলির ওপাশ দিয়ে রাস্তা আছে, আমার বাড়িওয়ালা সে পথে পগার পার।
ওদু রস-নিষিক্ত গল্পের মহিমায় বোধহয় আবার উঠিয়া বসিল। মৃদু হাস্যে সে বলে, তারপর?
তারপর ঘোড়ার ডিম। বোকার মতো ফ্যালফ্যাল চেয়ে থাকা।
বাড়িওয়ালীর কাছে অপেক্ষা করলে না?
শুধু হাতে আর অপেক্ষা চলে না। শোনো, আরো আছে। বছর সাতেক পরে পোস্তার ভেতর দিয়ে যাচ্ছি, দেখি একটা বড় কারবারি বসে আছে। আমার চোখে ধাঁধা লেগে গেল। সেই লোকটা গদির উপর, আর কত কর্মচারী চারপাশে।
