দরিয়াবিবি তার চিবুকে হাত দিয়া বলিল : মুখে যা-তা কথা আনিসূনে। দুসাঁঝ এক। দেখি তোর পেট।
তোমার পায়ে পড়ি, দরিয়া বুবু, তোমার পায়ে পড়ি।
তীব্র ক্রন্দনের উচ্ছ্বাসে হাসুবৌর গলা বুজিয়া আসিতেছিল। দুই হাত প্রসারিত করিয়া সে নিজের কক্ষপট আবৃত করিল, চিলের নখর হইতে যেন বিহঙ্গিনী শাবক রক্ষা করিতেছে।
একটুও লাগবে না। একবার দেখব।
হাসুবৌ আরো পিছাইয়া যাইতেছিল।
দরিয়াবৌ ক্ষিপ্রগতিতে তার জঠরের কাপড় তুলিয়া একটান দিল।
এ কী! একরাশ বস্ত্রখণ্ডের ঢিবি যেন ধসিয়া পড়িতেছে। একটু জোর টানের সঙ্গেই। একগাদা ফালি ছেঁড়া টুকরো কাপড় হাসুবৌর স্ফীত জঠরদেশ হইতে নামিয়া আসিল। নঈমার ফালি, লাল গামছা, আরো পাড়ার অপহৃত অনেক শিশুর কাপড় তার ভেতর।
এক নিমিষে মাচাঙের নিচে মূৰ্ছিত হইয়া হাসুবৌ পড়িয়া গেল। স্বাভাবিক তার জঠরদেশ–স্ফীতির কোনো চিহ্ন নাই সেখানে।
কাপড়ের স্তূপের সম্মুখে ফ্যালফ্যাল নেত্রে হতভম্বের মতো দাঁড়াইয়া রহিল সাকেরের মা ও দরিয়াবিবি।
১১-১৫. আজহার হিসেবি বটে
আজহার হিসেবি বটে, কিন্তু পরিবেশের কোনো উপাদান সে তলাইয়া দেখিতে শেখে নাই কোনোদিন। কপাল-ঠোকা গাণিতিক বিদ্যা দোকান করার পূর্বে তার একমাত্র ভরসা ছিল। পদে পদে নিজের ভুল দেখিতে পাইয়াছিল আজহার। সংসার-অনভিজ্ঞ ব্যক্তিরা এইসব ব্যাপারে তবু চোখ বুজিয়া বিধাতার দিকেই বারবার চাহিয়া থাকে।
স্টেশন হইতে সড়ক ধরিয়া বহু যাত্রী গ্রামের দিকে হাঁটিয়া যায়। তাহাদের অধিকাংশই শহর-প্রবাসী। মনিহারী দ্রব্য নগরে শস্তা পায় বলিয়া কেউ এইসব অঞ্চলে খরিদ করে না। যারা নিজ গ্রামে থাকে, তারা সামর্থ্যহীন। এক মাস দোকান চালানোর পর আজহার তা নির্মমভাবেই উপলব্ধি করিয়াছিল। ভবিষ্যতের অন্ধকারে মায়াময় হাতছানি লুকাইয়া থাকে; আজহারের মতো নামাজি পরহেজগার ব্যক্তি এই কুহকের রঙকে মনে করিত ঈমানের অঙ্গ। সুতরাং সর্বব্যাপারে নির্বিকার। দোকান খুলিয়া অবসর যাপনই একমাত্র দিন গুজরানের শ্রেষ্ঠ পন্থা। আজহারের সামান্য পুঁজি ছিল, ইতিমধ্যে সে বাড়িতে একবার টাকা পাঠাইয়াছে, অবশিষ্ট মূলধন ভাঙাইয়া ভবিষ্যতের দিগন্ত জরিপ ছাড়া আর কোন্ পথ খোলা আছে?
মাঝে মাঝে হাট-ফেরত পসারিণীরা আজহারের দোকানে ভিড় করে। তারা কোনোদিন শহর দেখে নাই, শহরের জিনিসের জন্য লোভ বেশি। কপয়সার সওদা বা তারা আঁচলে তুলতে পারে? একটা শস্তা স্যালুলয়েডের চিরুনি, দু-পয়সার রঙিন। ফিতা, সঁচ-সূতা অথবা এক ডিবা আল্তা। কেবল গঞ্জের দিনে এই মহিয়সীদের সাক্ষাৎ পাওয়া যায়।
আজহারের ধ্যানধারণা, কল্পনার সৌধ এই দোকানকে কেন্দ্র করিয়া গড়িয়া উঠিতেছিল। ঈমানদার লোকের দিন আটকাইয়া থাকে না, আজহার এই মূলমন্ত্রটি সহজে বিস্মৃত হইত না। তাহারও দিন অতিবাহিত হইত বৈকি! কোনোদিন রান্নাই হইল না। ময়রার দোকান হইতে দুপয়সার মুড়ি ও বাতাসায় নৈশভোজ সমাপ্ত হইত। নিজেকে লইয়া আজহার খর কোনো লোভ ছিল না বলিয়া সৃষ্টিকর্তার প্রতি তার অগাধ বিশ্বাস এক মুহূর্তও টলিত না।
শুক্রবারে দুপুরবেলা শাদা লুঙি পরিয়া কিস্তি টুপি মাথায় সে তিন মাইল দূরে মসজিদে জুম্মার নামাজ পড়িতে যাইত। এই সময় দোকান বন্ধ থাকিত মাত্র। নচেৎ শেষ বাস স্টেশনে যাওয়া পর্যন্ত দেখা যাইত, আজহারের দোকানে চিনিওয়ালা ছোট দেওয়ালির বাতি জ্বলিতেছে।
দুই মাস কাটিয়া গেল। দোকানে কোনো আয় নাই দেখিয়া আজহার আবার মিস্ত্রিদের কাজে জুটিল। গহর মিস্ত্রী সেদিন খুব হাসিয়াছিল। আজহার তার সঙ্গে বাক্যালাপ বন্ধ। করিয়াছে। এমন হিংসাতুর মন কোথা হইতে আপদের মতো তার সঙ্গ লইয়াছে অকস্মাৎ, আজহার কোনোদিন তা ভাবিয়া দেখে নাই। সারাদিন কাজের পর সন্ধ্যায় আবার দোকান খোলা হইত। গঞ্জের দিন কাজে যাইত না আজহার। সেদিন দু-পয়সা বিক্রি হয়, তাই।
গহর মিস্ত্রি একদিন অযাচিতভাবে আলাপ আরম্ভ করিল।
আজহার ভাই, আমার সঙ্গে কথা বলো না। সাধে আমি রাগ করি? কপালে মুগুর মেরে এসেছি-ভাই, এ জন্মে আর কিছু হবে না।
আজহার তার মুখের দিকে চাহিয়া রহিল। গহর বলিয়া যায় : পয়সা কামাবার হেকমত আছে, ফিকির আছে, ফন্দি আছে, তা যদি না জানো, দোকান দিলেই কি পয়সা হয়?
গহরের সহানুভূতি আদৌ খাদ মিশ্রিত নয়, আজহার বুঝিতে পারে।
তুমি তো কথা বলবে না, খা। আমিই বলে যাই, শোনো, দোকান খুলে খদ্দের ঠকাতে হবে। তার কত ফন্দি। কথায় কথায় হলফ করো, সাতবার মাইরি বলো। বলল, কেনা দামে বেচছি, হুজুর। যদি লাভ নিই তো হারাম শুয়োর খাই। এমনি করে সাতশ শুয়োর খেলে তবে পয়সা হয়। পয়সা হলে হয়তো হাজিসাহেব হোয়ে আসতে পার। মক্কা-মদিনা ঘুরে এলে, ব্যাস। সব সাফ।
গহরের শরীর পাতলা বলিয়া কথার ভারসাম্য রক্ষার জন্য তার পায়ে চাঞ্চল্য খুব। বেশি ফুটিয়া উঠে।
আজহার এইবার মুখ খুলিল : লাভ না নিলে কারবার চলে, ভাই?
তা হলেই মিথ্যে কথা বলতে হবে। আর যদি সাচ্চা কথাই বলো, বেশি লাভ হবে, হয়তো একদমই হবে না। তাতে সংসার চলে না।
কথাগুলি আজহারের খুব মনঃপূত। ভয়ানক ছোট হইয়া যায় সে। তবু যেন গোলক ধাঁধা হইতে পরিত্রাণ পাইতে তার মন আকুলিবিকুলি করে।
