দরিয়াবিবি মাথার শ্লথ ঘোমটা টানিয়া জিজ্ঞাসা করিল, কি সাকের ভাই। মাথাভাঙা কাজ নেই বুঝি এখন, তাই দেখা হয়ে গেল।
আপনিও লজ্জা দেন ভাবী! লাঠি যখন চালাই, মাথা ভাঙে বৈকি। কিছু করে খেতে হবে তো। চুপচাপ বসে থাকলে কেউ চালডাল যোগাবে?
তোমার বড়ভাই চুপচাপ বসে নেই! সফরে বেরিয়েছে, দেখি কত মালমাত্তা নিয়ে ফেরে।
সাকের বিস্মিত-উল্লাসে জিজ্ঞাসা করে, বড়ভাইয়ের খবর পাওয়া গেছে?
হ্যাঁ। কোথা জাহানপুর, সেখানে আছে।
মাশায়াল্লাহ। এমন লোক, ডুব দিয়ে এতদিন কাটিয়ে দিলে।
তার ঘরে চাল-ডাল যোগানো আছে, ভাই। সে প্যাকল মাছ সেজে বসে না থাকলে আর কে থাকবে।
সাকের হো হো শব্দে হাসিয়া উঠিল।
গুণধর ভাইয়ের কাণ্ড দেখে হাসি পায় সকলের।
দরিয়াবিবি ঠোঁট দাঁতে চাপিয়া জবাব দিল।
ভাবী সাহেব, চটে গেলেন। মরদ মানুষদের আপনারা ঐরকম ভাবেন। চাল-ডাল জোটাতে তারা কম চেষ্টা করে না। চাল-ডাল না থাকলে তো মুখ বেঁকে নদীর চড়া হয়ে যায়। তাই মাথা ভাঙি, না মাথা পেতে দিই— এসব দেখবার কি সময় আছে। বড়ভাইকে খামাখা দোষেন।
দরিয়াবিবি হাসি মুখে বলিয়া যায় : তুমি ভাই বেড়াতে বেড়িয়েছ। যাও। আমি মায়ের সঙ্গে দেখা করে আসি। বড়ভাইয়ের হয়ে আর ওকালতির দরকার নেই।
জো হুকুম ভাবী সাহেব। কুর্নিশের ভঙ্গিতে সাকের কিছুক্ষণ পিছু হটিয়া অন্য পথে আড়াল হইয়া গেল।
দরিয়াবিবির হাস্যধ্বনি পাড়ার ঘুলি-পথে গুঞ্জরিত হয়। একটু দূরেই সাকেরের উঠান আর লাউ মাচাঙের প্রাঙ্গণ।
সাকেরের মা হাসির শব্দ শুনিয়া কৌতূহলবশত এইদিকে অগ্রসর হইয়াছিল।
দরিয়াবিবিকে দেখিয়া সে আনন্দিত হয়। তুমি, বৌমা! হঠাৎ রাস্তায় এমন হাসছ?
সাকের ভাইয়ের সঙ্গে দেখা হল। সে কোনো দোষ গায়ে মাখে না। বড়ভাইয়ের মতোই। আমাকে জবাব দিল, ঘাড় না ভাঙলে কেউ খেতে দেবে? সাধে কি আর লাঠি ধরি!
ওর কথা ছাড়ো, মা। কান ঝালাপালা হয়ে গেল ওই এক কথা শুনে-শুনে। এসো, মা।
হাসুবৌ শাশুড়ির গলা শুনিয়া মাচাঙের নিচে আসিয়া দাঁড়াইয়াছিল। বড় শীর্ণ হইয়া গিয়াছে তার শরীর। মুখ পাংশু। চোখের কোণে রক্তিমতা আছে কিনা সন্দেহ। চোখদুটি সদ্য-আরোগ্য রোগীর মতো ভাসা ও বিষণ্ণতাক্লিষ্ট।
শাশুড়ী হাসুবৌকে দেখিয়া জ্বলিয়া উঠিল।
ওই যে অভাগীর বেটি, দাঁড়িয়ে আছে। ছেলে কি আর আল্লা দেবে। সাকের না। হলে আমাদের এত জ্বালাবে কেন?
হাসুবৌ কোনো জবাব দিল না। ক্লান্ত দুই চোখ মাটির সমতলে কী যেন খুঁজিতে লাগিল।
খামাখা রাগ করো কেন, চাচি। এমন কচি বয়স, ছেলেমানুষ। পোয়াতিকে এমন ফজিয়ৎ করলে রোগে পড়বে যে।
রোগটা নেই কোনখানে?
দরিয়াবিবি হাসুবৌর নিকট অগ্রসর হইবামাত্র আতঙ্কিত চোখে সে একটু সরিয়া দাঁড়াইল।
হাসু। দরিয়াবিবির ডাক।
জি, বড়বুবু।
তোমার শরীর ভালো তো আজকাল?
না। সংক্ষিপ্ত নম্র উত্তর।
কদিনে এমন হয়ে গেছ।
দরিয়াবিবি পুনরায় প্রশ্ন করিল, তুমি দিনের হিসেব রেখেছিলে?
লজ্জায় হাসুবৌ চোখ নামাইল।
এগারো মাস হোয়ে গেল। পেটে ব্যথা করে খুব নাকি?
জি।
দেখি একবার।
জি না, থাক্।
দরিয়াবিবি সাকেরের মার দিকে ফিরিয়া প্রশ্ন করিল : চাচি, তুমি পেটে হাত দিয়ে দেখোনি ছেলে নড়ে কিনা? মরা ছেলে পেটে থাকলে, শেষে পোয়াতি নিয়ে ভারি টানাটানি হবে।
আমাকে ছুঁতে দেয় না, মা।
হাসুবৌ ঘরের দিকে চলিয়া যাইতেছে দেখিয়া দরিয়াবিবি জিজ্ঞাসা করিল, কোথা যাস্ হাসু?
পিয়াস লেগেছে, বড়বুবু।
পানি খেয়ে শিগ্গির আয়। শাশুড়ি আদেশ দিল। দরিয়াবৌ বিজ্ঞের মতো সায় দিতে লাগিল সাকেরের মার মন্তব্যের উপর।
বুড়ো বয়সে সংসারের ঝনঝাট ভাল লাগে না, মা। কোথা নামাজের পাটিতে বসে আল্লা-আল্লা করব, ওদের জন্য দোওয়া মাঙব; না, তা আর হবে না। এইসব ঝামেলা এই বয়সে পোষায়?
দরিয়াবিবির সহানুভূতি প্রকাশ পায় অন্যরূপে।
তা কী করবে চাচি। এইটুকু হাবাগোবা মেয়ে, তুমি না দেখলে সংসার চলে?
হাসুবৌ ঘর হইতে আর বাহির হয় না। বাহিরে দুইজন অপেক্ষা করিতে লাগিল। অবশ্য তাহাদের সময় অন্য কথাবার্তায় কাটিতে থাকে।
তুমি একটু দেখে যাও, মা। সত্যি পেটে যদি মরা ছেলে থাকে, মুশকিল।
তোমার বৌকে ডাকো, চাচি।
শাশুড়ির ডাকে হাসুবৌ আবার মাচাঙের নিচে দাঁড়াইল।
অবেলার অন্ধকার আসন পাতিয়াছে লাউ-মাচার সরস মাটির উপর। কয়েকটি চড়ুই নীলপাতার বনে কিচিরমিচির করিতেছিল।
হাসুবৌ অবনত মুখে ফোঁপাইয়া ফোপাইয়া কাঁদিতেছিল।
দরিয়াবিবি তার শীর্ণ হাত নিজের করতালুর উপর রাখিয়া মৃদুকণ্ঠে বলিতে লাগিল : হাসু, কান্না কিসের! আমিও মেয়েমানুষ, তোর দুঃখ বুঝি। স্বামী বাউণ্ডেলে হলে কোনো মেয়েই সুখী হয় না।
সাকেরের মা দরিয়াবিবির সান্ত্বনা গ্রহণ করিল না।
মা, বাঁজা মেয়ে, কবছর বিয়ে হল, একটা ছেলে হলে সাকেরের চালচলন বদলে যেত।
দরিয়াবিবি হাসুবৌর রক্তশূন্য আঙুলের দিকে চাহিয়া কহিল : আমারও দুটো ছেলে, চাচি। কৈ, তোমার ভাসুরপোর বাউণ্ডেলগিরি গেল? আর জোয়ান ছেলের এমন কচিবৌ করেছিলে কেন?
শাশুড়ি কোনো জবাব দিল না।
হাসু, তোমার পেটটা একটু দেখি। যদি কপাল তোর ভাঙে, ছেলেটা পেটেই মরে থাকে, তাকে বাঁচাতে হবে তো।
আরো জোর কান্নার সঙ্গেই জবাব দিল হাসুবৌ।–আমাকে মরতে দাও বুবু। আমি সকলের গলার কাঁটা। আমি গোরস্তানে গেলেই ভালো।
